সময়ে এখন অসময়ের বার্তা

  মুকিত মজুমদার বাবু ০৩ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সময়ে এখন অসময়ের বার্তা

প্রকৃতির অকৃপণ দানে অপ্সরী বাংলা। সবুজের ঢেউয়ের সঙ্গে যোগ হয়েছে ঋতুবৈচিত্র্য। ষড়ঋতুর পালাবদল দেশের গায়ে আলপনা আঁকে অফুরন্ত প্রকৃতির সৌন্দর্য। বাঙালিমাত্রই গর্ব অনুভব করে নিসর্গের এই বৈশিষ্ট্যে। চারদিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যায়, আনন্দে উদ্বেল হয়ে ওঠে হৃদয়-মন।

বাংলার প্রকৃতিতে ষড়ঋতু আবর্তিত হয় ছয়টি ভিন্ন রূপে। ঋতু পরিবর্তনের মূলে রয়েছে জলবায়ুর প্রভাব এবং ভৌগোলিক অবস্থান। এ দেশের উত্তরে বিস্তৃত হিমালয় পর্বতমালা, দক্ষিণে প্রবাহিত বঙ্গোপসাগর।

মৌসুমি বায়ু নিয়মিত প্রবাহের কারণে বৃষ্টি হয়। সেই বৃষ্টিধারা এ দেশের মাটিকে করেছে উর্বর, ফুল ও ফসলে সুশোভিত। নদীর স্রোত বয়ে আনে পলিমাটি। সে মাটির রসে প্রাণ পায় সবুজ বন-বনানী, শ্যামল শস্যলতা। তার সৌন্দর্যে এ দেশের প্রকৃতি হয়ে উঠেছে অপরূপা। নতুন নতুন সাজে সজ্জিত হয়ে এ দেশে পর পর আসে ছয়টি ঋতু, যা আমাদের সৌভাগ্যই বটে। আর এ সৌভাগ্য অনেক বিদেশির নেই।

কেননা শরৎ-হেমন্তের মতো মনোরম দুটি ঋতুর পরশ থেকে প্রায় বঞ্চিত ইউরোপবাসী। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও একই অবস্থা। ঘুরে ফিরে তিন থেকে চারটি ঋতু। শরৎ-হেমন্ত নিয়ে বাঙালির আনন্দ-উল্লাস কম নয়। ইদানীং শরৎ উৎসব এবং হেমন্তের পার্বণের মতো উৎসব পালন করতে দেখা যায় নগরবাসীকে। ঋতু বন্দনা আর ঐতিহ্যের লালনে এখন আগের চেয়ে অনেক সচেতন নতুন প্রজন্ম।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বর্তমান বাংলাদেশে চিরায়ত ষড়ঋতুর আদি চরিত্র বদলে যাচ্ছে। স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হারাচ্ছে প্রতিটি ঋতু। গ্রীষ্মকাল ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। এখন আর আগের মতো গ্রীষ্মের প্রখরতাকে কালবৈশাখী ছোবল মারে না।

বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়ম বিরুদ্ধ হয়েই যেন তা আঘাত করছে জনজীবনে। বর্ষাকালও ধীরে ধীরে তার সময় থেকে সরে যাচ্ছে। যখন বৃষ্টি হওয়ার কথা, তখন হচ্ছে না। বরং প্রাক-বর্ষা পরবর্তী সময়ে ঝরছে আরও বেশি।

অর্থাৎ আষাঢ় মাস বৃষ্টিহীন থাকলেও ভাদ্র-আশ্বিনে গিয়ে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। শরৎ আসছে দেরি করে। শরতের আগের সেই বৈশিষ্ট্যের দেখা মিলছে না। হেমন্তের সকালে সূর্যকে দেখে ঘাসের ডগায় শিশির কণা হাসে না। হেমন্ত হারিয়ে যাচ্ছে। বসন্তও হারিয়ে যাচ্ছে। আর শীতকালের ব্যাপ্তি কমে আসছে। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের অনেক দেশের মতো শীত-গ্রীষ্ম প্রধান হয়ে উঠছে বাংলাদেশের ঋতুচক্র।

পরিবেশবিদদের দাবি, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের বিরূপ আচরণের কারণেই এমনটা ঘটছে। দিন দিন কমে যাচ্ছে গাছপালা। পরিবেশ বিধ্বংসী কালো ধোঁয়া ও কল-কারখানার বর্জ্য বায়ু-মাটি-পানিকে দূষিত করছে। এছাড়াও সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে কার্বন নির্গমন।

কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতাও বাড়ছে। উষ্ণতার কারণে বাতাসের যে নির্দিষ্ট বলয় অর্থাৎ ওজন স্তরের ক্ষয় হচ্ছে। অতি বেগুনি রশ্মি পৃথিবীতে এসে দিচ্ছে অশনি সংকেত।

আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা নতুন কিছু নয়। তবে তার মাত্রা বেড়ে যাওয়াতে জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত। এক মৌসুমে ঘন ঘন আবহাওয়ার পরিবর্তনকে সাধারণত ‘ক্লাইমেট ভেরিয়েবিলিটি’ বলে।

প্রকৃতির এই ‘অস্বাভাবিক আচরণকে’ স্বল্পমেয়াদি ‘ক্লাইমেট ফেনোমেনা’ও বলা যায়। আর এরকম আবহাওয়া বদলে যাওয়ার কারণ হিসেবে পরিবেশবিদরা মনে করেন, সবুজ প্রকৃতির বিনাশ অর্থাৎ গাছপালা ধ্বংসই বিশেষভাবে দায়ী। ঋতু ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশে। যখন তখন আঘাত হানছে ঝড়-ঝঞ্ঝা। সমুদ্রে সৃষ্টি হচ্ছে নিুচাপ। অসময়ের শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতি হচ্ছে কৃষকের স্বপ্নের ফসল।

আবহাওয়া-প্রকৃতির বিরূপ আচরণে রীতিমতো আতঙ্ক ভর করেছে হাওর ও চরাঞ্চলের কৃষকদের মনে। শহর ও গ্রামের প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকা, অর্থনীতি, অবকাঠামো এবং জনস্বাস্থ্য বাড়িয়েছে উদ্বেগ। যদিও যুক্তিগত অগ্রগতি, সচেতনতা ও সরকারি-বেসরকারি সংস্থার প্রচারে ক্ষতি ও মৃতের সংখ্যা অনেক কমেছে। কিন্তু গত কয়েক বছর অতিবৃষ্টি ও বন্যায় হাওর, চরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া গত কয়েক বছরে যোগ হচ্ছে ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, বন্যা, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাতসহ নতুন নতুন প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

বিশেষ করে বজ্রপাত তো এখন বড় একটি দুর্যোগের নাম। গত তিন বছরে বেড়ে গেছে বজ্রপাতের হার। বজ্রপাত ঠেকানোর তাৎক্ষণিক কোনো প্রক্রিয়া না থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে তার উল্টোটি হচ্ছে।

বড় বড় গাছ ধ্বংস করে ফেলার কারণে গ্রামাঞ্চল অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। নতুন করে বনায়ন হচ্ছে কম। কৃষি জমির মধ্যে অতীতে তাল বা খেজুরগাছ লাগিয়ে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেলেও বর্তমানে সেসব গাছও কমে আসছে।

মূলত বাংলাদেশে ঋতুর পরিবর্তন আর জলবায়ু পরিবর্তনের গতিবিধি দেখে রীতিমতো শঙ্কিত পরিবেশ বিজ্ঞানীরা। সময়ে এখন অসময়ের বার্তা! মৌসুমি ঋতুর নির্ধারিত ধরন বদলে একই সঙ্গে ঠাণ্ডা-গরমের বিচিত্র আবহাওয়ায় অস্বস্তিতে পড়ছে জনজীবন। ঠাণ্ডা-গরমের এই বৈরী আবহাওয়ার কারণে শ্বাসনালিজনিত অসুখ, পানিবাহিত রোগ আর মশাবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।

প্রকৃতিকে অবাক করে দিয়ে শরতের শিউলি ফুটছে জ্যৈষ্ঠ মাসে। বর্ষার কদম বৃষ্টি দিন ভুলে দিব্যি ফুটছে অগ্রহায়ণে। শীতকালের যে ফুল ও ফসলের চাষ হওয়ার কথা তাও হচ্ছে না। ফলে তীব্র গরমে ঝলসে যাওয়ার আগেই কৃষক ঝুঁকছে স্বল্পমেয়াদি ফসলের দিকে।

আর আমরা হারাচ্ছি বাংলার ঐতিহ্যবাহী ধানের প্রজাতি ও তার মিষ্টতার স্বাদ। ইরি-বোরো ইত্যাদি উচ্চফলনশীল প্রজাতির আবাদই হচ্ছে ঘুরে ফিরে। পুষ্টির ভাণ্ডার অন্যান্য ফসল আবাদে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। পরিবর্তিত আবহাওয়া ও দ্রুত পরিবর্তনশীল মৌসুমের ওপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছে অসহায় প্রান্তিক চাষি।

সম্প্রতি আবহাওয়া অধিদফতর ও বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্স স্টাডিজের (বিসিএএস) আলাদা দুটি গবেষণায় দেশের বৃষ্টিপাতের ধরন বদলের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত ৩০ বছর ধরে চট্টগ্রাম বিভাগে বৃষ্টিপাত ক্রমাগত বাড়ছে।

এর ফলে ওই অঞ্চলে পাহাড়ধস বাড়ছে। অন্যদিকে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে আসছে। প্রাকৃতিকভাবে লবণাক্ত ওই অঞ্চলে বৃষ্টি কমে যাওয়ায় পানি ও মাটির লবণাক্ততা আরও বাড়ছে। ফলে ওই অঞ্চলে ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। এই যে ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে আবহাওয়া-প্রকৃতির বিরূপতা, এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা-বয়সের মানুষের জীবনযাত্রায় নানামুখী অনিষ্ট ও ক্ষয়-ক্ষতি বাড়ছে।

এ অবস্থা থেকে উঠে আসতে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি যে যার অবস্থান থেকে সোচ্চার হওয়া। প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করার মানসিকতা সবার গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় অর্জন হয়ে ভূমিকা রাখবে।

বেই কমে আসবে প্রকৃতির ওপর মানুষের অপ্রাকৃতিক আচরণ। ঋতুচক্র প্রভাবিত হয় এমন দূষণও হ্রাস পাবে। তবে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করা হবে যদি আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় দ্রুত বৈশ্বিক উষ্ণতা কমিয়ে আনা যায়। আমাদের সবার প্রত্যাশা, দেশ থেকে হারাতে বসা ঋতুবৈচিত্র্য আবারও স্বমহিমায় ফিরে আসুক, প্রকৃতির বুকে খেলা করুক ঋতু, নানা রূপে- অফুরন্ত হাসিতে।

লেখক : চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×