সবুজ উদ্যোক্তাদের চাই সবুজ অর্থায়ন

  ড. আতিউর রহমান ২১ মার্চ ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধির দৌড়ে গত এক দশকের মতো সময় ধরে বেশ ক্ষীপ্রতা দেখিয়ে চলেছে। দশকব্যাপী ৬ শতাংশেরও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জনকারী বাংলাদেশ চলতি বছর এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ ৭.৬৫ শতাংশ হারের রেকর্ড অর্জন করতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে গত তিন বছর ধরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার সাত শতাংশের বেশি থাকার এক বিরল রেকর্ড অর্জিত হতে যাচ্ছে। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশ হতে যাওয়া বাংলাদেশের অর্জনের পেছনে লাগাতার এই বাড়ন্ত প্রবৃদ্ধির হার বজায় রাখার কৃতিত্ব বর্তমান উন্নয়নবান্ধব সরকারের পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত তরুণ সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের দিতেই হবে।

উন্নয়ন অভিযাত্রায় চোখ ধাঁধানো সাফল্য সত্ত্বেও এ কথাটি মনে রাখা চাই যে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে থাকা প্রথম সারির একটি দেশ। আবহাওয়ার রকম ফেরের কারণে বাংলাদেশে বন্যা, খরা, শীত, গ্রীষ্ম ও ঝড় বৃষ্টির মেজাজ-মর্জি বোঝাই দায়। তাছাড়া উপকূলে উষ্ণ সমুদ্রতট স্ফীত হয়ে লোনা পানির প্রবেশ, খেয়ালি নদীর তীর ভাঙন ও দ্রুত পরিবর্তনশীল চর জেগে ওঠা, হাওরে হঠাৎ বন্যার কারণে লাখ লাখ মানুষের জীবন চলা নিরন্তর দুর্বিষহ হয়ে পড়ছে। এ সবের কারণে এসব অঞ্চলে বসবাসকারী পুরুষ ও নারীর পক্ষে উৎপাদনশীল সম্পদের ওপর অধিকার রাখাই মুশকিল হয়ে উঠছে। তাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, আর্থিক ও ব্যবসায়িক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি না করার কারণে বিপুলসংখ্যক তরুণ উৎপাদনশীল কর্মে যুক্ত হতে পারছে না। আর এ নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার স্থানীয় আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ওপর। এসব অঞ্চলে প্রবৃদ্ধি সেভাবে গতিময় করা যাচ্ছে না বলে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য নিরসন বেশ চ্যালেঞ্জিং রয়ে যাচ্ছে। এদের বিরাট অংশ বাধ্য হয়ে জলবায়ু পরিবর্তনে আক্রান্ত অঞ্চল থেকে মাইগ্রেট করে শহরাভিমুখী হচ্ছে। ফলে অপরিকল্পিত নগরায়নে তারাও বাড়তি উপাদান যোগ করছে। বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির গতির মুখে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এসব মানুষের তৈরি অনাকাক্সিক্ষত নগরায়ন। এ প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা সতেরো আলোকে নানামুখী নীতি-কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে এ লক্ষ্য পূরণে ব্যক্তি খাতের ভূমিকাই যে প্রধান সে কথা জাতিসংঘও স্বীকার করেছে। এসডিজির জন্য যে বিপুল বিনিয়োগের দরকার তার ৭৭ শতাংশই ব্যক্তি খাত থেকে আসবে বলে জাতিসংঘ আশা করছে। আর সে কারণেই আমাদের ব্যক্তিখাতকে প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক নিয়ম-নীতি সহজ করে উৎসাহী করা জরুরি। একই সঙ্গে এই খাতকে সবুজ বিনিয়োগে উৎসাহী করারও প্রয়োজন। বিশেষ করে, সবুজ জ্বালানি উৎপাদন ও বিতরণে ব্যক্তি খাতকে উপযুক্ত অর্থায়নসহ নানাবিধ প্রণোদনা দিয়ে উৎসাহী করা গেলে একদিকে আমাদের প্রবৃদ্ধি বাড়ন্ত থাকবে এবং একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমিয়ে ফেলা সম্ভব হবে। এই সার্বিক পরিপ্রেক্ষিত মনে রেখেই সম্প্রতি আমি গাইবান্ধার সাদুল্লাহপুর উপজেলায় গিয়েছিলাম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৃণমূলে সবুজ কর্মসূচি দেখতে। ওই কেন্দ্রে একজন তরুণ উদ্যোক্তা ফেরদৌস আলম সবুজ পণ্যগুলো (সোলার হোম পদ্ধতি, সোলার বাতি, এলইডি বাল্ব, সূর্য চুলা, চার্জার, পানি তোলার পাম্প ইত্যাদি) মোবাইল অ্যাপস ব্যবহার করে বাজারজাত করছেন। নিজে ২০ শতাংশ পুঁজি মোবাইল ওয়ালেটে ভরলেই প্রকল্পের পক্ষ থেকে বাকি ৮০ শতাংশ চলতি মূলধন ওই ওয়ালেটে পাঠানো হয়। এভাবেই এ প্রকল্প শুধু সবুজ পণ্য বিক্রি করতে সাহায্য করে তাই নয়, পরিবেশে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণও কমিয়ে ফেলছে। সে কারণেই এই উদ্যোগকে সবুজ উদ্যোগ বলা যায়। এই প্রকল্প এরই মধ্যে ১১০ জন উদ্যোক্তা তৈরি করেছে। এদের প্রত্যেককে ডিজিটাল মূলধন দিয়েছে। সব মিলে প্রায় কোটি খানিক টাকা এরই মধ্যে বিনিয়োগ করেছে। উদ্যোক্তারা এরই মধ্যে পনেরো লাখ ডলার মূল্যমানের সবুজ পণ্য বিক্রি করেছেন। এভাবেই তারা ‘উদ্যোগ, ক্ষমতায়ন ও জ্বালানির সম্মিলন ঘটিয়ে এক নয়া ব্যবসায়িক মডেল দাঁড় করতে সক্ষম হয়েছেন।

উদ্যোক্তা কেন্দ্রেই রয়েছে একটি বেসরকারি ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং সুবিধা। তরুণ উদ্যোক্তা এই এজেন্ট ব্যাংকিংও পরিচালনা করেন। তাকে সহযোগিতা করেন কয়েকজন সহকারী। স্মার্ট গ্রাম উন্নয়নের অংশ হিসেবে তারা গ্রামীণ নারীদের একটা সমিতিতে সংগঠিত করছেন। এ নারীরা এজেন্ট ব্যাংকের সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করেন। এমন একটি গ্রামের নাম জামুডাঙা। এ গ্রামের সমিতিটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন মিসেস মিনারা। তার সমিতিতে ৩৬ জন সদস্য রয়েছেন। এরা স্মার্ট ফোনের মাধ্যমে নিয়মিত সঞ্চয় করেন, সাদুল্লাহ্পুরের এজেন্ট ব্যাংকের সঙ্গে হিসাব পরিচালনা করেন, কেনা পণ্যের কিস্তি প্রদান করেন। মিনারার বাড়িতে একটি প্রদর্শনীমূলক পানির পাম্প (সোলার শক্তিতে চলে) বসানো হয়েছে। নলকূপের সঙ্গে লাগানো এই পাম্প দিয়ে উঁচুতে রাখা ট্যাংকে পানি তোলা হয়। সেই পানি তিনটি ফিল্টার পেরিয়ে সুপেয় পানিতে পরিণত হয়। গ্রামবাসী বিনামূল্যে এ পানি ব্যবহার করছেন। তবে একপর্যায়ে হয়তো এর জন্য কিস্তিতে মূল্যও পরিশোধ করতে হবে। মিনারার বাড়িতে সোলার বাতি জ্বলছে। সূর্য চুলায় মিনারা রান্না করছেন। ওই চুলার জন্য পেলেট স্থানীয় উদ্যোক্তাই সরবরাহ করছেন। মোবাইল চার্জ করছেন। অন্যান্য ঘরেও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য সোলার লণ্ঠন ব্যবহৃত হচ্ছে। গরমে গ্রামবাসী ফ্যান ব্যবহার করছেন। সব মিলে গ্রামের জীবনযাপনে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। পাশাপাশি উদ্যোক্তার ব্যবসারও প্রসার ঘটছে। এমন সামাজিক দায়বোধ সম্পন্ন ব্যবসায় অংশগ্রহণ করতে পেরে ভোক্তা গ্রামবাসীও সন্তুষ্ট। ওই গ্রাম থেকে একটু দূরেই একটি বাজারে (এনায়েতপুর বাজার) গিয়ে দেখলাম দোকানদারা এলইডি বাল্ব দিয়ে সোলার শক্তির ব্যবহার করছেন। বাজারেরই মসজিদে কয়েকটি সোলার প্যানেল বসিয়ে পুরো বাজারে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে বিদ্যুৎ বিক্রি করছেন উদ্যোক্তা। যখনই স্বাভাবিক বিদ্যুৎ চলে যায় তখনই সোলার বিদ্যুৎ জ্বলে ওঠে। দিনে পাঁচ টাকা খরচ করেই দোকানিরা তাদের ব্যবসা অক্ষুণ্ন রাখছেন। আর বাণিজ্যিকভাবে সোলার বিদ্যুৎ বিক্রি করার সুবাদে উদ্যোক্তার পক্ষে একটি সংমিশ্রণমূলক ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হচ্ছে আশি হাজার গ্রামে পঞ্চাশ লাখ খানার ভাগ্যোন্নয়ন করা। আর তা করা সম্ভবও। বাংলাদেশে সবুজ ব্যবসার সম্ভাবনা অনেক। সোলার বিদ্যুৎ ব্যবহার করাকে সর্বজনীন করতে পারলে এবং সেই মতো ওই বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের জন্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারলে পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিই সবুজ রূপ ধারণ করবে। এর পাশাপাশি নেট মিটারিং চালু করতে পারলে নগরেও ‘রুফটপ’ জ্বালানির উৎপাদন ও ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে যাবে। এক হিসাবে জানা যায় যে, দেড় কোটি সোলার হোম সিস্টেম ও সংশ্লিষ্ট উঈ বিদ্যুৎ পণ্য প্রচলন, দু’হাজার মেগাওয়াট সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন ও তা গ্রিডে সরবরাহ, দশ লাখ বিদ্যুৎচালিত পরিবহন, পঁচিশ হাজার চার্জিং স্টেশন, দশ লাখ সোলার সেচ পাম্প এবং তিন হাজার শিল্পে সোলার রুপটপ সলিউশন চালু করা সম্ভব।

এ খাতে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, তাদের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করা, ব্যবসা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত মূলধনের জোগান দেয়া, উপযুক্ত প্রচারসহ অন্যান্য সহযোগিতা প্রদান করে সবুজ অর্থনীতির ব্যাপক প্রসার করা সম্ভব। এজন্য ব্যক্তি খাতের উন্নয়নে নীতি-নির্ধারণী সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক সবুজ অর্থায়নের স্বার্থে বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। চলমান আর্থিক অনিয়ম ও অস্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে যেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সবুজ অর্র্থনীতির অগ্রযাত্রাকে কেউ ব্যাহত না করতে পারে সে দিকে সর্বোচ্চ নীতি সচেতনতার প্রয়োজন রয়েছে।

লেখক : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত