আসমান জমিন কাঁদে মহররমের চাঁদে

  আল ফাতাহ মামুন ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসমান জমিন কাঁদে মহররমের চাঁদে

বিকালের সূর্য ডুব দেয় রাতের আঁধারে। অপেক্ষায় থাকে নতুন ভোরের। নতুন মানেই আনন্দ। নতুন মানেই শক্তি। তাইতো ভোরের নতুন সূর্য দেখে আনন্দে হেসে ওঠে মন।

দুঃখ-কষ্ট, হতাশা-জীর্ণতা মুছে দিতে প্রকৃতিতে এমন নতুনের সমাহার ঘটিয়েছেন মাবুদ রাব্বানা। কিন্তু সব নতুন আনন্দের নয়। কিছু নতুন ব্যথার। কিছু নতুন কষ্ট আর যন্ত্রণার।

বিশ্ব যখন আনন্দের জোয়ারে হেসে নতুন বছরকে স্বাগত জানায় আনন্দ করে, মুসলমানরা তখন হিজরি বর্ষকে বরণ করে ব্যথা ফুলের মালা পড়িয়ে। হ্যাপী নিউইয়ার বা শুভ নববর্ষ নয়- মুসলমানের নতুন বছর শুরু হয় হায় হোসাইন! হায় হোসাইন! মাতম করে।

ওরে এজিদ! তুই বুঝি খোদার নতুন আলোয় ব্যথার কালো ছড়িয়ে দিয়েছিলি। তাইতো নতুন বছর এখন আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে না মুসলমানের কাছে। কথা ছিল, নতুন বছরের বাঁকা চাঁদ দেখে নতুন শক্তিতে জেগে উঠবে মুসলমান। পুরনো দুঃখ ভুলে নতুনের আনন্দে হাসবে প্রাণ।

কিন্তু মহররমের চাঁদ যেন পুরনো ক্ষতে ব্যথার প্রলেপ বুলাতে আসে। পুরো বছর কোনোরকম কেটে গেলেও মহররম এলেই আর নিজেকে মানাতে পারেন না হোসাইনপ্রেমিক-কারবালাপ্রেমিকরা।

সুফি কবি নজরুল ছিলেন হোসাইনপ্রেমিকদের একজন। তাইতো মহররম এলেই হু হু করে কেঁদে উঠেছে তার মন। তিনি কাঁদছেন। কবিতা লিখে কাঁদিয়েছেন বাংলার মানুষকে। যাদের হৃদয় কাঁদে না হোসাইনের জন্য, তাদেরও তিনি ডেকে ডেকে বলেছেন, হে পাষাণ হৃদয়! কেঁদে হও ধন্য।

‘ওরে বাঙলার মুসলিম, তোরা কাঁদ! /এনেছে এজিদি বিদ্বেষ পুনঃমহর্রমের চাঁদ। / এক ধর্ম্ম ও এক জাতি তবু ক্ষুধিত সর্ব্বনেশে/তখতের লোভে এসেছে এজিদ কমবখতের বেশে!/এসেছে ‘সীমার’ এসেছে ‘কুফা’র বিশ্বাসঘাতকতা, /ত্যাগের ধর্মে এসেছে লোভের প্রবল নির্ম্মমতা, /মুসলিমে মুসলিমে আনিয়াছে বিদ্বেষের বিষাদ, /কাঁদে আসমান জমিন, কাঁদিছে মহর্রমের চাঁদ।

সুফি ছড়াকার আহমাদ উল্লাহ মহররমের চাঁদ দেখে বড় করুণ সুরে জিজ্ঞেস করেন- ‘হে মহররমের চাঁদ! কেন তুমি ফিরে ফিরে এসে ফোরাত নদীতে কান্নার ঢেউ তোল। এ ঢেউ যে কারবালার মরু কণাকে খুন বানিয়ে দুনিয়ার মুমিন আত্মার পাড় ভাঙে! হে রাতের সাক্ষী চাঁদ! তুমি কি ফোরাতের জলে আপন প্রতিচ্ছবির লাল রঙা ছবি দেখে কেঁদে ওঠো না।

ওই দেখ ইমামের জন্য কাঁদছে কারবালার বালিকণা। চোখে তার চিকচিকে শিশির ফোঁটা। প্রকৃতিজুড়ে কান্নার এ মহানায়ক হচ্ছেন শেরে খোদা আলীর বীরপুত্র ইমাম হোসাইন। নবী নন্দিনী মা ফাতিমার কলিজার টুকরা দ্বীনের নতুন জীবনদানকারী শহীদী হোসাইন।’ (আলোকিত মানুষের খোঁজে।)

ফোরাতের তীরে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসাইনকে শহীদ করার পর থেকেই মুসলিম বিশ্বে মহররম আর নতুন বছরের আনন্দ নিয়ে আসে না। মহরম মানেই বেদনা। মহররম মানেই কান্না।

মহররম এলেই প্রেমিক মনে বেদনার জোয়ার আসে। হৃদয়রাজ্যে মাতম ওঠে। করুণ সুর বাজে- হায় হোসাইন! হায় হোসাইন! কবি ফররুখ আহমদ বলেছেন, ফোরাতের তীর হয়ে আজো হোসাইনপ্রেমিকরা কেঁদে চলছে বিশ্বের আনাচে-কানাচে। কেঁদেই তাদের সুখ। কান্নার জলে যেন মুছে দিতে চায় জীবনের সব দুঃখ। কবির ভাষায়-

‘ফোরাতের তীরে তীরে কাঁদে আজও সংখ্যাহীন প্রাণ;/ উদভ্রান্ত ঘূর্ণীর মত শান্তি চায় মাতমে-কান্নায়। / যেখানে মৃত্যুর মুখে তৃষ্ণাতপ্ত মরুর হাওয়ায় / জিগরের খুন দিল কারবালার বীর শহীদান।’

এভাবেই মহররমের কান্নায় হারিয়ে যায় হিজরি নববর্ষের আনন্দ। তাইতো বিশ্বজুড়ে হিজরি বর্ষ উদযাপনের তেমন আয়োজন হয় না কারবালার শোক থেকে। হিজরি বর্ষ এলেই মনে হয় নববর্ষ নয়, এসেছে নববেদনা পুরনো খামে নতুন করে। কবি নজরুল বড় বেদনায় বলেছেন।

‘কত মহররম এলো, গেল চ’লে বহু কাল-/ ভুলি নি গো আজো সেই শহীদের লহু লাল!/ মুসলিম তোরা আজ ‘জয়নাল আবেদীন’, /‘ওয়া হোসেনা- ওয়া হোসেনা’ কেঁদে তাই যাবে দিন!’

তবে কান্নাই শেষ কথা নয়। বেদনাই সমাধান নয়। বেদনা একদিন বারুদের মতো জ্বলে উঠবে। দুনিয়াজুড়ে এজিদি সাম্রাজ্য ভেসে যাবে হোসাইনি প্রেমিকদের ঐক্য জোয়ারে। যখন হোসাইন প্রেমিকরা নেক হয়ে এক হবে।

মর্সিয়া শেষে হোসাইনপ্রেমিকদের ঘুরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।

‘ফিরে এলো আজ সেই মহররম মাহিনা, / ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’

লেখক : শিক্ষার্থী, মাস্টার্স, ডিপার্টমেন্ট অব তাফসির, মাদ্রাসা-ই আলিয়া, ঢাকা

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter