নিজেকে দেখ বুকে তোমার লুকিয়ে আছে পূর্ণিমার চাঁদ

  সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিজেকে দেখ বুকে তোমার লুকিয়ে আছে পূর্ণিমার চাঁদ

আমার প্রিয় তালিবানে ইলম

যুগ ও সমাজের মোকাবেলায় কেন ও কী জন্য আপনাদের এই হীনম্মন্যতা?

অন্যদের হীনমন্যতা হল মানসিক দুর্বলতা ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধি। কিন্তু অপনাদের হীনমন্যতাবোধের অর্থ হবে দ্বীন ও ঈমানের কমজোরি এবং চিন্তা ও বিশ্বাসের দুর্বলতা। এর অর্থ হবে গায়বী ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতি এবং আসমানি নেজাম ও ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা, যার পরিণাম-পরিণতি খুবই গুরুতর ও সুদূরপ্রসারী। নববী ইলমের ধারক ও বাহক যারা, ওয়ারিসে নবী ও নায়েবে রাসূল যারা তাদের মনে যদি বাসা বাঁধে তুচ্ছতা ও হীনমন্যতার অনুভূতি তাহলে এর অর্থ হবে এই যে, নবুয়তের মাকাম ও মর্যাদা তাদের জানা নেই। আল্লাহর জাত ও সিফাতের পরিচয় তাদের কাছে নেই। অন্তরে ইয়াকিন ও বিশ্বাসের সম্পদ নেই।

ভাই, আপনারা তা এমন সব ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের উত্তরসূরি যাদের সামনে এসে থেমে যেত সময়ের গতি, যারা নির্ধারণ করে দিতেন জীবন ও সমাজের রীতি-নীতি, যাদের নূরানিয়াতের সামনে ম্লান হয়ে যেত সূর্যের দীপ্তি। আপনারা তাদের পদাঙ্ক অনুসারী, শেখ সাদীর ভাষায় যারা ছিলেন ‘মুকুটহীন সম্রাট’।

যে মহামূল্যবান সম্পদ সম্ভার রয়েছে আপনার কাছে পৃথিবীর সব রাজভাণ্ডার তা থেকে বঞ্চিত। আপনার সিনায় রয়েছে ইলমে নবুয়ত ও নূরে নবুয়ত। আপনার চিন্তায়, চেতনায় এবং বিশ্বাসে, ভাবনায় রয়েছে সে সব মহাসত্য ও চির রহস্য যা বহুদিন হল মানবতার হাতছাড়া হয়ে গেছে। মানবজাতি আজ অন্ধকারে ডুবে আছে। বিভিন্ন গোলযোগ-দুর্যোগ ও ফেতনা-ফাসাদে সবাই এখন দিশেহারা।

কিন্তু তালিবানে ইলম। স্থূল দৃষ্টিতে তাদের পরিচয় হল জীর্ণ দেহ, শীর্ণ বস্ত্র ও রিক্ত হস্ত, কিন্তু অন্তর্চক্ষু মেলে নিজের ভেতরে একবার উঁকি দিয়ে দেখুন। হৃদয়-রাজ্য আপনার কত শত সম্পদে পরিপূর্ণ। জিন্দা কলব, জিন্দা রূহ, সজীব হৃদয়, সজীব প্রাণ।

এত বড় সত্য আর কোনো কবি কবে কোনো কবিতায় এত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে! শুনুন- নিজেকে দেখ একবার ‘শূন্য আঁচল দেখে ক্ষুণ্ণ হও কেন তুমি? বুকে তোমার লুকিয়ে আছে চাঁদ পূর্ণিমার।’

জেনে রাখুন, মনস্তত্ত্বের স্বীকৃত সত্য এই যে, ইজ্জত ও জিল্লতি এবং তুচ্ছতা ও মর্যাদার সম্পর্ক হল মানুষের অন্তর্জগতের সঙ্গে। বাইরের জগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক খুবই কম। হীনমন্যতা ও তুচ্ছতাবোধ একটি মনস্তাত্ত্বিক অবস্থার প্রকাশমাত্র। নিজের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে মানুষের মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, সংশয়-সন্দেহ, দুর্বলতা ও অনাস্থা এবং আত্মপরিচয়ের অভাব- এসবেরই অনিবার্য পরিণতি হল নিজের তুচ্ছতার অনুভূতি ও হীনমন্যতাবোধ। মানুষ নিজেকে নিজে তুচ্ছ ভাবে, মূল্যহীন মনে করে, তারপর সন্দেহে পড়ে যায় যে, সময় ও সমাজ বুঝি তাকে তুচ্ছ ও মূলহীন মনে করছে। অথচ প্রকৃত সত্য এই যে, নিজের ওপর নিজেই সে অবিচার করছে। নিজেই নিজের অবমূল্যায়ন করছে। মনে রাখবেন, নিজেকে যে তুচ্ছ ভাবে, নিজের কাছে নিজের মূল্য যে হারিয়ে ফেলে পৃথিবীর কোনো পদ ও সম্পদ তাকে মর্যাদা দিতে পারে না, মূল্যবান বানাতে পারে না। আপন হৃদয়ে যার স্থান নেই, এ জগৎ সংসারে কোথাও তার স্থান নেই। আপন হৃদয়ের প্রসার ও সংকোচনেই বাইরের জগৎ সম্প্রসারিত ও সংকোচিত হয়ে থাকে। সুতরাং নিজের হৃদয়কে নিজের জন্য সম্প্রসারিত করুন, জগৎ নিজেকে মেলে ধরে আপনাকে স্বাগত জানাবে।

মানুষের কর্তব্য হল আত্মজিজ্ঞাসা করা, নিজেকে নিজে প্রশ্ন করা- নিজের সঙ্গে নিজে সে কী আচরণ করছে? নিজের হৃদয়ে নিজেকে সে কতটা মর্যাদার আসন দিয়েছে? নিজেকে যদি সে রিক্ত ও নিঃস্ব মনে করে, দুনিয়ার বাজারে নিজেকে যদি তুচ্ছ ও মূল্যহীন ভাবতে থাকে তাহলে নিক্তির মাপে ওজন করে অভ্যস্ত এই পৃথিবীর কাছে ইজ্জত ও মর্যাদা আশা করা তার উচিত নয়। জ্ঞান বিজ্ঞানে এবং আবিষ্কারে উদ্ভাবনে অতি অগ্রসর এই পৃথিবীতে বিশ শতকের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও যদি আপনি বুঝতে না পারেন তাহলে আমার কিছু বলার নেই। আরব জাহেলিয়াতের দাতা হাতেম তাই কিন্তু এ পরম সত্য আমার আপনার শিক্ষার জন্য তার এক কবিতায় রেখে গেছেন-

কেননা তোমার চোখে তুমি তুচ্ছ হলে বন্ধু! নিজেকে নিজে মর্যাদা দাও। মানুষের মাহফিলে কোনো কদর পাবে না তুমি।

প্রিয় বন্ধুগণ! চাঁদ-সূর্যের অস্তিত্বের মতোই আমি বিশ্বাস করি যে, শত শত জাতির কোটি কোটি মানুষের এই পৃথিবীতে আমরা তুচ্ছ নই, নিঃস্ব নই, দুর্বল ও শক্তিহীন নই, অসহায় ও বে-সাহারা নই। কিন্তু সমস্যা এই যে, আমরা আমাদের আত্মপরিচয় ভুলে গেছি। এই আত্মবিস্মৃতিরই পরিণতি হল আমাদের হীনমন্যতাবোধ।

এ ব্যাধির একমাত্র চিকিৎসা এই যে, আমাদের আত্মসচেতন হতে হবে। নিজেদের অবস্থান ও মর্যাদা অনুধাবন করতে হবে। নিজেদের ভেতরে গচ্ছিত সম্পদের সঠিক খোঁজ নিতে হবে। দুনিয়ার পরিবর্তন আসলে আমাদের দৃষ্টির পরিবর্তন। বাইরের দুনিয়ার সবকিছু আমাদের দৃষ্টির অনুগামী। যেদিন জীবন ও জগৎ সম্পর্কে এবং নিজেদের সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিতে পরিবর্তন আসবে সেদিন জগৎ সংসারের সবকিছুতেই পরিবর্তন আসবে। এবং আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখতে পাব, হীনমন্যতাবোধের যে ভয়ঙ্কর অপচ্ছায়া আমাদের তাড়িয়ে ফিরছিল তা কর্পূরের মতো উবে গেছে। কবি সত্যই বলেছেন-

‘আপন মর্যাদা সম্পর্কে তুমি সচেতন হও তাহলে দেখবে, জিন-ইনসান হবে তোমার সিপাহী আর তুমি হবে আমিরে লশকর।’

আমাদের বিগত ও সমসাময়িক ইতিহাসে দেখা যায়, যারা বিশ্বজগতে নিজেদের অবস্থান ও মর্যাদা উপলব্ধি করতে পেরেছেন এবং বুঝতে পেরেছেন যে, কী মহামূল্যবান সম্পদ ও মর্যাদাপূর্ণ মাকম আল্লাহ তাদের দান করেছেন, সারা বিশ্বের সব কিছু তাদের কাছে মনে হয়েছে তুচ্ছ, অতি তুচ্ছ। ফলে দুনিয়ার সালতানাত কখনও তাদের খরিদ করতে পারেনি। প্রতাপশালী সুলতান ও আমির-উমরাদের বড় বড় লোভনীয় প্রস্তাব মৃদু হেসে এই বলে তারা ফিরিয়ে দিয়েছেন যে, ‘ঈগল তো নীড় বাঁধে সর্বোচ্চ বৃক্ষের শীর্ষ চূড়ায়।’

মানবজাতির ইতিহাস যদিও বারবার আত্মবিস্মৃত ও আত্মবিক্রীত মানুষের কলঙ্কে কলঙ্কিত হয়েছে, তবু তা এই মহামানবদের ব্যক্তিত্ব বিভায় উদ্ভাসিত এবং তাদের আল্লাহ-প্রেম ও আত্মসম্মানবোধের কাহিনীতে গৌরবান্বিত হয়েছে। মানবতার শির তাদেরই কল্যাণে চির উন্নত রয়েছে যারা কর্মে ও বিশ্বাসে নিজেদের শির উন্নত রেখেছেন।

[চলবে]

উর্দু গ্রন্থ পা-জা সূরা-গে জিন্দেগি থেকে

তরজমা- মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ

লেখক : সব্যসাচী লেখক ও উম্মতদরদী সমাজ গবেষক

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.