আউলিয়া কাহিনী

দাসী হলেন দরবেশ

  আহমাদ উল্লাহ ০৫ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দাসী হলেন দরবেশ

ভারি মিষ্টি দেখতে। ওরা চার বোন। সবচেয়ে লক্ষ্মী রাবেয়া। মরু রোদে ভেড়া চরান বাবা। সূর্য্যি ডুবলে ঘরে ফেরেন। জুড়িয়ে যায় রোদে পোড়া মন।

রাবেয়া বাবাকে অজুর পানি তুলে দেয়। সন্ধ্যা ফুরায়। শেষ হয় বাবার নামাজ।

চার বোন একসঙ্গে নামাজে দাঁড়ায়। রাতের খাবার সাজান মা। রাবেয়া, মিষ্টি মধুর কণ্ঠে ডাকেন মা। আসছি, বলেই মাকে অবাক করে দেয়। ছুটে আসে যেন বাতাস হয়ে। এ দৃশ্য নিত্য রাতের।

খাওয়া শেষে মা-বাবা দোয়া করেন। কৃতজ্ঞতা জানান মাবুদের কাছে। গল্প বলেন মেয়েদের। কোন ভেড়াটা পাঁজি। দলছুট হয়ে যায় কোনটা, এসব গল্প।

চার কন্যা নিয়ে বেশ কাটছিল তাদের। প্রকৃতির বুঝি হিংসা হল মনে। হঠাৎ খরা দেখা দিল বসরাজুড়ে। দুর্ভিক্ষ এলো খরার পায়ে পায়ে। প্রথমে মা। পরপরই বাবা। বিদায় নিলেন। এতিম হল চার বোন। ভারি কষ্টে দিন যায়।

একদিন রাবেয়া হারিয়ে গেল। কেঁদে বুক ভাসাল তিন বোন। মরুপথে যাচ্ছিল এক দুষ্ট লোক। এলোমেলো হাঁটছিল রাবেয়া। ওকে জোর করে এক ধনীর কাছে নিয়ে বেচে দিল।

মাবুদের কী ইচ্ছা। জানেন কেবল তিনি। নয়া জীবন শুরু হল রাবেয়ার। সওদাগরের দাসী। দিনভর খাটায়। অকারণে কিল চড় মারে। আহা! এই কী ছিল ভাগ্যে। আর সইতে পারে না সওদাগরের অত্যাচার। একদিন পালাল। ‘অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকায়’। তাই হল রাবেয়ার।

হাত ভেঙে গেল হোঁচট খেয়ে পড়ে। চোখ ফেটে বুক ভেঙে কান্না এলো। জারজার কেঁদে মোনাজাত করল। ‘মা নেই। বাবা নেই। আমার কেউ নেই এ দুনিয়ায়। হে প্রিয় মাবুদ। দাসী হয়ে বন্দি হয়েছি। হাতটাও ভেঙে দিলা। তোমার দাসীগিরি এক হাতেই করব। আমার আফসোস নেই। চাই আমি তোমার দয়া। আমার জন্য তোমার দয়া আছে কিনা। বল, একটু বল।’

গহিন বুকের কান্না ফুরায় না। অভয় কণ্ঠ ভেসে এলো। কন্যা, কেঁদো না তুমি। গৌরব ছড়াব তোমার, ফেরেশতারা তোমাকে আদর করবেন রাবেয়া। মাবুদ যাকে অভয় দেন। সে পায় চিরশান্তি। মনিব বাড়ি ফিরে এলো রাবেয়া। ঘরের যাবতীয় কাজ সারেন। মনিবের সেবা করেন। দিনের কাজ শেষ হয়।

রাতে চুপি চুপি নিজের কাজ শুরু করেন। নামাজ পড়েন। তেলাওয়াত করে জিকিরে মগ্ন হন। এক রাতে। অচেনা শব্দ শোনেন মনিব। আওয়াজ যেন রাবেয়ার ঘরেই হচ্ছে। পায়ে পায়ে এগোলেন মনিব।

সিজদায় পড়ে রাবেয়া বলছে, ‘প্রিয় মাবুদ আমার। দিন যায় অন্যের দাস খেটে। মন মতো তোমাকে সেবা দিতে পারি না। চেয়ে থাকি কখন রাত নামবে। তোমার স্মরণ যে আমার চোখের আলো। সাধ্য থাকলে মুহূর্ত নষ্ট করতাম না। তোমার স্মরণে মজে থাকতাম। এসব শুনে অবাক চোখে দেখলেন মনিব, অলৌকিক এক আলো। সিজদারত রাবেয়ার শরীরে জ্যোতির্ময়তা ছড়াচ্ছে। নরম আলোয় ঘর ঝলমল করছে।

এ ঘটনার পর থেকে ভয় এলো মনে। খোদা আমাকে ছাড়বে না, মনিব ভাবল। মাবুদের ইচ্ছা মাবুদ পূরণ করেন। সকালে মনিব রাবেয়ার ঘরে ছুটে গেল। সাহস করে বলল, আমি তোমার সেবা করব। এ বাড়িতে যদি তুমি থাক। মানুষের দাস মাবুদের দাসী রাবেয়া মুক্তি চেয়ে নিল।

এর পর চিরকুমারী রাবেয়া মক্কা চলে যান। দিনভর ইবাদত-বন্দেগি শুরু করেন। নির্জনতা আর মাবুদের প্রেম, এ দুটিই হল তার সঙ্গী। রাতদিন মোরাকাবা, জিকির ইবাদতে মগ্ন হলেন। মাবুদ খুশি হয়ে তার সব চাওয়া পূর্ণ করেন।

ঐশী জ্ঞান দান করেন। দলে দলে মানুষ এলো তার ধর্ম সবক নিতে। তার উপদেশে তৃপ্ত হল। সে সময়ের বড় দরবেশ হোসাইন বসরি। তিনি বলতেন, রাবেয়া কোথাও না শিখে আল্লাহ থেকে সব শিখেছেন। তার আছে অলৌকিক জ্ঞান। হোসাইন ধর্ম সভা করতেন সপ্তাহে একদিন। রাবেয়া যেতেন এ সভায়। এ

কদিন ধর্ম সভায় বহু ছোট বড় গণ্যমান্য ব্যক্তি এলেন। রাবেয়া এলেন না বলে হোসাইন নীরবতা সাধন করেন। কেউ কেউ বলল, এ কেমন? রাবেয়া একজন নারী। সে আসেনি বলে উপদেশই দেবেন না! আমরা কি মানুষ নই! হোসাইন মুচকি হেসে বললেন, যে শরবত হাতির জন্য তৈরি করেছি, তা কি পিঁপড়ের মুখে দিতে পারি।

হোসাইন একদিন জানতে চেয়েছিল রাবেয়া, তুমি এত বড় সম্মান কী করে অর্জন করলে? এ জীবনের সব কিছু হারিয়ে পেয়েছি বললেন রাবেয়া। হোসাইন জানতে চাইল আল্লাহকে তুমি কেমন জান?

রাবেয়া বললেন হোসাইন তুমি তাকে এমন ওমন জান। আমি জানি তিনি অপরূপ। হোসাইন বললেন, আখেরাতে যদি আমি মুহূর্ত না দেখব আল্লাহকে, তবে আমি এত বিলাপ করব যে অন্য দরবেশদের দয়া হবে। রাবেয়া বললেন, এ জীবনেই যদি মুহূর্ত মাত্র মাবুদকে হারিয়ে দুঃখ না পাও তবে পর জীবনে তা কী করে হবে। এ জীবন থেকেই পরজীবনের প্রাপ্তি।

* ছোট বয়সেই ছেলে বা মেয়েদের অন্তর ধোয়ার সবক নিতে হবে। তখন তারাও হতে পারবে রাবেয়া বসরির ঐশী জ্ঞানের অংশীদার। মাবুদ বলেছেন, বান্দার বুকে রুহ্ হয়ে আমিই বসত করি। যে নিজেকে চিনবে, সেই মাবুদকে জয় করবে।

রাবেয়া বসরির কিছু উক্তি : প্রভুর প্রেম পেলে মজে যাও প্রভুতে। যাকে ইচ্ছা হয় তাকেই মাবুদ তাওবা করার সুযোগ দেন। দুঃখ পেলে কৃতজ্ঞ হও, দৌলত পেলে হও যেমনটি। তবেই মাবুদ মিলবে। সাধনা করে জাগিয়ে তোল মন। জেগে থাকা আত্মার প্রয়োজন নেই কোনো বন্ধুর। এ রকম আত্মায় বসত করেন মাবুদ। অন্য বন্ধু কী প্রয়োজন মাবুদ বন্ধু হলে?

পৃথিবীখ্যাত সুফি গ্রন্থ

তাজকিরাতুল আউলিয়ার ভাব নিয়ে

লেখক : সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter