পাখির জন্য ভালোবাসা

  ড. নূর জাহান সরকার ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

৩০ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম এবং বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ উল্লেখ করেন, রাজশাহীর যে আমবাগানে শামুকখোল পাখি বাসা বেঁধেছে, তা ‘অভয়ারণ্য’ হিসেবে ঘোষণা করা হোক। প্রজ্ঞা পারমিতা বিষয়টি হাইকোর্টের নোটিশে আনেন। সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সালিমুল আলম শামুকখোল পাখির জন্য রুলটি জারি করেন। ঘটনাটি একটি জাতীয় দৈনিক ও চ্যানেলে খবর হয়ে আসে।

শামুকখোল বাংলাদেশের স্থায়ী পাখি। এদের দুটি প্রজাতির একটি এশিয়ায়, অন্যটি আফ্রিকায়। ইংরেজি নাম- Openbill storks. বৈজ্ঞানিক নাম- Anastomus ositans ও A, lamelligerus. এরা প্রধানত জলাশয়ের ধারঘেঁষে বড় বড় গাছে বাসা বাঁধে বক, পানকৌড়ি ও অন্যান্য পাখির সঙ্গে ‘কলোনি’ আকারে।

প্রধানত এরা শামুক খায় বলে এদের ‘শামুকখোল’ বলা হয়। এদের ঠোঁটের মাঝ বরাবর ফাঁকা। মনে হয় যেন বংশপরম্পরায় শামুকের খোল ভাঙতে ভাঙতে ঠোঁটের আকার এমন হয়েছে। আসলে এরা ঠোঁটের আগা দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে শামুকের খোলস খুলে ফেলে মাংসল অংশ খায়। এদের জন্মের সময় ঠোঁটের মাঝখানে ফাঁকা থাকে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফাঁকা হয়ে যায়। শামুক ছাড়া এরা ঝিনুক, মাছ, বড় পোকামাকড়, ব্যাঙ, সাপ ইত্যাদি খেয়ে থাকে।

ধানের শীষ নষ্ট করায় শামুকের জুড়ি নেই। শামুক খেয়ে লাখ লাখ টাকার ধান রক্ষায় শামুকখোল নীরবে অবদান রেখে চলেছে। বর্তমানে এদের অস্তিত্ব বিলুপ্তির পথে। বাংলাদেশে এরা মহাবিপন্ন। যথাযথ সংরক্ষণের উদ্যোগ না নেয়া হলে ১৫টির অধিক প্রজাতির মতো এরা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বাংলাদেশে নির্বিচারে পাখি ধরা, মারা ও খাওয়া চলছে। আইন থাকলেও প্রয়োগ ও সচেতনতার অভাবে শামুকখোল বিলুপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গবেষণায় দেখেছি- শামুকখোলের সংখ্যা আগের মতো নেই। সুন্দরবন, কাপ্তাই, নাটোরসহ মাত্র দু-একটি এলাকায় এদের দেখা যায়। সুন্দরবন ও নাটোরে এদের প্রজনন করতে দেখা যায়নি।

২০০৮ সালে জয়পুরহাট জেলার খেতলাল উপজেলার মহাব্বতপুর গ্রামে একটি ‘কলোনি’ দেখা যায় ডোবার ধারে জঙ্গলে। এতে প্রায় ৭০০ শামুকখোলের ৩৫১টি বাসা এবং প্রতি বাসায় দুই থেকে পাঁচটি ডিম দেখা যায়। এরা যে গাছগুলোয় বাসা বেঁধেছে, তার মধ্যে কদম, বাঁশ, কড়ই, শিমুল, করচ, পীতরাজই বেশি। প্রায় ১০ প্রজাতির ৫৩টি গাছে বাসাগুলো বাঁধতে দেখা যায়। তবে বেশি বাসা দেখা গেছে কদম গাছে। মা-বাবা মিলে ডিমে তা দেয় ২৮ থেকে ৩৫ দিন। এদের ডিম থেকে প্রায় ৮৬ শতাংশ ছানা ফুটে বের হয়। ৩৩ থেকে ৩৫ দিনে ছানা উড়তে শেখে। তবে ডিমের সংখ্যার তুলনায় ৪০ শতাংশের বেশি উড়ে যেতে সক্ষম হয়নি। উল্লেখ্য, সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে ওই সংখ্যক ছানা উড়তে শেখা পর্যন্ত রক্ষা পায়। ছানাগুলো উড়তে শেখার পরও বাবা-মার সঙ্গে প্রায় দেড় মাস থাকে। রাতের আঁধারে গাছে উঠে চোরেরা এদের ধরে নিয়ে খায় এবং বাজারে বিক্রি করে। আমাদের গবেষণাকালে কোনো পাখিকেই গুলি করে মারা হয়নি, কিন্তু উড়ে চলে যাওয়া পর্যন্ত ছানা চুরি হয়েছিল অনেক।

পাখি শিকারিরা শুধু যে পাখি ধরে, মারে, ব্যবসা ও পাচার করে তাই নয়; তারা পাখির আবাসস্থল ধ্বংস করে। শামুকখোলের মতো বিপদাপন্ন পাখি রক্ষায় কর্তৃপক্ষের তৎপর হতে হবে। এ ক্ষেত্রে বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির প্রতি কঠোর নজরদারি রাখতে হবে।

লেখক : বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ, প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত