সবুজ ছায়ায় সতেজ প্রাণ

  মোজাম্মেল কবির ০৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পৃথিবীতে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে প্রকৃতির রূপ। পাল্টে যাচ্ছে বেঁচে থাকার উপযোগী পৃথিবীর চিত্র। আপনি যখন এমন দুটি বাক্য দিয়ে লেখা পড়তে শুরু করেছেন, মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে- এ বিষয়ে আমার মতো সাধারণ একজন মানুষের কী-ই-বা করার আছে? আমাকে রাত পোহালেই ব্যবসাপাতি, অফিস আর সংসার খরচের চিন্তামগ্ন থাকতে হয়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, ঘরে ফেরার নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়। এমন জটিল বিষয় নিয়ে ভাবার জন্য বিজ্ঞানীরা আছেন। আসলে বিষয়টি অমন না। আমরা এক মুহূর্ত প্রকৃতির আনুকূল্য ছাড়া বেঁচে থাকতে পারি না। আলো-বাতাস-পানির মতো প্রকৃতির উপকরণগুলো আমাদের জীবন রক্ষায় সহায়তা করছে। সুস্থ সুন্দর জীবনের নিশ্চয়তা দিচ্ছে। প্রকৃতির বিষয়ে প্রত্যেকের সচেতনতা ও দায়বদ্ধতার ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি থাকতে হবে। না হলে আমাদের অনাগত প্রজন্ম এমনকি নিজেদের নিকটবর্তী আগামীতে প্রকৃতির অপ্রত্যাশিত বিরূপ পরিস্থিতির সামনে অসহায় আত্মসমর্পণ ছাড়া কিছুই করার থাকবে না।

জুলাইয়ের মাঝামাঝি গ্রিনল্যান্ডে এমন বিশাল আকৃতির আইসবার্গ ভেসে আসে যে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি ভেঙে পড়লে সুনামি আঘাত হানতে পারে। দুটি ফুটবল মাঠের সমান, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে তিনশ’ ফুট উঁচু এ আইসবার্গ। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলেছেন তারা এর আগে কখনও এমন বিশালাকৃতির আইসবার্গ ভেসে আসতে দেখেননি। অনেক আগে থেকেই বিশেষজ্ঞমহল পূর্বাভাস দিয়ে আসছিলেন যে, পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার কারণে বরফ গলছে এবং বিশাল আকৃতির আইসবার্গের ঝুঁকি বাড়ছে বছর বছর।

জাপানের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে সাম্প্রতিক টানা বর্ষণ ও বন্যায় দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং অসংখ্য মানুষ নিখোঁজের ঘটনা গোটা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। গত ত্রিশ বছরে জাপানে এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যায়নি। প্রযুক্তি আর নিরাপত্তার পর্যাপ্ত উপকরণসমৃদ্ধ জাপানের মতো একটি দেশকেও প্রকৃতির কাছে অসহায়ভাবে লড়তে দেখা যায়। বন্যা পরবর্তী তাপমাত্রাবৃদ্ধিজনিত কারণে চীন ও জাপানে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও সাম্প্রতিক বছরে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রাবৃদ্ধিজনিত কারণে মৃতের সংখ্যা বাড়ার খবর আসছে।

শীতের দেশ কানাডা। গত জুলাইয়ের শুরুতে কানাডার পূর্বাঞ্চলে তাপদাহে মৃতের সংখ্যা সত্তর ছাড়িয়ে যায়। বাতাসে আর্দ্রতা থাকায় ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মতো অসহনীয় অনুভূত হয়। ঠিক একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় ইউরোপ ও আফ্রিকাতে। প্রতি বছর গোটা পৃথিবীতে তাপমাত্রাবৃদ্ধিজনিত কারণে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। একই কারণে নানা ধরনের রোগে মানুষের জীবনের ঝুঁকি বাড়ছে। উন্নত দেশগুলোর গবেষণার ফলাফল থেকেই আমরা জানতে পারি, বাংলাদেশ বৈশ্বিক উষ্ণতাবৃদ্ধিজনিত প্রতিক্রিয়া এবং জীবন ও সম্পদের ক্ষতির সম্ভাবনার তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে। আন্তর্জাতিকভাবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ Most vulnerable country হিসাবে পরিচিত।

বিশ্বে ক্রমবর্ধমান নগরায়ন ও শিল্পায়ন প্রকৃতির বিরূপ আচরণের জন্য দায়ী হলেও আধুনিক যুগে এই দুয়ের বিরুদ্ধে বলার কিছু নেই। বিশ্বে শিল্পায়ন আর নগরায়ন থামবে না। আধুনিক জীবনযাপন থেকে আমরা বিশ্ববাসী আর পেছনে ফিরে যেতে পারব না। সময় থাকতে সতর্ক হতে হবে।

বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে অনেক আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়গুলো সাধারণ মানুষ কম বেশি সবাই জানেন। বিগত পঞ্চাশ বছরে মানবসৃষ্ট কার্যকলাপ বিশেষ করে জৈব জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকর গ্রিনহাউস গ্যাস বেড়ে যাওয়ায় পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। বিগত কয়েক যুগে আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতির দিকে তাকালে দেখতে পাই- জলাশয়ে দেশি মাছের বিলুপ্তি ঘটেছে এবং কোনো কোনো প্রজাতি বিপন্নের তালিকায় আছে। দ্রুত কমে যাচ্ছে বনাঞ্চল। বৃক্ষ ও বন্যপ্রাণীর ক্ষেত্রেও বিলুপ্ত আর বিপন্ন তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। জলজ ও বন্যপ্রাণীর পর বিরূপ প্রকৃতির টার্গেট যে মানুষ এ বিষয়টি বুঝতে খুব বেশি মেধার প্রয়োজন নেই। আমরা চরম ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা একটি দেশের বাসিন্দা। এক্ষেত্রে আমাদের জীবনে কী ধরনের স্বাস্থ্য ঝুঁকি আসতে পারে সে বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত না করলেই নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০০৩ সালে ইউরোপে অধিক তাপমাত্রাজনিত কারণে অতিরিক্ত সত্তর হাজার মানুষের মৃত্যুর রেকর্ড পাওয়া যায়। অসহনীয় তাপমাত্রার কারণে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে এ মৃত্যুর হার বেশি। অধিক তাপমাত্রাজনিত কারণে বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পায়, যার ফলে হৃদরোগসহ শ্বাসতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে চীন, জাপান ও ভারতে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং বন্যায় গত ৬০ বছরের রেকর্ডে দেখা যায় অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা তিনগুণ বেড়েছে। বন্যা পরবর্তী তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া, বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট এবং দূষিত পানি পানের কারণে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কিছু সংকটকে চিহ্নিত করেছে। ওই তথ্যমতে আগামী পৃথিবীতে বিশুদ্ধ বায়ু, নিরাপদ খাবার পানি, পর্যাপ্ত খাদ্য এবং আশ্রয় সংকট দেখা দিতে পারে। ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীতে অপুষ্টি, ম্যালেরিয়া, ডায়রিয়া এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে প্রতিবছর বাড়তি দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটতে পারে। বাংলাদেশের মতো স্বাস্থ্য সুবিধার দুর্বল অবকাঠামোর দেশগুলোতে এ ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া অনেক কঠিন হবে।

মূল্য পরিশোধ না করে কোনো কিছুই পাওয়া যায় না। যেহেতু আমরা আধুনিক জীবনযাপনের সুবিধা ভোগ করছি সেহেতু প্রকৃতির বিরূপ আচরণ আমাদের মেনে নিতেই হবে। এর বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকার কৌশল আবিষ্কার করতে হবে। প্রকৃতির প্রতি সদয় আচরণের চর্চা নিজের সন্তানকে শিশুকাল থেকেই শিক্ষা দিতে হবে। প্রকৃতি ও পরিবেশকে মায়ের মতোই ভালোবাসতে হবে। মনে রাখতে হবে- এই প্রকৃতি এই পরিবেশই আমাদের মা। সন্তানের সুস্থতার জন্য মায়ের সুস্থতা অপরিহার্য।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter