তিলা ঘুঘু

প্রকাশ : ২২ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আ ন ম আমিনুর রহমান

এক সকালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রাণিচিকিৎসা অনুষদের উল্টো দিকের ঝোপঝাড়পূর্ণ মাঠে হাঁটছিলাম। হঠাৎ ঝোপ থেকে একটি পাখি উড়ে আসতে দেখলাম। মুখে গোলাকার সাদা কি যেন। কিছুদূর গিয়ে সাদা বস্তুটি রেখে আবার চলে গেল। কৌতূহল নিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলাম একটা ডিমের খোসা। খোসাটা হাতে নিয়ে বুঝলাম- কিছুক্ষণ আগে ছানা ফুটেছে। দ্রুত ঝোপের দিকে এগিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর নড়বড়ে বাসাটি আবিষ্কার করলাম। বাসায় হলুদ কোমল পালকের একটি ছোট ছানা ও এর পাশে একটি সাদা ডিম। ছানার বয়স বড়জোড় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা হবে। খোসাটি যদি কোনোভাবে নড়বড়ে বাসা থেকে নিচে পড়ে যায় তাহলে শিকারি প্রাণী সহজেই ছানার অবস্থান বুঝতে পারবে। তাই ছানাটিকে বাঁচানোর জন্য ডিমের খোসাটা দূরে রেখে আসা। পাখিটির বুদ্ধির তারিফ করতে হয়। বুদ্ধিমান এই পাখিটি হল তিলা ঘুঘু। পাতি ঘুঘু বা তেলিয়া ঘুঘু নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Western Spotted Doveev Indian Spotted Dove. Columbidae পরিবারের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Spilopelia suratensis.

তিলা ঘুঘুর দেহের দৈর্ঘ্য ২৭ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার। গড় ওজন ১২০ গ্রাম। স্ত্রী ও পুরুষ দেখতে একই রকম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা, গলা ও বুক চকচকে বাদামি-ধূসর। পিঠ সাদাটে-বাদামি। ঘাড় কালো ও তাতে অসংখ্য সাদা ছিট-ছোপ। ডানার উপরের ছিটগুলো লালচে-বাদামি। লেজ বাদামি। পেট লালচে। লেজতল সাদাটে। চোখ লালচে-বাদামি। ঠোঁট ধূসর-কালো। পা ও পায়ের পাতা নীলচে আভাযুক্ত গোলাপি। নখ বাদামি। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির কাঁধ-ঢাকনি ও ডানা-ঢাকনিতে সূক্ষ্ম ডোরা থাকে। ডানার পালক-ঢাকনির প্রান্তদেশ লালচে। ঘাড়ে তিলের পট্টি নেই।

তিলা ঘুঘু দেশের আবাসিক পাখি। শহর-গ্রামের সবখানেই এদের দেখা যায়। সচরাচর জোড়ায় বা ছোট দলে বিচরণ করে। মাটিতে হেঁটে হেঁটে বিভিন্ন ধরনের বীজ ও শস্যদানা খায়। দেহের লবণের চাহিদা পূরণের জন্য মাটিও খায়। পুরুষ পাখি ডাকাডাকি করতে পছন্দ করে। বিশেষ করে প্রজনন মৌসুমে স্ত্রী পাখিকে আকর্ষণ করার জন্য তার পাশে মাথা নেড়ে নেড়ে অনবরত ডাকতে থাকে।

এপ্রিল থেকে জুলাই প্রজননকাল বলা হলেও এরা বছরজুড়েই প্রজনন করতে পারে। গাছের ঘন ডালপালা ও ঝোপঝাড়ে কাঠি-কুটি দিয়ে কোনোরকমে নড়বড়ে বাসা বানায়। ডিম পাড়ে ২টি। ডিমের রং সাদা। স্ত্রী-পুরুষ পালাক্রমে ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে ১২ থেকে ১৩ দিনে। অন্যান্য ঘুঘুর মতো বাবা-মা উভয়েই গলার থলিতে উৎপন্ন দুধ খাইয়ে বাচ্চাদের বড় করে তোলে। বয়স দু’সপ্তাহ হলেই বাচ্চারা উড়তে শেখে। আয়ুষ্কাল প্রায় ৪ বছর।

লেখক : বন্যপ্রাণী জীববিজ্ঞানী, প্রাণিচিকিৎসা বিশেষজ্ঞ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক