গাছের গায়ে পেরেকের ক্ষত

  মুকিত মজুমদার বাবু ২২ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গাছ সাজে। ঋতু পরিবর্তনে। কথা বলে। ভালোবাসার কথা। সুখ-দুঃখের কথা। গাছের প্রাণ আছে। বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু প্রমাণ করেছেন। ১৯১০ সালে তার গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফলাফল ‘জীব ও জড়ের সাড়া’ (Response in the Living and Non-Living) নামে একটি বইয়ে প্রকাশ করেন। তার গবেষণার ফলাফল বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দেয়। তিনিই প্রথম উদ্ভিদে প্রাণের অস্তিত্ব অনুধাবন করেন এবং তা প্রমাণ করতেও সক্ষম হন। কলম্বিয়ার মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জ্যাক সি. শুলৎজ চার দশক ধরে গাছ ও পোকামাকড় নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেন, গাছ অনেক ধীরপ্রকৃতির প্রাণী। সঠিকভাবে গাছের প্রতিক্রিয়া জানাতে এদের নিজস্ব ইন্দ্রীয় ব্যবহার করতে হয়। এমনকি সঙ্গীতের সুর শুনলেও গাছ নিজের প্রতিক্রিয়া জানায়। গাছ টিকে থাকতে লড়াই করে, খাবারের সন্ধান করে, শিকারির কৌশল এড়িয়ে যায় এবং নিজের শিকারকে ফাঁদেও ফেলে। এরা অন্যসব প্রাণীর মতো জীবন্ত এবং এদের আচরণ তা প্রকাশও করে। ফ্রান্সের লায়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অলিভিয়ার হামান্ট বলেন, গাছের এই আচরণ যদি দেখতে চান তবে ছোট একটি গাছকে পরিণত হওয়ার প্রতিটি ধাপ ভিডিও করে খুব দ্রুত চলচ্চিত্রের মতো করে দেখতে হবে। অত্যাধুনিক ক্যামেরায় গাছের জীবনচক্রকে বন্দি করেই বিজ্ঞানীরা গাছের এই জৈবিক আচরণ আবিষ্কার করেছেন।

তথ্যগুলো বিস্ময়ের হলেও সত্য। আগে তো আমরা জানতামই না গাছের প্রাণ আছে। গাছকে জড়বস্তু হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো। প্রাণীর কোনো মূল্যই দেয়া হতো না। এখন আমরা জেনেছি গাছের প্রাণের কথা। কিন্তু জানলেও তা মানছি না। গাছের কষ্ট হয় এ কথা বিশ্বাস করতে আমাদেরও কষ্ট হয়। তাই গাছকে আমরা রঙিন করে তুলি তার গায়ে পেরেক দিয়ে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন সেঁটে। শহরের অলি-গলি-মহল্লায়, রাস্তার পাশে, পার্কে- নির্বাচনী প্রচারণা, কম্পিউটারে ভর্তি, অফিস বদল, শাড়ির দোকানের ঠিকানা, চিকন স্বাস্থ্য মোটাকরণ, টিউশনি করতে চাই, কোচিং সেন্টার, গ্যারান্টি সহকারে ক্যান্সার ভালো হওয়াসহ বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে গাছগুলোকে সাজিয়ে তোলা হয়। কখনও কখনও ব্যানার টাঙাতে গাছের ডালপালা পর্যন্ত কাটা হয়। আমাদের শহরে এমন অনেক গাছ আছে যেগুলোর দিকে তাকালে পেরেকের ক্ষত স্পষ্ট চোখে পড়ে। ওই ক্ষতস্থানে পচনও শুরু হয়েছে। কোনো কোনো গাছ আবার পচনের কারণে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। আমাদের নিষ্ঠুরতা দিয়ে গাছকে রঙিন করে তুলি। কিন্তু কখনও গাছের কষ্টকে নিজের ভেতর অনুধাবন করার তাগিদ অনুভব করি না। গাছের সঙ্গে এ আমাদের কোন ধরনের নির্মমতা!

গাছের সঙ্গে আরও নিষ্ঠুরতা হল গাছের গোড়া ইট-সিমেন্ট-বালু দিয়ে বেঁধে দেয়া আর গাছ রেখে শিকড় কেটে রাস্তা প্রশস্ত করা। গাছের গোড়া বেঁধে দিলে গাছের শিকড় মাটি কামড়ে তার প্রয়োজনীয় রসদ জোগাড় করতে পারে না। ফলে ধীরে ধীরে গাছের মৃত্যু হয়। আবার রাস্তা প্রশস্ত করার সময় গাছের শিকড় কেটে ফেললে একটু বাতাসে যে কোনো সময় গাছ উপড়ে পরতে পারে। এতে মানুষের জানমালের ক্ষতি হতে পারে। অথচ এই ঘটনাই ঘটছে আমাদের শহরগুলোতে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক পথ পাড়ি দিয়েছি আমরা। এগিয়ে চলেছে সভ্যতা। এরপরও আমরা বুঝতে অক্ষম, গাছেরও প্রাণ আছে। এখনও গাছকে নিষ্প্রাণ ভেবে নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিচ্ছি। নির্বিচারে গাছ কাটছি। বন উজাড় করছি। অনেকে সচেতন হয়ে অসচেতন মানুষের মতো কাজ করছি।

গাছের কাছে আমরা ঋণী। আমরা সেই ঋণের প্রতিদান দিচ্ছি অসভ্য, বর্বর, বোধহীন মানুষের মতো। আমাদের শিক্ষা আছে, দীক্ষা আছে, জ্ঞান আছে, আছে গর্ব করার মতো অনেক কিছু। আমরা ভালো করেই বুঝি আমাদের ভালো-মন্দ। শুধু ব্যক্তিগত বা মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থের কারণে মানবজাতির ললাটে নেমে আসুক চরম বিপর্যয়- এমন অনাকাক্সিক্ষত চাওয়াটা কারও হতে পারে না। তাই সবার স্বার্থে, সবার কল্যাণে প্রকৃতিকে ধ্বংস নয়, আসুন সংরক্ষণ করি। শেষ করছি রবীন্দ্রনাথের ‘বৃক্ষবন্দনা’ কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে-

‘...তব প্রাণে প্রাণবান,

তব স্নেহচ্ছায়ায় শীতল, তব তেজে তেজীয়ান,

সজ্জিত তোমার মাল্যে যে মানব, তারি দূত হয়ে

ওগো মানবের বন্ধু, আজি এই কাব্য-অর্ঘ্য ল’য়ে

শ্যামের বাঁশির তানে মুগ্ধ কবি আমি

অর্পিলাম তোমায় প্রণামী।’

লেখক : চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×