উষ্ণতা গিলছে প্রাণ-প্রকৃতি

  অজয় দাশগুপ্ত ০৯ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাজনের গহিন বনে কি ডেঙ্গু মশা আছে?

পৃথিবীর ফুসফুসের কথা বলার আগে আমাদের দহন জ্বালার কথা বলি। পরিবেশ-প্রকৃতির কথা বলি।

হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে ১৯৫৩ সালে পদত্যাগের আগে তিনি ঢাকা শহরকে মশামুক্ত করায় বড় অবদান রাখেন, এটা বহু বছর ধরেই জনশ্রুতি। এখন থেকে সাত দশক আগের ওই সময়ে বেতার ছিল সীমিত পরিসরে, টেলিভিশন এ ভূখণ্ডে ছিলই না। সংবাদপত্রও খুব বেশি ছিল না। ‘সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি’ গ্রন্থ রচনা করতে গিয়ে ১৯৪৭ থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিনের কোনো না কোনো সংবাদপত্র পাঠ করেছি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের পরের কয়েকটি বছর হাবিবুল্লাহ বাহার সাহেব মশা মারতে ওষুধ ছেটাচ্ছেন বা ঝোপ-জঙ্গল পরিষ্কারে কাস্তে-দা হাতে নিয়েছেন, এমন ছবি দেখিনি। এ সংক্রান্ত খবরও খুব একটা ছিল না। তবুও দশকের পর দশক টিকে আছেন লোকমুখে! জনশ্রুতি একেই বলে।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়। প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৫৯ সালে নিজেকে ফিল্ড মার্শাল ঘোষণা করেন। এ ধরনের উপাধি পেতে একাধিক বড় ধরনের যুদ্ধ জয়ে নেতৃত্ব দিতে হয়। পাকিস্তানের হয়ে তিনি কোন যুদ্ধে জয়লাভ করেছেন, তেমন কিছু জনশ্রুতিতে নেই। তবে তিনি ‘নিজ দেশ জয় করেছিলেন’ বটে! ক্ষমতা দখলের পর তার দাপটের শেষ ছিল না। আমি তখন কেবল স্কুলে যাওয়া শুরু করেছি। তিনি পরিচ্ছন্নতা অভিযান ঘোষণা দিলেন। পাকিস্তানের রাজধানী রাওয়ালপিন্ডি থেকে সহস্রাধিক মাইল এবং পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা থেকেও প্রায় ৩০০ মাইল (সে সময়ে কিলোমিটার নয়, দূরত্বের পরিমাপ মাইলে করা হতো) দূরে থেকেও আমরা তা অনুভব করতে পারি। হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর মানুষকে সচেতন ও প্রশাসনকে সক্রিয় করে তোলার পদ্ধতির চেয়ে এটা একেবারেই ভিন্ন কিসিমের। নিজের বাড়ি, পুকুর, আশপাশ নিজেকেই পরিষ্কার করতে হবে। নইলে বেতের নির্ঘাত ঘা। স্কুল-হাটবাজারেও এ অভিযান চলার নির্দেশ দেয়া হয়। গোলবাধে ‘ময়লা-আবর্জনার’ সংজ্ঞা ও তার কারণ নিয়ে। মিলিটারির কাছে কোনটা ময়লা বা ময়লা জমার কারণ কী, সেটা জানা নেই। তাই দেখা গেল পুকুরের কচুরিপানার পাশাপাশি বাঁশবাগান, কলা-পেঁপের বাগানও ছাপ করে ফেলা হল।

এভাবে মশার প্রকোপ কতটা কমানো গেছে, সে আলোচনা থাক। পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, নাকি মশা জন্ম নেয়ার পর ওষুধ ছিটিয়ে তা ধ্বংস করা- কোনটি অগ্রাধিকার পাবে, আমার এ আলোচনাতেও এখন যেতে চাই না।

মশা মারতে কামান দাগা প্রবাদের ব্যূৎপত্তি জানা নেই। তবে সামরিক শাসকরা মানুষকে বেতিয়ে মশা মারতে চাইতেন। গণতান্ত্রিক শাসনামলে বেতের সুযোগ নেই। তবে কেউ কেউ ভয় দেখিয়ে কাজ হাসিল করতে চান বৈকি। তাতে মশা নিধন হোক না হোক, হুকুমদাতার প্রতি রোষ বাড়ে মানুষের সেটা নিশ্চিত করে বলা যায়। পরিচ্ছন্নতা অপরিহার্য। এর দায়িত্ব ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের। একে অপরের পরিপূরক। বাংলাদেশের প্রশাসন এখন বড় এবং বহুলাংশে বিকেন্দ্রীকরণও হয়েছে। উপজেলা-ইউনিয়ন পর্যায়ে রয়েছে অফিসার-কেরানি-পিওন। একাধিক রাজনৈতিক দলের রয়েছে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠন। এরা জনগণের সঙ্গে একাত্ম হতে পারলে কী অসাধ্যই সাধন করা সম্ভব।

কাজের মতো কাজ করতে পারলে সংবাদপত্রে, বেতার-টেলিভিশনে ছবি-খবর প্রচার-প্রকাশ না হলেও ক্ষতি নেই। মানুষের মনে স্থান করে নেয়াটাই মূল কথা। বিভিন্ন সময়ে দেখেছি, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তর- ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনে যারা নির্বাচন করতে আগ্রহী-উৎসাহী তারা প্রতিদিন নির্বাচনী এলাকার মানুষের সেবা-কল্যাণে ব্যস্ত থাকে। নির্বাচিত হতে না পারলেও এলাকা ছেড়ে যায় না, মানুষের মন জয় করার জন্য কাজ করে যায়। ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়ার ভয় কিন্তু এ ধরনের কর্মকাণ্ডের প্রয়োজন আরও বেশি করে অনুভূত হচ্ছে।

এবারে আমাজনের কথা বলি। নাসার অর্থানুকূল্যে পরিচালিত একটি গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে- আমাজনের বৃষ্টি-অরণ্যে যে ভয়ঙ্কর দাবানল জ্বলছে তা কি বিষিয়ে দিতে চলেছে আমাদের শ্বাসের বাতাস? দাবানল কি আশপাশের পরিবেশে উগরে দেবে বিষাক্ত কার্বন কণা? এমনটি হলে বাতাসের অক্সিজেনে পুড়ে গিয়ে তৈরি করবে কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন ডাই অক্সাইডের মতো গ্রিন হাউস গ্যাস। এর ফলে বাড়বে উষ্ণায়ন, যা মশা এবং এ জাতীয় প্রাণীর জন্য তৈরি করবে আরও অনুকূল পরিবেশ।

আমাদের জানা আছে, আমাজন অরণ্য পৃথিবীর মোট অক্সিজেন চাহিদার ২০ শতাংশ জোগান দেয়। তাহলে কি দাবানল অশনিসংকেত দিচ্ছে? বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, আমাজন ও চিরহরিৎ অরণ্যে ঘনঘন দাবানল হচ্ছে। প্রাবল্য বাড়ছে। ভয়াবহতাও বাড়ছে। মাটির নীচের কার্বনও উঠে এসে মিশছে বাতাসে। এর ফলে বাড়ছে পৃথিবীর ‘জ্বর’, যার কারণে বাড়ছে মানুষের জ্বর।

গবেষকরা বলছেন, ঘনঘন দাবানলে রেইন-ফরেস্ট আগের চেয়ে বেশি শুকনো হয়ে যাচ্ছে। যার জেরে কমছে বৃষ্টি।

আমাজনে দাবানল বাড়ার কারণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাজনের ব্যাপক হারে গাছ কাটা চলছে। ব্রাজিলের নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটা অনেক বেড়েছে। জমি কেটে বানানো হচ্ছে চাষের জমি। এতে প্রেসিডেন্ট জাইর বোলসোনারো কৃষকদের মধ্যে আরও জনপ্রিয় হচ্ছেন। কিন্তু প্রকৃতিতে বেজায় হাহাকার! তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাহ্বা পাচ্ছেন। জলবায়ু পরিবর্তনে ধনী দেশগুলোর যে বিশেষ করণীয় রয়েছে সেটা তিনি পরিকল্পিতভাবে উপেক্ষা করে চলেছেন। আন্তর্জাতিক কোনো চুক্তিই তার কাছে গুরুত্ব পায় না।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট বলছেন, আমাজন তো আমাদের। অন্যদের এটা নিয়ে এত ভাবনা কেন? তিনি এটাও বলতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলো বাতাসে যথেচ্ছ উষ্ণতা ছড়াচ্ছে। সেদিকে মনোযোগ নেই কেন? চীনও এখন এ দৌড়ে শামিল।

সত্যিই কি বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী, রাষ্ট্রনায়ক থেকে সাধারণ মানুষ এ নিয়ে ভাববে না?

সুমেরু এলাকার মতো আলাস্কাতেও গত দুই দশক ধরে বাতাস, জমি, নদী ও হ্রদের মিষ্টি পানি সমুদ্রের নোনাপানি সবকিছুর তাপমাত্রা বাড়ছে। মানবজাতি কি এ নিয়ে ভাববে না?

ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তও জনবসতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, সড়ক-রেলপথ ক্রমশ পানির নিচে যাচ্ছে। এ কারণে রাজধানী সরিয়ে নিতে হবে অনেক দূরে বোর্নিয়োকে শহরে।

এ সব পরিবর্তন বিশ্ব উষ্ণায়নের ফল। আমরা কি কিছুই ভাবব না?

লেখক : সাংবাদিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×