নতুন পাখি পেল বাংলাদেশ

প্রকাশ : ১১ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আ ন ম আমিনুর রহমান

২০১৯ সালের ১৯ এপ্রিলের ঘটনা। পক্ষী আলোকচিত্রী মো. আবু কাইয়ুম খাজা অন্যদের সঙ্গে বগুড়ার শাহজাহানপুর গ্রামে আমগাছ ও বাঁশঝাড়ের বাগানে দুধরাজ পাখির ছবি তোলায় মগ্ন। এমন সময় ছোট একটি পাখি উড়ে গিয়ে বসল বাঁশের কঞ্চিতে। দ্রুত পাখিটির ছবি তুলল সে। দ্বিতীয়বার ছবি তোলার সুযোগ না দিয়ে পাখিটি উড়ে গেল। বাঁশপাতার আড়ালে পাখিটির দেহের উপরের অংশ কিছুটা ঢাকা পড়লেও লেজটা স্পষ্ট ধরা দিল। পরে পাখি বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে পাখিটির পরিচয় পেয়ে আনন্দে আত্মহারা খাজা। তার দেখা নতুন পাখিটি বাংলাদেশের পাখি প্রজাতির সংখ্যা ৭০১-এ উন্নীত করল। কাজে ব্যস্ত থাকায় শাহজাহানপুর যেতে আমার এক সপ্তাহ দেরি হয়ে গেল। ফলে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও কাক্সিক্ষত পাখিটির দেখা পেলাম না।

সদ্য পাওয়া ছোট থেকে মাঝারি আকারের পাখিটির ইংরেজি নাম Rusty-tailed Flycatcher. এদেশের পাখির তালিকায় এর কোনো বাংলা নাম নেই। তবে ইংরেজি নামের বাংলা করলে দাঁড়ায় মরচে-লেজ চটক। বৈজ্ঞানিক নাম Ficedula ruficauda. ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষ করে, নেপাল, উত্তর ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তানে পাখিটির মূল আবাস। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতেও এদের দেখা মেলে।

হিমালয়ের পাদদেশ ও আশপাশে বসবাসকারী পাখি সচরাচর পরিযায়ন করে না। তবে মধ্য এশিয়ার পাখি শীতে ভারতের আরব সাগরের উপকূল, কর্নাটক ও কেরালা পর্যন্ত পরিযায়ন করে। এছাড়া ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে এদের যাযাবর হিসেবে দেখা যায়। সেই অর্থে বাংলাদেশে যাযাবর হয়ে এসেছিল পাখিটি। বগুড়া ছাড়া মরচে-লেজ চটককে ঢাকার পূর্বাঞ্চলেও দেখা গেছে। এরা লম্বায় ১৪ সেন্টিমিটার। ওজনে ১১-১৬ গ্রাম। চ্যাপ্টা মাথাসহ দেহের উপরটা উষ্ণ বাদামি। গলা ও বুক গাঢ় বাদামি। পেট ও দেহতল সাদাটে। চক্ষুরেখা ও ভ্রু অস্পষ্ট। কোমর ও লেজ মরচে-লাল। আর লেজের এই মরচে-লালের কারণেই পাখিটির নাম মরচে-লেজ চটক। গাঢ় রঙের চোখ তুলনামূলকভাবে বড়। কালচে-ধূসর চঞ্চুর নিচটা কমলা। পা-আঙুল-পায়ের পাতা ও নখ কালচে-ধূসর। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। হলদে দাগছোপসহ অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের উপরটা গাঢ় বাদামি; নিচের অংশ ফ্যাকাশে হলদে-বাদামি ছিটযুক্ত।

এরা বড় পাতাওয়ালা গাছের বন ও মিশ্র পাতাঝরা বনের বাসিন্দা। তবে গ্রামীণ বন-বাদাড়েও দেখা গেছে। দিবাচর পাখিগুলো সচরাচর একাকী বিচরণ করে। এদের খাদ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও মাছিসহ বিভিন্ন ধরনের পতঙ্গ খায় বলে জানা যায়। মরচে-লেজ চটকের মে-জুলাই প্রজননকাল। গাছের ডালে মস, ছাল, চুল, লাইকেন ইত্যাদি দিয়ে ছোট্ট কাপ আকারের বাসা বানায়। ডিম ফোটে ১২ থেকে ১৪ দিনে। ছানারা দু’সপ্তাহের কম সময়ে উড়তে শেখে।

লেখক : বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী, প্রাণিচিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক