সবুজ ঢেউয়ে মুগ্ধতার রং

  মোকারম হোসেন ৩১ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কক্সবাজার বেড়াতে গিয়ে রামুর রাজসিক গর্জন বন দেখে একবার অভিভূত হয়েছিলাম। অনুচ্চ শৈলসারিজুড়ে একহারা গড়নের গাছগুলো যেন সত্যিকার বনের শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। এ বন বাংলাদেশের অন্যতম চিরহরিৎ বন। স্থানীয় গাইড আমাদের নিয়ে গেলেন দুশ’ বছরের পুরনো একটি গর্জন গাছ দেখাতে। গাছটিকে দেখে মনে হল দুশ’ বছর নয়, তারচেয়েও পুরনো। গাছতলায় অসংখ্য ঝরাফুলের রোদন। বিশালদেহী গাছে তেমন ডালপালা নেই, ওপরের দিকে বিক্ষিপ্ত কয়েকটি। শিল্পীর ক্যানভাসে আঁকা দূর-গ্রামের কোনো একটি নিপাট বৃক্ষ যেন। টিলা থেকে নামার সময় বিকল্প পথ ধরি। কিন্তু যতই নামতে থাকি ততই হতাশায় আচ্ছন্ন হই। দু’পাশে বেশকিছু কাটা গাছের চিহ্ন স্পষ্ট। কেটেফেলা গোড়ার চওড়া পাটাতনগুলো যেন করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। একটু ভালোভাবে চারপাশে তাকিয়ে দু-এক ঘর বসতি আবিষ্কার করি। সরকারের খাস জমিতে এমন একটি বসতি কীভাবে গড়ে উঠেছে, বোধগম্য নয়। ব্যাপারটি খুবই গোলমেলে। আমাদের দেশে বনগুলোর পাশে প্রথমদিকে অনেকটা আকস্মিকভাবে দু-একটা অবৈধ ঘর দেখা যায়। ধীরে ধীরে ওরা জায়গার মালিকানা দাবি করে। সবশেষে নির্ভয়ে বনের সম্পদ ভোগদখল করতে শুরু করে।

গর্জন বন দেখতে কয়েক বছর পর রাঙ্গামাটির দুর্গম পাবলাখালি অভয়ারণ্যে গিয়েছিলাম। সেখানেও প্রায় একই অবস্থা। ঢোকার পথে কয়েকটি সুর্দশন চুন্দুল গাছ চোখে পড়ল। উঁচু গাছ বলতে এ দু’চারটি। মাঝারি উচ্চতার অল্প বিস্তর গাছ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। উঁচু বৃক্ষগুলো অনেক আগেই সাফসুতরো। নিচে তৃণ-লতাগুল্মের কোনো আচ্ছাদন নেই। ভেতরে কেটে ফেলা গাছের অনেক পুরনো গোড়া। কোনো কোনোটি উইপোকার দখলে। বনের ভেতরে বেশ স্বাচ্ছন্দেই হাঁটা যায়। চোরা শিকারিরা অনেক আগেই পথ বানিয়ে রেখেছে। পাবলাখালির পাহাড়ি বন সরকারের বন বিভাগ ঘোষিত অভয়ারণ্য হলেও দুর্গমতার কারণে স্থানীয় চোরাকারবারি এবং সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে। এছাড়া প্রতিনিয়ত বনজসম্পদ উজাড় হওয়ার ফলে বনের ইকোসিস্টেমও ভেঙে পড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, দুর্গমতার কারণে প্রশাসনের নজরদারির অভাবে এ বন অতি দ্রুতই বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

মধুপুর শালবনের অবস্থাও ভালো নয়। শুধু মধুপুর নয়, দেশজুড়েই শালবন প্রায় বিলুপ্ত। মধুপুরের বিস্তীর্ণ শালবন উজাড় করে ওখানে কলা আর আনারসের চাষ হচ্ছে। অন্যান্য বনাঞ্চলের মতো শালবন অঞ্চলেও অসংখ্য বসতি গড়ে উঠেছে। এসব বসতির অধিকাংশই অবৈধ। অবৈধ জনগোষ্ঠীই একসময় অনাকাক্সিক্ষতভাবে শালবনের দাবিদার হয়ে ওঠে। সবকিছুর সঙ্গে আছে লোকালয়ের ক্রমবর্ধমান মানুষের বাড়তি চাপ। বিভিন্ন স্থাপনা এবং বসতির কারণে ঢাকা থেকে উত্তর জনপদ পর্যন্ত বিস্তৃত সুবিশাল শালবন এখন অতীতের স্বপ্নমাত্র। শুধু শালবনই নয়, এর সঙ্গে বিলুপ্ত হয়েছে বননির্ভর প্রাণবৈচিত্র্যও। প্রাণী বিশেষজ্ঞদের হিসাবমতে, আমাদের দেশ থেকে অনেক প্রাণী ইতিমধ্যেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কারণ বন ধ্বংস হলে বনজীবী প্রাণিকুলও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

গত দুই দশক ধরে দেশের উপকূলীয় অঞ্চল নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে কতগুলো পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন লক্ষ করেছি। বন বিভাগের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় উপকূলজুড়ে সৃজিত বনভূমি ৯০ থেকে ৯৫ সাল পর্যন্তও প্রায় অক্ষত ছিল। এরপর থেকেই বন বিভাগের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা প্যারাবন লোপাট করতে শুরু করে। সোনাদিয়া, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালী মহল প্যারাবন উৎপাটন করে সরকারের খাস জায়গায় চিংড়ি ঘের তৈরি করেছে। এর চেয়ে আত্মঘাতী কাজ আর কী হতে পারে!

এখনও আমাদের সব সম্ভাবনার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়নি। প্রকৃতি সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রতিবেশ ব্যবস্থার উন্নয়নে অনেক পথ খোলা আছে। কিন্তু শুরুটা করতে হবে এখনই। কারণ ইতিমধ্যেই জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ আক্রান্ত। দুঃসংবাদ হল, জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের তেমন কোনো ভূমিকা না থাকলেও পরিবর্তনজনিত নেতিবাচক ফলাফল পুরোপুরিই ভোগ করতে হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে বিশ্ব নেতারা এ নিয়ে দফায় দফায় আলোচনায় বসেছে, সমাধানের উপায় খুঁজেছে; কিন্তু সন্তোষজনক ফলাফল আসেনি। বাংলাদেশ ঝুঁকিপ্রবণ দেশগুলোর কেন্দ্রে অবস্থান করলেও উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুত তহবিল গঠন ও ছাড়করণের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার পথ বেছে নিয়েছে। ফলে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক কার্যক্রম ও অবকাঠামো নির্মাণে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমাদের নিজেদেরই বিকল্প পথ খুঁজে নিতে হবে। নিজস্ব প্রযুক্তি এবং মনোবল দিয়েই মোকাবেলা করতে হবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের।

সবার আগে আমাদের দরকার একটি সচেতন জনগোষ্ঠী। যত দিন না আমরা বুঝতে পারব প্রকৃতি ও পরিবেশ ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকব, ততদিন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতেই হবে। তাই ভবিষ্যতে আমরা কীভাবে ভালো থাকব আগে ওই বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে। দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সচেতন করে তোলার মাধ্যমে এক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে পারে। শুধু একটি প্রশ্ন সবার মাথায় ঢুকিয়ে দেয়া প্রয়োজন- কেন প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ করতে হবে? এ একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই আমাদের অনেক সমস্যা সমাধানের পথ উন্মুক্ত হবে। একটি বিশাল সচেতন জনগোষ্ঠীর বিপক্ষে গিয়ে কোনো সরকার বা সংস্থা নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থ চরিতার্থ করার সুযোগ পায় না। অর্থাৎ একজন সাধারণ মানুষ যদি বুঝতে পারেন নদী দখল করে বা বন উজাড় করে প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস করলে ক্ষতিটা নিজেদেরই হয়- তাহলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখার মতো সূক্ষ্ম কাজটি করা অনেকটা সহজ হবে।

আমাদের যে প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে তার সঠিক সংরক্ষণের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়াতে পারে প্রতিবেশব্যবস্থা। কোনো অবস্থাতেই বন-পাহাড়ের আংশিক বা সম্পূর্ণ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বন্দোবস্ত দেয়া যাবে না। বাণিজ্যিক চাষাবাদের নামে বন-পাহাড়ের ইকোসিস্টেম ধ্বংস করা যাবে না। বন-পাহাড়ের তৃণ-গুল্ম সাফসুতরো করে সেখানে বিদেশি বৃক্ষের চাষবাস অযৌক্তিক ও অনাকাক্সিক্ষত। এখন থেকে আর কোনো বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষ আমদানি ও চাষাবাদ করা যাবে না। বনের নিজস্বতা নষ্ট করে মানুষ যদি বনকে শাসন করতে চায় তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

আমরা স্বপ্ন দেখি একটি সোনালি ভবিষ্যতের। এই স্বপ্নের কাণ্ডারি আমাদের তরুণ সমাজ। ওরাই এভারেস্টের চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা উড়িয়েছে। ওরাই এখন পাখি দেখতে বেরোয়, দেখে ফুল-প্রজাপতি। কোথাও বৃক্ষ নিধন হলে, বন উজাড় হলে, নদী আক্রান্ত হলে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। এখন ওদের চোখে-মুখে প্রতিবাদের মিছিল। তারুণ্যের এ মিছিলকে একটি পূর্ণাঙ্গ মিছিলে পরিণত করতে হবে। একদিন সত্যি সত্যি এ মিছিল অনেক দীর্ঘ হবে। সবাই আসবে একই পতাকাতলে।

লেখক : প্রকৃতিবিষয়ক লেখক, সম্পাদক- তরুপল্লব

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×