গল্পকার জাতকের কক্কারু ফল

  মো. মিজানুর রহমান ১৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পালি সাহিত্যের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘জাতক’ বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান ধর্মীয় গ্রন্থ ‘ত্রিপিটক’-এর অন্তর্গত। বলা হয়ে থাকে জাতক হল পৃথিবীর সব ছোট গল্পের উৎস।

‘ত্রিবিধ কক্কারু জন্মে সেই সরোবরে;

কুম্ভের সমান একপ্রকার তাহার;

আর দুটি মৃদঙ্গের সম-আয়তন।’

কক্কারু শব্দটির অর্থ বল্লিফল বা লতানো গাছের ফল। পালি অভিধানে কক্কারু বলতে লাউ, কুমড়া ইত্যাদি লতানো গাছের ফলকে বুঝায়। উপমহাদেশে যে লাউ পাওয়া যায় সেটি দেখতে কলসের মতো। আদিকাল থেকেই এ অঞ্চলে চালকুমড়া বা ছাঁচিকুমড়া জন্মে সেটি দেখতে মৃদঙ্গের মতো। তাই হয়তো শ্লোকে এই ফলগুলোকে কুম্ভ বা মৃদঙ্গের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

লাউ : আমাদের অতি পরিচিত লতানো উদ্ভিদ লাউ। লাউয়ের আদি শব্দ ইক্ষাকু (তিতা লাউ) ও তুম্বি (মিষ্টি লাউ)। এ শব্দগুলো বৈদিক। লাউয়ের কথা অর্থবেদে উল্লেখ আছে। এ ফল দিয়েই সন্ন্যাসীদের ভিক্ষাপাত্র নির্মিত হতো। পরবর্তীকালে চরক ও সুশ্রুতসহ সব সংহিতা ও নিঘণ্টুর গ্রন্থে লাউয়ের গুণের কথা উল্লেখ আছে। লাউ পৃথিবীর প্রাচীনতম সবজিগুলোর একটি। এর আদি নিবাস কোথায় বলা কঠিন। ধারণা করা হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৩ হাজার বছর আগে পেরুতে এর প্রথম চাষ হয়।

লাউ প্রাণশক্তি ও দ্রুতবৃদ্ধি সম্পূর্ণ বর্ষজীবী, আকর্ষীওয়ালা, আকর্ষণীয় লতানো আরোহী উদ্ভিদ। লাউয়ের লতানো কাণ্ড মাটি, ঝাকা, ঘরের চাল বা অন্য কোনো বৃক্ষজাতীয় গাছে আকর্ষীর মাধ্যমে গড়িয়ে থাকে। কাণ্ড শিরাবিশিষ্ট ও চুলের মতো ঘন লোম দ্বারা আবৃত। পত্রবৃন্ত ও পাতা বড়। পাতা হৃদপিণ্ডাকার, কিডনি আকার, উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার ও পাঁচ কোণবিশিষ্ট। নরম, রোমশ, কিনারা দাঁতালো, রং সবুজ। শিরাগুলো স্পষ্ট, জালির মতো, নিচের পিঠে গ্রন্থিময়। পাতার কুক্ষি থেকে একক পুষ্পদণ্ড বের হয়। পুষ্পদণ্ড রোমশ। স্ত্রী ও পুরুষ ফুল আলাদা ও দেখতে প্রায় একই রকম। পুরুষ ফুলের পুষ্পদণ্ড লম্বা ও স্ত্রী ফুলেরটি ছোট। ফুল আকর্ষণীয়, রং সাদা, পাপড়ি পাঁচটি। ফল বড়। আকার বিভিন্ন, যেমন- গোল, লম্বা, গোড়ার দিক চিকন ও আগার দিক মোটা, আবার আগা-গোড়া মোটা মাঝখানে চিকন। ফল রোমশ, রং সবুজ বা হলুদাভ সবুজ। ফলের ভেতরে অনেক বীজ থাকে। বীজের রং সাদা, আয়তাকার, চ্যাপ্টা, সামান্য বাঁকা, বীজের পিঠে সমান্তরাল রেখা আছে। বীজ থেকেই বংশবিস্তার।

চালকুমড়া : কুমড়া অনেক প্রকার। চালকুমড়া, ক্ষেত কুমড়া, মিষ্টি কুমড়া। মিষ্টি কুমড়া আমাদের দেশ তথা উপমহাদেশে খুবই জনপ্রিয়। কিন্তু এটি যেহেতু উপমহাদেশের বাইরের ফসল, জাতকে উল্লেখিত গাছ-গাছড়ার তালিকায় এ নাম আসবে না। তাই চালকুমড়ার আলোচনা করা হল।

চালকুমড়া আমাদের অতি পরিচিতি লাতানো উদ্ভিদ। গ্রামাঞ্চলে ঘরের চালে বাওয়ানো হয় এবং চালেই ফুল ও ফল হয়। তাই হয়তো এর নাম চালকুমড়া। এটি খুবই জনপ্রিয় সবজি, কিন্তু এর আদি নিবাস অজ্ঞাত। ধারণা করা হয়, জাপান ও জাভা দ্বীপ এর আদি নিবাস। পৃথিবীর উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলে কম-বেশি চাষ করা হয়। পুষ্টির জন্য ও লোকায়ত চিকিৎসায় এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। চালকুমড়ার কথা বেদে উল্লেখ আছে। এর আদি নাম পর্বফলা ও কুষ্মাণ্ড। দুটিই বৈদিক নাম। চরক ও সুশ্রুতসহ পরবর্তীকালে সব সংহিতা ও নিঘণ্টুর গ্রন্থে চালকুমড়ার কথা উল্লেখ আছে। বেদের সূত্র ধরে বলা যায়, চালকুমড়া হাজার হাজার বছর ধরে এ উপমহাদেশে চাষ হয়ে আসছে। চালকুমড়া বলিষ্ঠ বা শক্তসমর্থ দ্রুতবৃদ্ধি সম্পূর্ণ বর্ষজীবী লতানো আরোহী উদ্ভিদ। চালকুমড়ার কাণ্ড ও পাতায় সাদা লোম থাকে। পত্রবৃন্ত লম্বা ও রোমশ। পাতা গোলাকার, বৃক্কাকার বা হৃদয়াকার, উভয় পিঠ অমসৃণ। পাতায় ৫ থেকে ৭টি ত্রিকোণাকার লতি থাকে, আগা সূক্ষ্মাগ্র। কিনারা খাঁজকাটা ও ঢেউখেলানো, রং সবুজ। শিরাগুলো স্পষ্ট, জালির মতো, নিচের পিঠে গ্রন্থিময়। পাতার কুক্ষি থেকে আকর্ষী ও পুষ্পদণ্ড বের হয়। পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা। পুরুষ পুষ্পদণ্ড স্ত্রী পুষ্পদণ্ড অপেক্ষা বড়। বৃতি রোমশ, ভল্লাকার, আগা সূক্ষ্মাগ্র। ফুল রোমশ, রং হলুদ। পাপড়ি ৫টি, ছড়ানো, ডিম্বাকার অর্থাৎ গোড়ার দিক চিকন আগার দিক মোটা। ফল সাধারণত লম্বা। কচি ফল রোমশ, রং সবুজ বা গাঢ় সবুজ। আস্তে আস্তে ফল বড় হতে থাকে এবং গায়ে এক প্রকার সাদা আবরণ পড়তে থাকে। পরিপক্ব ফলের গা পুরোপুরি সাদা। তবে এ আবরণ অনেকটা অস্থায়ী। ঘষা লাগলে হাতে সাদা রং লেগে যায়। সাদা আবরণের নিচের রং সবুজ। ফলের ভেতরে শাঁসের মাঝে অনেক বীজ থাকে। বীজের রং ফ্যাকাশে হলুদ বা সাদা। বীজ থেকেই বংশবিস্তার করে। বছরে শীত ও বর্ষায় দুবার এর চাষ করা যায়।

ফুটি : পালি অভিধানে ‘কক্কারিক’ নামে একটি শব্দ আছে, যার অর্থ ‘এক জাতীয় শসা। এলালুক’। এটি হয়তো বর্তমানের ‘ফুটি’ হবে। ‘ঋকবেদ’-এ এর নাম ‘উর্বারু’। পরে হল ‘এর্বারু’। চরক ও সুশ্রুতসহ পরবর্তীকালের অনেক সংহিতা ও নিঘণ্টুর গ্রন্থে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। চরক সংহিতায় উর্বারুর একটি ভেদ হিসেবে ‘বনত্রপুষী’র (ক্ষুদ্র কাঁকুড় বিশেষ) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন ‘বনত্রপুষী’র বর্তমান নাম ‘শসা’। বেদে যেহেতু এর উল্লেখ আছে, তাই বলা যেতে পারে হাজার হাজার বছর ধরে ফুটি উপমহাদেশে আছে। ধারণা করা হয় ফুটির আদি নিবাস এশিয়া। যদিও বর্তমানে এর আদি বৈশিষ্ট্য অজ্ঞাত।

ফুটি বর্ষজীবী আকর্ষীযুক্ত লতানো উদ্ভিদ, যা মাটিতে গড়িয়ে বৃদ্ধি পায়। কাণ্ড রোমশ; কাণ্ড থেকে পত্রদণ্ড বের হয়। পাতা বৃত্তাকার, উপবৃত্তাকার বা হৃদপিণ্ডাকার। পাতায় ৫টি লতি আছে, যেগুলো গোলাকার ও কোণযুক্ত। পত্রদণ্ড ও পাতা চুলের মতো লোমদ্বারা আবৃত, কিনারা দাঁতালো ও ঢেউখেলানো। রং গাঢ় সবুজ, শিরাগুলো স্পষ্ট, জালির মতো, নিচের পিঠে গ্রন্থিময়। পাতার কুক্ষি থেকে পুষ্পদণ্ড বের হয়। একই গাছে পুরুষ ও স্ত্রীফুল হয়। ফুল রোমশ, রং হলুদ। পাপড়ি ৫টি, ডিম্বাকার। পুরুষ ফুল ছড়ানো, পুংকেশ ফুলের ভিতরে হয়। স্ত্রীফুল ফলসহ হয়। ফল বড়, গোলাকার ও লম্বা, মাঝে মোটা উভয় দিক ক্রমশ কিছুটা সরু। কচি ফল হালকা রোমশ, রং সবুজ। পাকা ফল মসৃণ, রং হলুদ। কোনো ফলের গায়ে অনেকগুলো লম্বা শিরা থাকে, আবার কোনো ফলে লম্বা অগভীর খাঁজ থাকে। পাকা ফল আপনি ফেটে যায়। বীজ আয়তাকার, রং সাদা বা হলুদাভ সাদা। বীজ থেকেই বংশবিস্তার।

মৃদঙ্গের মতো দেখতে আরেকটি লতানো ফলের নাম তরমুজ। আদি নাম কালিঙ্গ বা কলিঙ্গ। ভৈষজ্য গ্রন্থের মধ্যে চরক সংহিতায় প্রথম কালিঙ্গ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাই বলা যেতে পারে হাজার হাজার বছর ধরে উপমহাদেশে তরমুজ রয়েছে। কিন্তু জাতকে উল্লেখিত কক্কারুর ক্ষেত্রে তরমুজ হওয়ার সম্ভাবনা কম মনে হওয়ায় এর আলোচনা করা হল না। কেননা তরমুজ উষ্ণমণ্ডীয় অঞ্চলের ফসল। জাতকের কাহিনীর স্থানগুলো বেশিরভাগই হিমালয় বা এর আশপাশের অঞ্চলের, যেখানে ঠাণ্ডা বেশি।

লেখক : প্রকৃতিবিষয়ক লেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×