প্রকৃতিময় হোক গতিময় জীবন

  এস এম মুকুল ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাছ মানুষের পরম বন্ধু। গাছ ছায়া দেয়, জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন দেয়, হাইড্রোজেন গ্রহণ করে। ফল দেয়, ফুল দেয়। জ্বালানি ও আসবাবপত্রের জোগান আসে গাছ থেকে। জলবায়ুর তীক্ষ্ণতাকে উপশম, মাটি সংরক্ষণ, বৃষ্টি-বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ঝড়-ঝঞ্ঝা, সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধ, শীত-গ্রীষ্মকে অনুকূল রাখা এবং বাতাস ও পানির বেগকে আটকে দিয়ে ভূমিক্ষয় রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে গাছ। কাজেই বৃক্ষরোপণকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। জীবনধারণের জন্য বিশুদ্ধ অক্সিজেন বাতাসে ছেড়ে গাছ আমাদের বেঁচে থাকতে সহায়তা করে। আমরা অনেকেই জানি না, একটি গাছ বছরজুড়ে ১০টি এয়ার কন্ডিশনারের সমপরিমাণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করে। ৬০ পাউন্ডের বেশি ক্ষতিকারক গ্যাস বাতাস থেকে শুষে নেয়। ৭৫০ গ্যালন বৃষ্টির পানি শোষণ করে। এক হেক্টর এলাকার গাছ তিন মেট্রিক টন বায়ু গ্রহণ করে। দুই মেট্রিক টন বিশুদ্ধ অক্সিজেন প্রদান করে।

আগামী প্রজন্মের কথা চিন্তা করে জেলা বা উপজেলার নার্সারি কিংবা বৃক্ষমেলা থেকে চারা সংগ্রহ করে ভেষজ-ফলদ-ঔষধি গাছ লাগাতে হবে। সরকারের উদ্যোগে গাছ লাগানোর অনেক সুযোগ রয়েছে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি অফিস, খাস জমি, রাস্তার দু’পাশ, নদীর দু’পার, রেল সড়কের দু’পাশ এবং উপকূলীয় এলাকায় প্রচুর গাছ লাগানোর সুযোগ আছে। হাওরে পানিসহিষ্ণু হিজল ও করচ গাছ লাগিয়ে বাগ বা জঙ্গল তৈরি করা যেতে পারে। রাজধানী ঢাকাসহ সব সিটি কর্পোরেশন, পৌর শহর, উপজেলা বা থানা পর্যায়ে শহরের ভেতরে রাস্তার মাঝখানে ডালপালা কম হয়, উঁচু ও দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগালে পাঁচ বছরে আমাদের শহরগুলোও সবুজ হয়ে উঠবে। জার্মানিতে শতকরা ১২ ভাগ ছাদ সবুজ এবং টোকিও আইনে সব নতুন ছাদের অন্তত ২০ ভাগ সবুজ রাখার কথা বলা হয়েছে। টোকিও সরকারের গবেষণা ও বিশ্লেষণ তথ্যে উল্লেখ করা হয়, যদি তাদের অর্ধেক ছাদ সবুজ হয় তাহলে প্রতিদিন এয়ার কন্ডিশনে ব্যবহৃত জ্বালানি বাবদ এক মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হবে। সিঙ্গাপুরে রুফটপ গার্ডেনিং বিষয়ক এক গবেষণা তথ্যে দেখা গেছে, পাঁচতলা বাণিজ্যিক ভবনের ছাদে একটি বাগান বছরে জ্বালানি খরচের ০.৬ থেকে ১৪.৫ ভাগ সাশ্রয় হতে পারে। অনেক উন্নত দেশে ভবন গরম ও শীতলকরণে ৩০ ভাগ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হয়ে থাকে।

অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে বিষিয়ে উঠছে ঢাকার পরিবেশ। এ কারণে শহরের তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষা, বায়ুদূষণ, নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, বিষমুক্ত সবজি, ফল প্রাপ্তিতে ছাদে বাগান তৈরির জন্য উৎসাহব্যঞ্জক কার্যকরী নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। আরেকটি খবর হল- ছাদের সবুজ স্তর বিভিন্ন ট্রান্সমিটিং স্টেশন থেকে নিঃসরিত ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভকে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রতিহত করে। এক্ষেত্রে চীনের উদ্যোগটি অনুসরণীয় হতে পারে। গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে ধারণা নিতে এবং জীবনযাত্রার পার্থক্য অনুধাবনের জন্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চংকিং শহর কর্তৃপক্ষ শহরের শিক্ষার্থীদের গ্রামে পাঠায়। গ্রামে অবস্থানের সময় প্রায় সাড়ে ৭ লাখ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককেই ১০০টি করে চারা গাছ রোপণ করতে হয়। তাদের ধারণা- এসব শিক্ষার্থীর জীবনবোধ হবে মানবীয়, প্রজন্মগত ও ভৌগোলিক দূরত্ব কমানো সম্ভব হবে।

মানব জীবনে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত গাছ আমাদের পরম সহযোগী ও সঙ্গী। ইসলামের দৃষ্টিতে বৃক্ষরোপণকে সদকায়ে জারিয়া হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সব সময়ই বৃক্ষরোপণে মানুষকে উদ্বুদ্ধ ও গাছের সঠিক পরিচর্যা করার উপদেশ দিতেন। এক ভিক্ষুকের বৃক্ষরোপণের গল্প শুনুন- নওগাঁ জেলার ভিমপুর ইউনিয়নের শিকারপুর গ্রামের শতোর্ধ্ব বয়সী বৃদ্ধ গহের আলী। ফলদ বা দামি বনজ গাছের চারা কেনার সামর্থ্য না থাকায় চাল-ডালের সঙ্গে তালের আঁটি ভিক্ষের ঝুলিতে করে বয়ে এনে পুঁতে দেন সরকারি রাস্তার দু’পাশে। পরিচর্যা করেন। এমনি করেই প্রায় ১৮ হাজারেরও বেশি তালের গাছ লাগিয়ে বিরল বৃক্ষপ্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে প্রথমবারের মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জাতীয় পরিবেশ পদক-২০০৯ গ্রহণ করেন গহের আলী। ২৭ ডিসেম্বর ২০১০ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

আরেক বৃক্ষপ্রেমিক চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় মনাকুশাই ইউনিয়নের তারারামপুর গ্রামের বাসিন্দা কার্তিক প্রামাণিক। বৃক্ষই তার ধ্যান-জ্ঞান, সাধ ও সাধনা। তার এই বৃক্ষপ্রেমের প্রতিফলন নিজ গ্রামে সবুজের সমারোহের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কার্তিক প্রামাণিকের বৃক্ষপ্রেমের এই গল্পের বয়সও প্রায় ৬০ বছর। জীবনের এ দীর্ঘ সময় তিনি নিভৃতে আপন সন্তানের মতো গাছ লাগিয়ে, পরিচর্যা করে বড় করে তুলেছেন। বৃক্ষপ্রেমে তারও মিলেছে স্বীকৃতি।

আরেক ফলদ বৃক্ষপ্রেমীকের নাম আবদুল আজিজ কোম্পানি। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার শালিয়াবহ গ্রামে ১৯৮৩ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কলা চাষের মাধ্যমে ফল চাষের যাত্রা শুরু করে নিজের ছয় একর জমিতে বিশাল ফলের বাগান করেছেন তিনি। আজিজ কোম্পানির বাগানে প্রায় পাঁচ হাজার রকমের ফলের ও ঔষধি গাছ রয়েছে।

টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার নারিকেল বাড়িয়া ইউনিয়নের পশ্চিমা গ্রামের মফিজুর রহমান মফিজ আজ কোটি টাকার মালিক।

এবার শুনুন ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জের বৃক্ষপ্রেমিক আলাউল হক অলির সবুজ ভুবনের গল্প। এই বৃক্ষপ্রেমিকের নেশা-পেশায় জড়িয়ে আছে গাছ। অলি দেশ ও বিদেশ থেকে নানা প্রজাতির ফলদ, বনজ আর ঔষধি বৃক্ষ সংগ্রহ করে প্রায় ৬০ বিঘা জায়গাজুড়ে গড়ে তুলেছেন তার বৃক্ষ উদ্যান। গহের আলী, কার্তিক প্রামাণিক, আজিজ কোম্পানি, মফিজ আর অলির মতো আরও অনেক বৃক্ষপ্রেমিক আছেন যাদের একান্ত চেষ্টায় গড়ে ওঠা উদ্যান হতে পারে আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস।

কথায় আছে- গাছ সব মানুষকে ছায়া দেয়, এমনকি কাঠুরেকেও। গাছের শীতল ছায়া আর নির্মল বাতাস পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে রেখেছে। নির্বিঘ্নে সেই জীবন সহায়ক গাছ কেটে পৃথিবীকে মরুময় করে তুলছি আমরাই। দুঃখজনক হলেও সত্যি- আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলনেও বৃক্ষ উৎপাটনের মহোৎসব চলে। খুব বলতে ইচ্ছা করে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যদি দলের সদস্য-কর্মীদের প্রতিবছর ৩টি করে গাছ লাগাতে বাধ্য করত তাহলে ভেবে দেখুন ৩০ বছরের একজন কর্মীর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে অন্ততপক্ষে ৯০টি গাছ লাগানো সম্ভব হতো। এভাবে লাখো লাখো কর্মী গাছ লাগালে সবুজে ভরে উঠত বাংলাদেশ।

লেখক : বিশ্লেষক ও উন্নয়ন গবেষক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×