বিশ্বময় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

মশার সুদিন, ঝুঁকিতে পেঙ্গুইন

  অজয় দাশগুপ্ত ১১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পেঙ্গুইন ছানা বিপদে পড়লেও খুশি কিন্তু মশককুল। বাংলাদেশসহ বিশ্বের সর্বত্র মশা মানুষের জন্য রীতিমতো উৎপাত সৃষ্টিকারী প্রাণী। আকারে ক্ষুদ্র, কিন্তু জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে এদের জুড়ি নেই। রক্তচোষা এ প্রাণী পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে চলতে দারুণ পারঙ্গম। পাঁচ দশক আগে বরিশালের গ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়তে আসি, জগন্নাথ হলের বড় ভাইদের কাছে শুনেছি- মশা দোতলা পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে না। এদের ছোবল পড়ে কেবল নিচতলার রুমে থাকা নবাগতদের গায়ে। দোতলা-তিনতলায় যাদের রুম, তাদের কেন ঘুমানোর সময় মশারি খাটাতে হয় না- প্রশ্ন করলে তারা জানান এ তথ্য। কিন্তু এখন তো মশকবাহিনী রাজধানী ঢাকা এবং দেশের অন্যান্য শহরে ১৮ থেকে ২০ তলা উঁচু ভবনেও উড়ে গিয়ে জুড়ে বসে!

মশার কামড়ের কারণে বহু ধরনের রোগ হয়। ম্যালেরিয়ার কথা আমরা জানি। কত মানুষের যে মৃত্যু ঘটেছে এ রোগে, তার হিসাব রাখা কঠিন। ২০১৫ সালে বিশ্বে প্রায় ২১ কোটি লোক ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিল। মৃত্যু ঘটেছিল ৪ লাখ ২৯ হাজারের বেশি মানুষের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। এ অভিযানে জড়িত প্রায় পাঁচ লাখ সৈন্য ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। এদের মধ্যে মৃত্যু ঘটে অন্তত ৬০ হাজার জনের।

বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় এক সময় সামরিক বাহিনীর তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়। সে সময়ে অনেক সৈন্য মশার উৎপাতে অতিষ্ঠ ছিল।

বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ম্যালেরিয়ার দাপট ছিল শতাধিক দেশে। এখন এ রোগের চিকিৎসার জন্য একাধিক ওষুধ বাজারে রয়েছে। কিন্তু এককালে অতিশয় তেতো ওষুধ কুইনাইনই ছিল একমাত্র ভরসা। ম্যালেরিয়া নির্মূল করার বিষয় নিয়ে সফল গবেষণা করার জন্য একাধিক ব্যক্তিকে চিকিৎসা শাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু স্বস্তি নেই। বাংলাদেশের তরুণ অর্থনীতিবিদ সৌর দাশগুপ্ত পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় নিয়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কী প্রভাব পড়ছে এবং ভবিষ্যতে পড়তে পারে, সেটা জানা যায় তার গবেষণা থেকে। তার পূর্বাভাস, এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত লোকের সংখ্যা বর্তমানের চেয়ে ২০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে। কেন ম্যালেরিয়া বাড়বে? কারণ মশার মতো অনেক বিপজ্জনক প্রাণীর বাড়বাড়ন্তের জন্য উষ্ণ পরিবেশ উপযোগী। আমরা জানি, জলবায়ু পরিবর্তন যে ঘটছে তার প্রধান কারণ ভূমণ্ডলে উষ্ণতা বেড়ে যাওয়া। সৌর দাশগুপ্ত জানান, বাংলাদেশেও ম্যালেরিয়া জাঁকিয়ে বসার ঝুঁকি রয়েছে। তিনি আরও জানান, উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় অনেক ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়বে। ‘ক্লাইমেট-মাইগ্রেসন’ বাড়বে। অনেক লোক দেশের মধ্যেই উপকূলীয় এলাকা থেকে অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় স্থায়ীভাবে চলে যাবে। এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা যাবে।

শুরুতেই বলেছি, মশার জন্য সুখবর হলেও পেঙ্গুইনের জন্য দুঃসময় ইতিমধ্যেই এসে গেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রতিকূল আবহাওয়ার জেরে উধাও এম্পেরর পেঙ্গুইনের একটি পুরো কলোনি! কয়েক বছর আগেও যেখানে বরফের চাদরে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত ‘হ্যাপি ফিট’গুলোকে, এখন সেখানে অবস্থান করছে গুটিকয়েক! এ বিপর্যয়ের কারণ লুকিয়ে আছে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের বৈরী আবহাওয়ায়। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত নিবন্ধ আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী অ্যান্টার্কটিক সায়েন্সে প্রকাশিত হয়েছে।

পেঙ্গুইনের মধ্যে এই এম্পেরর প্রজাতিই সবচেয়ে বড়। এদের জন্ম থেকে শুরু করে গোটা জীবনটাই কাটে লবণাক্ত জল ও বরফের আস্তরণের ওপর। তবে চেহারা বিশাল হলেও এম্পেরর পেঙ্গুইন ঝড়ঝাঁপটা বিশেষ সামলাতে পারে না। এরা মাটিতে হাঁটাচলা করতে পারে, তবে বরফের প্রাচীর বেয়ে উঠতে পারে না। ফলে বসবাসের পরিস্থিতিতে সামান্য হেরফের হলেই মুশকিলে পড়ে যায়। চার বছর আগে ‘এল নিনো’র প্রভাবে তখন রেকর্ড পরিমাণ কম বরফ জমেছিল কুমেরুর ‘হ্যালে বে’ এলাকায়। গোটা সেপ্টেম্বর মাস ধরেই চলছিল প্রবল ঝড়ঝঞ্ঝা। এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত সময়টা এই পেঙ্গুইনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ সময়েই এদের ছানাগুলো বেড়ে ওঠে, পালক গজিয়ে ওঠে এবং প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু সে বছর পেঙ্গুইনের ছানা পরিণত হয়ে ওঠার আগেই প্রতিকূল হয়ে উঠেছিল আবহাওয়া, যার জেরে ১০ হাজারেরও বেশি ছানার মৃত্যু হয়েছিল। প্রাণভয়ে ঠিকানা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল বাকি পেঙ্গুইন। ক্যামব্রিজের ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের সংরক্ষণ বায়োলজির বিভাগীয় প্রধান ফিল ট্রথান জানান, উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবিতে দেখা গেছে, ৩৫ মাইল দূরের ডওসন-ল্যাম্বটন কলোনিতে চলে গেছে ওই এলাকার এম্পেরর পেঙ্গুইন।

এ ঘটনায় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দুই ধরনের মত রয়েছে। একাংশের বক্তব্য, এত দিন বলা হচ্ছিল, বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে কয়েক দশকের মধ্যে পেঙ্গুইনের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাবে। কিন্তু ২০১৫ সালের এই ঘটনা সেই ভবিষ্যদ্বাণীর অংশ ছিল না। এ থেকে স্পষ্ট, বিপর্যয় যে কোনো সময়ে হঠাৎ সামনে এসে উদয় হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের অন্য একটি অংশ অবশ্য পেঙ্গুইনগুলোর এই ঠিকানাবদলে খুশি। তাদের বক্তব্য, আগামী দিনে জলবায়ু যে আরও খামখেয়ালি হতে চলেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে প্রাণ বাঁচানোর কৌশল সবাইকেই শিখতে হবে। পেঙ্গুইনের মতো প্রজাতির মধ্যে যে নতুন ঠিকানার খোঁজ করার তাগিদ তৈরি হয়েছে, তাতে আশার আলোই দেখছেন বিজ্ঞানীরা।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে পেঙ্গুইনের ওপরও। অ্যান্টার্কটিকা এলাকায় সাগরে বরফের পুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য সংকটে পড়েছে এই নিরীহ প্রাণীগুলো। ফলে অনাহারে মৃত্যু হচ্ছে হাজার হাজার পেঙ্গুইন ছানার।

পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, অ্যান্টার্কটিকায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে খাদ্য সংগ্রহে মা-পেঙ্গুইনকে চলে যেতে হচ্ছে অনেক দূরে। আর এদিকে খাবারের অপেক্ষা করতে করতে বাচ্চাগুলোর মৃত্যু ঘটছে।

ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ডলাইফ ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় ২০১০ সাল থেকে ফ্রান্সের বিজ্ঞানী ইয়ান রুপার্ট-কাউডার পূর্ব অ্যান্টার্টিকা এলাকায় ১৮ হাজার জোড়া অ্যাডেলি পেঙ্গুইনের ওপর গবেষণা করে এ তথ্য জানিয়েছেন। গবেষণায় তিনি দেখতে পান, সমুদ্রে বরফের আস্তরণ অত্যাধিক পুরু হওয়ায় অ্যান্টার্কটিকায় খাদ্য ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। তিনি চলতি বছরের প্রথমদিকে দেখতে পান, ওই ১৮ হাজার জোড়া পেঙ্গুইন কয়েক হাজার বাচ্চা জন্ম দিলেও তার মধ্যে মাত্র দুটি বাচ্চা বেঁচে রয়েছে। কাউডার বলেন, পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে খাবার সংগ্রহের সময়ের তারতম্য ঘটার কারণে এই বিপর্যয় ঘটছে। জলবায়ু পরিবর্তনে সরাসরি ক্ষতির শিকার হচ্ছে পেঙ্গুইন ছানা।

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×