জীবন সূর্যের আলোয় পরকালের চাষাবাদ

প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আমিনুল ইসলাম হুসাইনী

সকাল-সন্ধ্যা, এ দুই সময়ে পূর্ব ও পশ্চিমে গাঢ় লাল রঙের সূর্যটাকে দেখতে যতটা কাছের, স্নিগ্ধ আর ছোট মনে হয়, আদতে সূর্য কিন্তু ততটা কাছের, স্নিগ্ধ আর ছোট নয়।

সৌরজগতের এ প্রাণবিন্দুটি আমাদের পৃথিবীর চেয়েও তিন লাখ গুণ বড়। প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে এত ছোট দেখায় কেন? এটি ছোট দেখার কারণ হল, সূর্যের বসবাস আমাদের পৃথিবী থেকে ১৪ হাজার ৬১৫ কোটি ২০ লক্ষ কিলোমিটার দূরে।

অত দূর থেকেই আল্লাহতায়ালার হুকুমে সূর্য তার আলো পাঠিয়ে প্রাণিজগৎকে প্রাণ জোগায়। তাই তো সূরা ফুসসিলাতে আল্লাহতায়ালা সূর্যকে ঘোষণা করেছেন সৃষ্টিজগতের অন্যতম নিদর্শন বলে।

সূর্যকে আমরা সূর্য ছাড়া আরও অনেক নামেই ডাকি। এই যেমন- রবি, রবিকর, ইংরেজিতে সান, আরবিতে শামস। শামস নামে পবিত্র কোরআনে একটি সূরাও নাজিল হয়েছে।

সূর্য কী? কে তাকে সৃষ্টি করেছেন? এ নিয়ে আদিম মানুষদের মাথাব্যথা না থাকলেও পৃথিবীর ওপর যে সূর্যের সীমাহীন প্রভাব রয়েছে, তা কিন্তু ঠিকই বুঝেছেন।

তারপর বিজ্ঞানের আবির্ভাবের পর থেকে সূর্যকে নিয়ে মানুষের মনে নানা জল্পনা-কল্পনা আর থিউরির পর থিউরি সৃষ্টি হতে থাকে। বিজ্ঞান আবিষ্কার করে, সূর্য একটি জি-ধরনের প্রধান ধারার তারা।

যার ভর সৌরজগতের শতকরা ৯৯.৮৬৩২ ভাগ। এর গঠন প্রায় নিখুঁত গোলকের মতো। কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর দিকে কমলালেবুর মতো একটু চাপা। এত হল মানব আবিষ্কৃত বিজ্ঞানের কথা; যা আনুমানিক নির্ভরতা মাত্র।

এবার আসুন জেনে নেই এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআন কী বলে। সূর্যের উৎস, বৈশিষ্ট্য এবং সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ইতিপূর্বে মানুষের যত জল্পনা-কল্পনা আর ভ্রান্ত ভাবনা ছিল, সে সব ভ্রান্ত ভাবনার নিরসন করে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন- ‘কল্যাণময় তিনি, যিনি নভোমণ্ডলে রাশিচক্র সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে রেখেছেন সূর্য ও দীপ্তিময় চন্দ্র।’ (সূরা আল ফুরক্কান : ৬১)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আপনি যদি তাদের (চন্দ্র-সূর্য) জিজ্ঞেস করেন, আসমান-জমিন কে বানিয়েছেন? সূর্য ও চন্দ্র কে নিয়োজিত করেছেন? তারা বলবে, অবশ্যই আল্লাহ।’ (সূরা আনকাবুত : ৬১)

অতএব এ কথা স্পষ্ট, সূর্য আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের একটি সৃষ্টি। সূর্যকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানুষসহ অন্যান্য সৃষ্টির সেবার জন্য। তাকে উপাসনার জন্য নয়।

কিন্তু তার পরও সেই প্রাচীনকাল থেকে, এ আধুনিক যুগেও কিছু লোক আছে, যারা সূর্যকে দেবতা জ্ঞান করে। তাদের হুশিয়ারি সংকেত দিয়েই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে বলেছেন, ‘তোমরা সূর্য কিংবা চন্দ্রকে সিজদা কর না। আল্লাহকে সিজদা কর। যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা ফুসসিলাত : ৩৭)

ভুলে গেলে চলবে না, আল্লাহর হুকুমেই সূর্যের উদয়-অস্ত, অক্ষ-বিচরণ। বিশাল এ সূর্য নিঃশব্দে নির্ভুলে তারই হুকুম পালন করে যাচ্ছে নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট অক্ষে।

ইরশাদ হয়েছে, ‘সূর্য নাগাল পায় না চন্দ্রের এবং রাত্রি অগ্রে চলে না দিনের। প্রত্যেকেই আপন কক্ষ পথে চলাচল করে। (সূরা ইয়াসিন : ৪০) আর হাদিসে বলা হয়েছে, হজরত আবু যার (রা.) বর্ণিত। ‘একদিন নবী (সা.) বললেন, তোমরা কি জানো, এই সূর্য কোথায় যায়? সাহাবিরা বললেন, আল্লাহ ও তার রাসূলই ভালো জানেন।

তিনি বললেন, এ সূর্য চলতে থাকে এবং (আল্লাহতায়ালার) আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থান স্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত হয়ে পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয় উঠ এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত স্থানে।

এমনিভাবেই চলতে থাকবে। মানুষ তার থেকে অস্বাভাবিক আর কিছু হতে দেখবে না। শেষে একদিন সূর্য যথারীতি আরশের নিচে তার নির্দিষ্টস্থানে ফিরে যাবে। তাকে বলা হবে উঠ এবং অস্তাচল থেকে উঠ। এ

রপর কোনো একদিন সূর্য পশ্চিম গগণে উঁকি দেবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, কোন দিন সে অবস্থা হবে তোমরা জান? সেদিন ওই ব্যক্তির ইমান কোনো কাজে আসবে না, যে ব্যক্তি আগে ইমান আনেনি কিংবা যে ব্যক্তি ইমানদার হয়ে কল্যাণ অর্জন করেনি।’ (মুসলিম : ১৫৯, বুখারি : ৯৯১৩)

ভাবুনতো! যদি সৃষ্টিজগৎ না থাকত তাহলে কেমন হতো এ সুন্দর পৃথিবী? কেমন হতো পৃথিবীতে বসবাসকারীদের অবস্থা? এই যে এখন পৃথিবীর সবকিছু যেভাবে চলছে, তা কি এই একই নিয়মে চলত? না, চলত না। বরং বদলে যেত আমাদের চারপাশের চিরাচরিত অনেক কিছুই। অন্ধকারে ছেয়ে থাকত পুরো পৃথিবী।

সমুদ্রে থাকত না কোনো জোয়ার-ভাটা। জমিতে ফলত না সোনার ফসল। সুতরাং সূর্যকে শুধু আকাশে ঝুলিয়ে রাখা একটি গোলাকার আলোর বল হিসেবে ধারণা করলে তা হবে আমাদের জন্য চরম বোকামি। কেন না আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের আরও নানা প্রয়োজনের জন্যই এ সূর্যকে সৃষ্টি করেছেন।

আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন- ‘তিনিই (আল্লাহ) সূর্যকে করেছেন তেজস্কর এবং চন্দ্রকে করেছেন আলোকদীপ্ত আর এর জন্য মনজিল (তিথি) নির্দিষ্ট করেছেন, যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার।’ (সূরা ইউনুস : ৫) অপর আয়াতে বলেন, ‘আমি নির্মাণ করেছি তোমাদের মাথার ওপর মজবুত সাত আকাশ এবং তাতে একটি উজ্জ্বল প্রদীপ সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা আন-নাবা : ২-১৩) এই সূর্য আছে বলেই মানুষ তাদের সময় ও স্থানের হিসাব করতে পারে নির্ভুলভাবে।

সূর্যের সঙ্গে এক অদ্ভুত মিল রয়েছে আমাদের। বিশেষ করে প্রত্যেকটা মুসলমানই যেন এক একটা সূর্য। আর এই সূর্যের আলো হচ্ছে তার নেক আমল।

এই আলোকিত মানুষ যতদিন পৃথিবীতে থাকবে, ততদিন আকাশের সূর্যও আলোকিত থাকবে। যেদিন এই পৃথিবীতে একজনও আলোকিত মানুষ থাকবে না, সেদিনই আকাশের সূর্য হয়ে যাবে আলোহীন।

সেদিন বিলীন হয়ে যাবে সৃষ্টিজগতের অস্তিত্ব। কিন্তু এরপরও যে সব নির্বোধ আল্লাহতায়ালার এমন সৃষ্টি-নৈপুণ্য, মহাকৌশল এবং সৃষ্টির অনুপম সৌন্দর্য দেখে তার সামনে মাথা নত না করে, নত করবে আল্লাহর সৃষ্টি সূর্যের কাছে। তাদের জন্য আফসোস।

সেদিন তাদেরই জাহান্নামে জ্বালানো হবে। আসুন! এই জীবন সূর্যের আলো থাকতে থাকতেই নিজেকে শুধরিয়ে পরকালের চাষবাস শুরু করি।

লেখক : প্রাবন্ধিক