দাবানল : আমাজন থেকে অস্ট্রেলিয়া

  অজয় দাশগুপ্ত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দাবানলে পুড়ছে অস্ট্রেলিয়া- সেপ্টেম্বর, ২০১৯ থেকে এর শুরু। বনাঞ্চল পুড়ে খাক। বিপন্ন আপাততভাবে যতটা না মানুষ, তার ঢের বেশি প্রাণিকুল। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, ইতিমধ্যে প্রায় একশ’ কোটি প্রাণীর করুণ মৃত্যু ঘটেছে। প্রাণ বাঁচাতে তৃষ্ণার্ত কোয়ালা উদ্ধারকর্মীদের পা জড়িয়ে ধরেছে- ইন্টারনেটে এমন ছবি ভাইরাল।

গত বছরের আগস্টে বিশ্বের উদ্বেগ ছিল আমাজনের বনে অগ্নিকাণ্ড নিয়ে। রেইন-ফরেস্টে ব্যাপকহারে গাছ কাটা এবং বন উজাড় করে চাষের জমি বাড়ানোর কারণেই কি এমন বিপর্যয়, সে প্রশ্ন উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও আলোচনায়। অস্ট্রেলিয়ায় দাবানলের সময়েও একই আলোচনা। সে দেশের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ মৌসুমে তাপমাত্রা বেড়েছে, বৃষ্টিপাত কম হয়েছে। শুষ্ক আবহাওয়া আকস্মিক, এটা বলা যাবে না। কয়েক বছর ধরেই এ প্রবণতা। বলা যায়, প্রকৃতি দেবতার রোষের শিকার মানুষ ও প্রাণিকুল। দাবদাহ, খরা, কম বৃষ্টিপাত- এ সবের প্রভাবে মাটি ও উদ্ভিদ শুষ্ক হয়ে উঠছে, দাবানল সৃষ্টি ও বিস্তারে উপযুক্ত পরিবেশ বৈকি।

এ যে দুঃস্বপ্ন! শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়, উদ্বিগ্ন কিন্তু মানবজাতি। আবার জাতীয় স্বার্থ বনাম বিশ্বের সার্বিক স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টিও আলোচিত। যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও কয়কটি উন্নত দেশকে বিশ্বের তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধির জন্য দায়ী করা হয়। কিন্তু এ সব দেশ নিজ নিজ অর্থনীতির স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় বলেই উষ্ণায়ন প্রক্রিয়া বিপরীতমুখী করতে কাক্সিক্ষত পদক্ষেপ নেয় না- এমন অভিযোগ প্রবল।

আমাজনকে বিশ্বের ফুসফুস বলা হয়। ব্রাজিলের নির্বাচিত নেতৃত্ব বলছে, তারা স্বদেশের কৃষকদের স্বার্থ দেখবে। মানবজাতির স্বার্থ দেখতে গিয়ে তারা কেন নিজের ক্ষতি করবে?

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জলবায়ুর নেতিবাচক পরিবর্তনে তার দেশের ভূমিকা স্বীকার করতে চান না। অথচ সবার জানা, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কয়লা রফতানিকারক দেশটির নাম অস্ট্রেলিয়া। কয়লা উত্তোলন, পরিবহন ও পোড়ানো- সব কিছুই পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। কয়লা থেকে গ্র্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ, দাবানল-দুর্যোগ এবং জনজীবন ও প্রাণিকুলের সামগ্রিক ক্ষতি- এসব উন্নত বিশ্বের তালিকায় থাকা অস্ট্রেলিয়া এড়াতে চাইছে।

অস্ট্রেলিয়ার বিপন্ন বন্যপ্রাণী রক্ষায় নানা দেশের পশু-পাখিপ্রেমীরা এগিয়ে গিয়েছেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ত্রিপুরার মেলাঘর মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে পৌঁছেছিল ইউরোপের নানা দেশের মায়ের-বোনের হাতে বোনা সোয়েটার। ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের জন্য নিউইয়র্ক, প্যারিস, লন্ডন, বার্লিন, মস্কো, টোকিওতে শিশুরা টিফিনের বাঁচানো অর্থ তুলে দিয়েছিল বিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীরা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এভাবে হয়ে উঠেছিল অনেক দেশের যুদ্ধ। আমরা অবাক বিস্ময়ে দেখি, অস্ট্রেলিয়ার দাবানল থেকে প্রাণিকুল বাঁচানোর জন্য একই মনোভাব নিয়ে এগিয়ে এসেছে নানা দেশের নারী-পুরুষ এমনকি শিশুরা। হাতে বোনা ছোট্ট কাঁথা, থলে অস্ট্রেলিয়ার পাখিগুলোর জন্য বানানো হয়েছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবং তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে উদ্ধারকর্মীদের হাতে। অথচ অন্য ইউরোপের কথাও আমরা জানি। অস্ট্রেলিয়া ইউরোপের উপনিবেশিক শাসকদের নিষ্ঠুর শোষণের শিকার দেশগুলোর অন্যতম। বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানও প্রায় দুশ বছর এমন নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিল। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে ‘বাস্কেট কেস’ কিংবা ‘বটমলেস বাস্কেট’ হিসেবে বদনাম দিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেছিলেন, আমাদের ভূখণ্ড সমৃদ্ধ ছিল বলেই উপনিবেশিক লুণ্ঠনকারীদের কু-নজর পড়েছিল। তাদের কারণেই আমরা নিঃস্ব হয়েছি।

অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা এখন বলছে, তাদের বনভূমিতে অগ্নিকাণ্ড ঠেকানোর কৌশল জানা আছে। শতশত বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষরা এটা অনুসরণ করেছিলেন। বনের ভেতরে পড়ে থাকা পাতা, শুকনো ডালপালা এসব নিয়মিত পোড়ানো হতো এমন কৌশলে, যাতে দাহ্য উপাদান জমা না থাকে। এর ফলে প্রাকৃতিক দাবানল আঘাত হানার শঙ্কা অনেক কম থাকে। দহনে সৃষ্ট ছাই জমির উর্বরতা শক্তি বাড়ায়। বন টিকিয়ে রাখার এ কৌশল অনুসরণের তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বিবিসি জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসবাসরত কয়েকজন প্রবীণ আদিবাসী বিভিন্ন বনে অতিমাত্রায় ঝোপঝাড় ও প্রচুর শুকনো ডালপালা দেখে সতর্ক করেছিলেন- বিশাল দাবানল হানা দিতে আসছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তাতে কর্ণপাত করেনি।

অস্ট্রেলিয়া উপনিবেশে পরিণত হয়ে ১৭৮৮ সালে। পুরনো নথি দেখে অনেক বিশেষজ্ঞ এখন বলছেন, এ বিশাল ভূখণ্ডের আদিবাসীরা জানতেন কীভাবে মানুষ ও পরিবেশের মধ্য ভারসাম্য রক্ষা করতে হয়। কিন্তু উপনিবেশিক শাসকরা তো আদিবাসীদের তাদের ভূখণ্ড থেকেই সরিয়ে দিয়েছিল। আর এখন জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে যে উদ্বেগ, সেই পরিবর্তনের মূলে তো এক শ্রেণির অতি লোভী মানুষের অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অস্ট্রেলিয়ার বনভূমি রক্ষা এবং আদিবাসীদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় নেই বললেই চলে।

অস্ট্রেলিয়ার দাবানলে পুড়ে গেছে এক কোটি হেক্টরের বেশি এলাকা। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি শুমারি ও অন্যান্য সূত্র থেকে জানা যায়- ২০১৬ সালে আমাদের চাষের জমির পরিমাণ ছিল ৭৭ লাখ হেক্টর।

বাংলাদেশে ব্রাজিল বা অস্ট্রেলিয়ার মতো বনাঞ্চল নেই। বরং প্রতিদিন বনভূমি উজাড় হচ্ছে। এ কারণে দাবানল নিয়ে ওইসব দেশের মতো উদ্বেগও নেই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে আমরাও। যে আগুন নেভানোর পানির জন্য এখন অস্ট্রেলিয়ায় ব্যাকুল প্রার্থনা, বাংলাদেশ সেই পানির কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানে বন্যা আঘাত হানে। অনেক নদনদী শুকিয়ে যাওয়ায় বৃষ্টি ও হিমালয় থেকে নেমে আসা পানি ধরে রাখা যায় না। দ্রুত নেমে যায় সমুদ্রে। আবার এ কারণেই শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় পানির স্বল্পতা। কিন্তু পানি তো চাই-ই। খাবার জন্য চাই। চাষাবাদের জন্য চাই। নৌচলাচলের জন্য চাই। নদী-খালের পানি পর্যাপ্ত না পাওয়ায় ক্রমাগত বেশি বেশি করে তোলা হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানি। তার পরিণতি যে ভালো হবে না, সে সতর্কবার্তা কিন্তু নানা মহল থেকে দেয়া হচ্ছে। তাকে যথেষ্ট কর্ণপাত কি করা হচ্ছে, সেটা নিয়ে কিন্তু সংশয় বিস্তর।

ব্রাজিল ও অস্ট্রেলিয়ার বনে আগুনের কারণ হয়তো ভিন্ন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব উভয় এলাকাতেই কমবেশি রয়েছে, সেটা নিয়ে দ্বিমত নেই। বাংলাদেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এবং আগামীতে তা বাড়তে থাকবে, এটা নিয়েও কিন্তু দ্বিমত নেই।

লেখক : সাংবাদিক

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত