তাঁর আদর্শ অনুপ্রাণিত করবে কিয়ামত পর্যন্ত

  মুফতি আহমদ আবদুল্লাহ ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মহররম মাসের দশ তারিখই আশুরা নামে পরিচিত। দিনটি ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। হজরত আদম (আ.)-এর তওবা মহররমের দশম দিন অর্থাৎ আশুরায় কবুল হয়েছে। বর্ণিত আছে, তিনি দীর্ঘ ৩০০ বছর কান্নার পর আশুরার দিন তার তওবা কবুল হয়। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)। এ দিনে হজরত নূহ (আ.)-এর জাহাজ মহাপ্লাবন শেষে জুদি পাহাড়ে এসে থামে। আল্লাহতায়ালা হজরত ইদ্রিস (আ.)-কে আশুরার এ দিনে উঁচু মর্যাদা দান করেন। হজরত ইবরাহিম (আ.) আশুরার দিনে জন্মগ্রহণ করেন এবং আল্লাহতায়ালা এ দিনে তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে আগুন থেকে মুক্তি দেন। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)। হজরত ইউসুফ (আ.) এ দিনে জেল থেকে মুক্তি পান। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)। আল্লাহতায়ালা এ দিনে হজরত মুসা (আ.) ও তার উম্মতকে মুক্তি দিয়েছিলেন, ফেরাউন ও তার বাহিনীকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছিলেন। (মুসলিম)। এ দিনে হজরত ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন। (তাম্বীহুল গাফিলীন)। এই দিনেই হজরত সোলাইমান (আ.)-কে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন বাদশাহী দেয়া হয়েছিল। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)। এ দিনে হজরত ঈসা (আ.)-কে আকাশে উঠিয়ে নেয়া হয়। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)। আরশ, কুরসি, আসমান-জমিন, চন্দ্র-সূর্য, তারকা, বেহেশত এ দিনেই সৃষ্টি করা হয়েছে। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)। এ দিনেই সর্বপ্রথম আসমান থেকে জমিনে বৃষ্টিপাত হয়েছিল। (তাযকিরাতুল কুরতুবী)। আশুরার দিন পূর্ববর্তী আম্বিয়ায়ে কেরামও (আ.) রোজা রাখতেন। এ দিনেই হুজুর (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র, বেহেশতি যুবকদের সরদার হজরত ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেন।

এভাবে যতগুলো ঘটনা এদিনে অর্থাৎ আশুরার দিনে হয়েছে, সবই সমগ্র উম্মাহর জন্য, গোটা মানবজাতির জন্য ছিল রহমত। খিলাফতে রাশিদা পর্যন্ত সমগ্র উম্মাহর মধ্যে এ দিনটিকে তাৎপর্য ও মর্মবাণী উল্লিখিত ঘটনাবলির ভেতরই সীমিত ছিল। আর এ কারণেই দিনটিকে মুসলিম জাতি পবিত্র ও বরকতময় মনে করেন। ৬১ হিজরির এ দিনটিতেই এমন একটি ঘটনা ঘটল যা উল্লিখিত সব ঘটনাকে ছাপিয়ে রহমতের দিনকে দুঃখময় করল, আর তা হল, এ দিনেই রাসূলে আরাবি প্রিয়নবী (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র, খাতুনে জান্নাত হজরত ফাতেমা (রা.)-এর কলিজার টুকরা হজরত হুসাইন (রা.) কারবালা প্রান্তরে ইয়াজিদ বাহিনীর হাতে নির্মম ও নৃশংসভাবে শাহাদাতবরণ করেন সত্য প্রতিষ্ঠায়। হৃদয়বিদারক ঘটনার সেদিন থেকে আজ অবধি যত অশ্র“ ঝরিয়েছে উম্মত, পৃথিবীর সৃষ্টি থেকে আজ পর্যন্ত অন্য কোনো ঘটনা সে পরিমাণ অশ্রু ঝরাতে পেরেছে কিনা সন্দেহ। কিন্তু কেন এ শাহাদত? কেন এই নৃশংস ও শোকাবহ ঘটনার জন্ম হল?

হজরত আলী (রা.)-এর শাহাদতের পর হজরত মুয়াবিয়া (রা.) সমঝোতাক্রমে মুসলিম জাহানের এককভাবে খিলাফত লাভ করেন এবং পরে ২০ বছর খিলাফত পরিচালনা করেন। এরপর পুত্র ইয়াজিদকে খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দেন। ইচ্ছায় কিংবা অনিচ্ছায় সবাই এ মনোনয়ন মেনে নিলেও যে কয়েকজন সিংহদিল আল্লাহর বান্দা তা মেনে নিতে পারেননি। তাদের অন্যতম হজরত হোসাইন (রা.)-এর নাম। তিনি ইয়াজিদকে স্বেচ্ছাচারী, অযোগ্য ও অপদার্থ হিসেবে খলিফা হওয়ার সর্বাংশে অনুপযুক্ত মনে করেন। তার হাতে বায়াত করতে অস্বীকার করেন। তার ইন্তেকালের পর পুত্র ইয়াজিদ ইমাম হোসাইনকে বায়াতের জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। ইয়াজিদ হজরত হোসাইন (রা.)-এর বায়াত গ্রহণে দৃঢ় সংকল্প করে। বায়াতকে অস্বীকারের প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া সাধারণের ওপর কী হতে পারে চিন্তিত হয়ে ইয়াজিদ পীড়াপীড়ির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

হজরত হোসাইন (রা.) এবং তার আত্মীয়-বান্ধব ও মুষ্টিমেয় সঙ্গী অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে শাহাদাতবরণের প্রস্তুতি নেন। এ সময় হোসাইন (রা.)-এর কাফেলাকে পানির উৎস বন্ধ করেন।

ইয়াজিদ বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রথম তীর ছুড়ে যুদ্ধ শুরু করা হয়। এ ছিল এক অসম যুদ্ধ। সুসজ্জিত চার হাজার বাহিনীর বিরুদ্ধে পদাতিক ও অশ্বারোহী মিলিয়ে নারী-শিশু বাদে মাত্র ৭২ জনের একটি ক্ষুদ্র দল ছিল হজরত হোসাইন (রা.) এর সঙ্গে। তিনি ও তার আত্মীয়-বান্ধবরা কোনো অবস্থাতেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে পরম প্রিয় সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করে আল্লাহর পিয়ারা হয়েছেন। পরবর্তী উম্মতের জন্য এটি একটি অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় মহত্তম নজির। কারবালার আদর্শ ও কোরবানি কিয়ামত পর্যন্ত উম্মতকে অনুপ্রাণিত করবে।

লেখক : শিক্ষক, রসুলপুর জামিয়া ইসলামিয়া ঢাকা

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter