বিদায় হজের ভাষণ ও আজকের হাজী

  মোহাম্মদ তালহা তারীফ ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদায় হজের ভাষণ ও আজকের হাজী

পবিত্র কাবাঘর ও রাসূল (সা.)-এর রওজা দেখে মনের ব্যথা ও মনের বাসনা পূরণ করে হাজীরা ফিরছেন মাতৃঘরে। হজের আহকাম পালন করে হাজী, শুনেছেন হজের ভাষণ।

এখানেই প্রথম ভাষণ দিয়েছিলেন রাসূল (সা.) দশম হিজরির ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে জাবালে রহমতের পদদেশে, লক্ষাধিক হাজীর উপস্থিতিতে জ্ঞানগর্ভ সুন্দর দিকনির্দেশনামূলক সেই ভাষণ ছিল মানবকল্যাণের জন্য এক মহান বাণী।

সেদিন সূরা মায়িদার ৩ নং আয়াত ‘আল ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দীনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নিমাতি ওয়া রাদিতুলাকুমুল ইছলামাদিনা’ নাজিল হয়।

যার মাধ্যমে আল্লাহর দ্বীন শরীয়ত ও সব নিয়ামতের পরিপূর্ণতার ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে। তার ভাষণ ছিল বিশ্ব মানবকল্যাণের জন্য; যা প্রতিটি হাজীর জীবন পথের পাথেয়। সেদিনের ভাষণ কি তখনকার হাজীদের উদ্দেশ ছিল?

না এই ভাষণ কেয়ামত পর্যন্ত যত হাজী আসবে তাদের জীবন গঠনে দিবস নিদের্শনা দেবে? একজন হাজীকে অবশ্যই হজের ভাষণ অন্তরে গেঁথে কর্মে পরিণত করতে হবে। আজ আমার টাকা হয়েছে।

এক ছেলে ইতালি অন্য ছেলে লন্ডন প্রবাসী, কিংবা আমি চাকরি সমাপ্ত করলাম পেনশন পেয়েছি বা এলাকার মাতুব্বর। আমি যদি নামের প্রথমে হাজী বা আলহাজ না বসাতে পারি কেমন দেখা যায়।

লোকে আমায় যদি হাজী সাহেব না বলে তাহলে লোকে কী বলবে। টাকা তো জীবনভর অনেক ইনকাম করেছি, এখন জীবনের সব পাপকর্ম মুছে ফেলার জন্য হজে যাব প্রতি বছর।

আসলেই কি পাপকর্ম হজের মাধ্যমে মুছে যায়? ঘুষের টাকা অন্য থেকে অন্যায়ভাবে ছিনিয়ে নেয়া টাকা, ব্যাংকের সুদের টাকা লগ্নি করে হজ করতে গিয়ে পাপকর্ম মুছে ফেলা কি সম্ভব? সুদ মুক্তসমাজ গঠন করার জন্য আল্লাহর রাসূল (সা.) বিদায় হজে বলেছিলেন। আজ হজে গিয়ে হাজী হয়ে এলাম আর সুদের টাকা দিয়ে ব্যবসা বাড়াতে লাগলাম।

বছর বছর হজের যাত্রী বৃদ্ধি পাচ্ছে। নামের প্রথমে হাজী সাহেব দেখা যাচ্ছে, কানে হাজী ডাক অনেক শোনা যাচ্ছে, ততবেশি হিংসা বেড়ে যাচ্ছে আমাদের মাঝে, দুর্নীতি বেড়েই যাচ্ছে সমাজে, পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগছে খুবই কম। কোন হাজীর কার্যকলাপ দেখে সমাজের কেউ তাকে পছন্দ করে না। প্রশ্ন হল এর কারণ কী?

এর একমাত্র কারণ হল হজ করেছি তাকওয়া অর্জনের জন্য নয়, করেছি টাকা অর্জনের গৌরব বাড়ানোর জন্য। যদি আরও ১০ বছর আগে হজে যেতাম তাহলে মাতুব্বরি করে টাকা বেশি কামাতে পারতাম। এই তো আজ অনেক হাজীর মনমানসিকতা। তাহলে কীভাবে পরিবর্তন হব আমি? আর আমি কেমন করেই বিদায় হজের বাণী দিয়ে পরিবর্তন করব আমার দেশ ও সমাজকে।

সম্মানিত হাজী! আপনি আল্লাহর ঘরের একজন মেহমান হয়ে দেশে ফিরেছেন। আপনার নাম হয়েছে। হাজী, সবাই আপনাকে হাজী বলে সম্বোধন করবে।

বলবে হাজী সাহেব কেমন আছেন কোথায় যান চা খেয়ে যান, আজ আপনার কথা মূল্যায়ন করে সমাজ। আল্লাহর ঘরের মেহমান হওয়ায় তারই বান্দারা আপনায় সম্মান করছে, আজ আপনার প্রতি সমাজে সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ এক ভালোবাসা, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হয় হাজী সাহেবকে।

তাই এ সুযোগটি আপনাকে অবশ্যই কাজে লাগাতে হবে। বিদায় হজের ভাষণ মনে গেঁথে কর্মে পরিণত করে সমাজ সংস্কারমূলক কথা বলে মানবমঙ্গলের জন্য হেদায়াতের দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে সমাজকে।

মানুষ একে অপরের উপকারে এগিয়ে আসতে পারে, একটি নারীর বিয়ে হচ্ছে না তাকে বিয়ের ব্যবস্থা কীভাবে করা যায়, একজন এতিম শিক্ষার্থী পড়াশোনা কীভাবে করতে পারে, অসহায় ব্যক্তির পাশে কীভাবে দাঁড়ানো যায়- এ পদক্ষেপ নিতে হবে আপনাদের। সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে নিজে যা পছন্দ করি অন্যের জন্য তাই পছন্দ করা।

আমরা সবাই অধীনস্থ। তাই আমার অধীনস্থদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে পারলে আমার উপরস্থ আমার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবেন। চায়ের দোকানে অযথা সময় গল্প-গুজবে নষ্ট না করে সময়কে কাজে লাগাতে হবে। প্রতিটি সময় ও কাজের হিসাব দিতে হবে আল্লাহর কাছে। যা বিদায় হজের ভাষণের একটি অন্যতম বাণী।

এ জন্য চাই হাজীকে হজের পর ইবাদতে আরও মনোনিবেশ করা। হজ শেষে বাকি জীবন এমন কর্ম করতে হবে যেন আল্লাহর ঘরের মেহমানকে কেউ অবহেলা করতে না পারে।

হাজীকে অনুসরণ করে সমাজের আরও দশটি লোক যেন শিখতে পারে। তার সুকর্ম দেখে অন্যরা ইচ্ছা করবে হজে গিয়ে মানুষ হওয়ার জন্য জীবনকে বদলিয়ে বাকি জীবন রঙিন করে তোলার জন্য।

আর যে হাজী কাঁধে রুমাল ঝুলিয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে ইমামের পেছনে নামজ আদায় করে; কিন্তু আজও মেয়ের সম্পত্তির হক মেয়েকে দেয়নি, নারী ও অধীনস্থদের প্রতি অবহেলা করে এমন হাজী হওয়ার কী লাভ।

আমি হাজী আমি আগে সালাম দেব কেন, সবাই আমায় সালাম দেবে। ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে মসজিদের ইমামের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হয়ে গেলাম। তাহলে কি আমি হজ করে মানুষ হতে পারলাম? আগে যেমন ছিলাম তেমনিই রয়ে গেলাম।

শয়তানের পছন্দের কর্ম আজ পর্যন্ত ছেড়ে দিতে পারলাম না। যে হাত দিয়ে শয়তানকে ঘৃণা করে পাথর নিক্ষেপ করে এসেছি আজ সেই হাত দিয়ে শয়তানেরই পছন্দের কাজ করছি।

তাহলে আমার জন্য দেয়া রাসূল (সা.) এর বিদায় হজের বাণী কি অদৌ মানতে পারলাম? আল্লাহর ঘরের মেহমান হয়ে যে ৪০ থেকে ৪৫ দিন প্রশিক্ষণ দিয়ে আজ ফিরে এসেছি সেই প্রশিক্ষণ অনুযায়ী সারাটি জীবন বাস্তবায়ন করতে না পারি তাহলে আজকের এ হজ নামকাওয়াস্তে থেকে যাবে।

বৃথা হয়ে যাবে কষ্টে উপার্জন করা হজে শরিক হওয়া। এ রকম হলে হজে যাওয়া হল না, হল ঘুরতে যাওয়া। হাজী নামে সবাই আমায় ডাকবে; কিন্তু ডাকবে না যার মেহমান হয়ে গিয়েছি সেই আল্লাহ।

আমি আল্লাহর প্রেমের রেজামন্দি হাসিলের হজ করে এসেছি। যখন ইহরামের সাদা কাপড় পরিধান করেছি তখন থেকে দুনিয়ার সব মায়া-মমতা পেছনে ফেলে আল্লাহকে পাওয়ার আশায় থাকব।

আমি কাবা ঘরে গিয়ে মেহমান হয়ে যে অভিনয় করেছি তা আমার চেতনায় জীবনভর ধরে রাখতে হবে। হজের সে ভাষণ অন্যদের কাছে পৌঁছে দিয়ে একজন সাচ্চা হাজী হয়ে উঠতে হবে প্রতিদিন।

লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter