মহাসংকটে পরিবেশবান্ধব কীটপতঙ্গ

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শামীম আহমেদ

কীটপতঙ্গ।

প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই পৃথিবীতে কীটপতঙ্গের বিচরণ। প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে কীটপতঙ্গের আগমন ঘটে। এরপর বড় একটা সময়জুড়ে পৃথিবীর প্রায় সব প্রতিবেশেই এদের আধিপত্য ছিল। ওইসময় কীটপতঙ্গ আকারেও বেশ বড় ছিল, এক একটি গঙ্গাফড়িং ছিল গাঙচিল পাখির সমান। কালক্রমে বিবর্তনের ধারায় পৃথবীতে আবির্ভূত হয় পাখি, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী। একসঙ্গে কমতে থাকে কীটপতঙ্গের প্রভাব।

তবে আকারে ছোট হয়ে গেলেও প্রজাতিবৈচিত্র্য ও সংখ্যাধিক্যে এদের জুড়ি নেই। বর্তমান সময়েও আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য প্রজাতির কীটপতঙ্গ। প্রাণিজগতে সবচেয়ে বেশি প্রজাতি আছে কীটপতঙ্গ শ্রেণীতে, পৃথিবীতে আবিষ্কৃত প্রাণিজগতের প্রায় ৮০ শতাংশই কীটপতঙ্গ। বর্তমান সময় পর্যন্ত আবিষ্কৃত পতঙ্গের প্রজাতি সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার।

ছোট পিঁপড়া থেকে শুরু করে ঘরের কোণের আরশোলা এবং বাহারি প্রজাপতি ও ঘাসফড়িং সবই কীটপতঙ্গের অন্তর্ভুক্ত। মাটি থেকে শুরু করে গাছপালা, জলাশয়, ফসলের মাঠ এমনকি আমাদের বসতবাড়িতেও এদের দেখা যায়। কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবীর বুকে বিচরণকারী এ প্রাণীগুলো হয়ে উঠেছে প্রকৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরিবেশে বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের মাঝে যে আন্তঃসম্পর্ক ও খাদ্যজাল গড়ে উঠেছে তা কীটপতঙ্গ ছাড়া ভাবাই যায় না।

পতঙ্গ ছোট আকারের প্রাণী হলেও এদের জীবনচক্র বেশ জটিল এবং বৈচিত্র্যময়। প্রায় সব ধরনের কীটপতঙ্গ এদের জীবনচক্রে ৩ বা ৪টি ধাপ অতিক্রম করে। প্রজাপতি তার জীবদ্দশায় ৪টি ধাপ সম্পন্ন করে। প্রথমে স্ত্রী প্রজাপতি ডিম দেয়, এরপর ডিম থেকে লার্ভা, লার্ভা থেকে পিউপা এবং পিউপা থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতিতে পরিণত হয়। ঘাসফড়িং জাতীয় পতঙ্গ জীবনে ডিম, নিম্ফ ও পূর্ণাঙ্গ এ ৩টি ধাপ সম্পন্ন করে। কীটপতঙ্গের জীবনচক্রের এ ধরনের পরিবর্তনকে বলা হয় রূপান্তর। অনেক কীটপতঙ্গ এককভাবে জীবনযাপন করলেও কোনো কোনো পতঙ্গ দলবদ্ধ হয়ে সামাজিক জীবনযাপন করে। এদের দলবদ্ধ বসবাস অনেকটা মানুষের সামাজিক জীবনযাপনের মতোই। কীটপতঙ্গের সামাজিক জীবনে কাজের দায়িত্ব ভাগ করা থাকে। প্রতিটি দলের মধ্যে থাকে একটা রানী, কয়েকটা পুরুষ আর থাকে অসংখ্য শ্রমিক। সামাজিক জীবনযাপনের ফলে এদের মধ্যে এক ধরনের শ্রমবিভাগ দেখা যায়। শ্রমিকরা খাবার সংগ্রহ এবং বাসস্থানের দেখাশুনাসহ সব ধরনের কাজ করে থাকে। রানী ও পুরুষ মূলত বংশবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

কীটপতঙ্গকে আমরা সাধারণত ক্ষতিকর হিসেবে জানলেও প্রকৃতিতে রয়েছে এদের অপরিসীম উপকারী ভূমিকা। উদ্ভিদের পরাগায়ন থেকে শুরু করে প্রতিবেশে সার্বিক শৃঙ্খলা রক্ষা পায় কীটপতঙ্গের মাধ্যমে। কোনো কোনো পতঙ্গ ক্ষতিকর হলেও অধিকাংশ প্রজাতিই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আমাদের উপকার করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মৌমাছি, প্রজাপতি, রেশমকীট, ঘাসফড়িং ইত্যাদি। মৌমাছি ফুলে ফুলে ঘুরে মধু সংগ্রহ করে এবং মৌচাকে জমা করে।

এ মধু আর মোম অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ। এছাড়া মৌমাছি বিভিন্ন ফসলের পরাগায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রেশমকীট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পতঙ্গ। রেশমকীট পালনের মাধ্যমে উৎপন্ন করা হয় রেশম সুতা যা থেকে মূল্যবান বস্ত্রসামগ্রী তৈরি হয়। কীটপতঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল প্রজাপতি ও ঘাসফড়িং। রঙ-বেরঙের প্রজাপতির ওড়াউড়ি নিমেষেই মুগ্ধ করে মানুষকে।

শুধু সৌন্দর্য আর বর্ণিল বাহার নয়, ফুলে ফুলে ঘুরে পরাগায়নের মাধ্যমে পরিবেশের জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখতে এদের ভূমিকা অপরিসীম। পতঙ্গের আরেকটি সুপরিচিত দল পিঁপড়া। এরা মাটির গর্তে, গাছের কোটরে অথবা বিভিন্ন আসবাবপত্রের ফাঁকে বাসা বাঁধে। এরা খুবই সামাজিক। সারি বেঁধে চলাচল এবং খাদ্য সংগ্রহ করে। এদের বাড়ি ফেরা ও খাবার সংগ্রহের জন্য সূর্যালোকের কৌণিকতা নিরূপণ করে চলে। এরা আমাদের উচ্ছিষ্ট খাবার এবং অন্য মৃত পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশ সুন্দর রাখে।

প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ কীটপতঙ্গের অস্তিত্ব বর্তমানে হুমকির মুখে। পৃথিবীজুড়ে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে কীটপতঙ্গ। সম্প্রতি ‘বায়োলজিক্যাল কনজারভেশন’ বিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড ডিক্লাইন অফ দি এনটোমোফনা : এ রিভিউ অফ ইটস্ ড্রাইভারস’ নিবন্ধে উঠে এসেছে পোকামাকড়ের এ ভয়াবহ দুরাবস্থার তথ্য। বর্তমানে যে সংখ্যক কীটপতঙ্গ আছে আগামী এক দশকে এর ৪০ শতাংশই কমে যাবে।

বিগত কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানী ও সংরক্ষণবিদের অন্যতম দুশ্চিন্তা জলজ ও স্থলজ মেরুদণ্ডী বিভিন্ন প্রাণীর বিলুপ্তির আশঙ্কা। তবে নতুন এ নিবন্ধে উঠে এসছে স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপসহ বিভিন্ন মেরুদণ্ডী প্রাণীর চেয়ে কীটপতঙ্গের বিলুপ্তির হার প্রায় ৮ গুণ বেশি। বর্তমান সময়ের মতো ভয়াবহ অবস্থায় কখনও পতঙ্গের দল ছিল না। মূলত মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে পোকামাকড়ের এ ভয়াবহ দশা। তবে এর পাশাপাশি মাছি বা আরশোলার মতো যে পতঙ্গ মানুষের আবাসস্থলের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে এরা এ কাতারে নেই। এদের সংখ্যা বরং বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কীটপতঙ্গের বিপন্ন হওয়ার পেছনে বিজ্ঞানীরা চারটি প্রধান কারণ খুঁজে বের করেছেন। এগুলো হচ্ছে- ১. আবাস্থল ধ্বংস, তৃণভূমি ও বনভূমি পরিবর্তন করে কৃষি জমি তৈরি করা। পাশাপাশি বাড়ছে অপরিকল্পিত নগরায়ন, যার ফলে বিপন্ন হচ্ছে পতঙ্গকুল। কীটপতঙ্গের খাদ্য ও প্রজননের জন্য যে ধরনের আবাসস্থল প্রয়োজন তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ২. পরিবেশদূষণ, অধিক হারে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহার ত্বরান্বিত করছে বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তি। কৃষিতে অধিক উৎপাদনের আশায় ক্ষতিকর পতঙ্গের পাশাপাশি আমরা মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে উপকারী পতঙ্গও ধ্বংস করছি।

৩. জৈবিক সমস্যা, ভিনদেশি আগ্রাসী প্রজাতির দ্বারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কীটপতঙ্গ। এক প্রতিবেশের প্রাণী অন্য প্রতিবেশে স্থানান্তরের মাধ্যমে বিপদাপন্ন হয়ে পড়ছে অসংখ্য পতঙ্গ। ৪. বর্তমান সময়ে অন্যতম আলোচিত সমস্যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বা জলবায়ুর পরিবর্তন। এ সমস্যার কারণে ভয়াবহ সংকটর মুখে গোটা পৃথিবী। জলবায়ুর পরিবর্তনে একদিকে যেমন বাড়ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ তেমনি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বেশি সংখ্যক পতঙ্গের প্রজাতি। কীটপতঙ্গের এ বিলুপ্তি পরিবেশের ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমাদের মাঠের ফসলের প্রায় ৭৫ শতাংশ পরাগায়ন করে কীটপতঙ্গ। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে মানবসমাজের ওপর।

কীটপতঙ্গের পাশাপাশি মানবসভ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। শিল্পায়ন, নগরায়ন বা কৃষি কাজের মাধ্যমে পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের কথা মাথায় রেখেই উন্নয়ন পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। পরিবেশদূষণ কমিয়ে পৃথিবীকে বাসযোগ্য না রাখলে কীটপতঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও বিদায় ঘণ্টা বেজে যাবে। কীটপতঙ্গ নিয়ে বেশি বেশি গবেষণা করে এদের সংরক্ষণের পদক্ষেপ নিলে একদিকে যেমন অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে তেমনি জীববৈচিত্র্যও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে।

লেখক : কো-অর্ডিনেটর, রিসার্চ অ্যান্ড পালিকেশন্স, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন