সবুজের ছোঁয়ায় সবুজ প্রাণ

  মুকিত মজুমদার বাবু ১৮ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রবীন্দ্রনাথ ‘বৃক্ষবন্দনা’ কবিতায় বলেছেন,

অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান

প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদিপ্রাণ;

পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির আগে সৃষ্টি হয়েছিল গাছ। রঙে রঙে সেজেছিল প্রকৃতি। মানুষ সৃষ্টির পর বনই ছিল তাদের অন্যতম আশ্রয়। শুধু আশ্রয়ই নয়- খাবার, পোশাক, ওষুধসহ ইত্যাদির জোগানদাতা, অর্থাৎ পরম বন্ধু। মানুষ তাই প্রাচীনকাল থেকে গাছ দেবতা জ্ঞানে পূজা করে আসছে। কুড়মী সমাজের করম, গরাম প্রভৃতি পূজা তারই উদাহরণ। এমনকি গাছের প্রতি সম্মান দেখাতে যুবকরা আমগাছ এবং যুবতীরা মহুল গাছ বিয়ে করার রীতি প্রচলিত আছে।

মানুষ ছাড়া প্রকৃতি বেঁচে থাকতে পারে, কিন্তু প্রকৃতি ছাড়া মানুষ কোনোভাবেই বেঁচে থাকতে পারে না। মানুষকে বাঁচতে হলে অবশ্যই অক্সিজেন দরকার। আর সে অক্সিজেন দেয় গাছ। বাতাস থেকে দূষিত কার্বন ডাই আক্সাইড গ্রহণ করে পরিবেশ রাখে দূষণমুক্ত। পাখ-পাখালি গাছে আশ্রয় নিয়ে সুস্থ পরিবেশে নতুনমাত্রা যোগ করে। গাছ আমাদের কি না দেয়! খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয় ছাড়াও গাছ থেকে পাই আসবাবপত্র, স্টিমার, লঞ্চ, ট্রাক, নৌকা ইত্যাদির অবকাঠামো। এছাড়াও গাছ আমাদের জ্বালানি দেয়, মাঠ ফাটা রোদে শীতল ছায়া দেয়, ঝড়-ঝঞ্ঝায় আগলে রাখে, মাটির ক্ষয়রোধ করে, চারপাশের সৌন্দর্য বর্ধন করে, সুগন্ধি দেয়, বিষণ্ণতায় প্রশান্তি দেয়, অভাব-অনটনে অর্থের জোগান দেয়, অসুখ-বিসুখে ওষুধ ও পথ্য দেয়, আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখে। কাগজ, রেয়ন, দিয়াশলাই, প্যাকিং বক্স ইত্যাদি শিল্পের কাঁচামালের জোগান আসে গাছ থেকে। তবে অক্সিজেন দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য গাছের কাছে আমরা সত্যিই ঋণী। কানাডার জাতীয় পরিবেশ এজেন্সির একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ‘গড়পড়তায় একটি গাছ থেকে বছরে ২৬০ পাউন্ড অক্সিজেন পাওয়া যায়। আর দুটি পরিপূর্ণ গাছ যে অক্সিজেন সরবরাহ করে তা চার সদস্যের একটি পরিবারের জন্য যথেষ্ট।’ তাই অবলীলায় স্বীকার করতেই হবে গাছের মতো উপকারী বন্ধু-আত্মীয় হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো পৃথিবীতে আর কেউ নেই।

ইন্ডিয়ান ফরেস্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের গবেষকরা ৫০ বছর বেঁচে থাকা একটি গাছ আমাদের কতটা আর্থিক সুবিধা দেয় তার একটা হিসাব তুলে ধরেন, ‘বায়ুদূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করে দশ লাখ টাকার, জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেন দেয় পাঁচ লাখ টাকার, বৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে বাঁচায় পাঁচ লাখ টাকা, মাটির ক্ষয়রোধ ও উর্বরাশক্তি বাড়িয়ে বাঁচায় পাঁচ লাখ টাকা, গাছে বসবাসকারী প্রাণীর খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে বাঁচায় পাঁচ লাখ টাকা, আসবাবপত্র ও জ্বালানি কাঠসহ ফল সরবরাহ করে পাঁচ লাখ টাকার এবং বিভিন্ন জীবজন্তুর খাদ্য জোগান দিয়ে বাঁচায় আরও ৪০ হাজার টাকা।’

যদি আমাদের বেঁচে থাকার মূলমন্ত্র গাছে নিহিত থাকে তাহলে কেন আমরা উপকারী বন্ধু গাছের বুকে করাত চালাচ্ছি? কেন আমরা বৃক্ষনিধন যজ্ঞে ঘি ঢেলে যাচ্ছি? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই প্রাচীনকাল থেকে মানুষ প্রকৃতিকে ধ্বংস করে আসছে যা আজও চলমান। তাহলে কী এ হত্যাযজ্ঞ আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া? কোনোদিনও কি গাছ হত্যা বন্ধ হবে না?

প্রায়ই গণমাধ্যমে গাছ হত্যার চিত্র উঠে আসছে। তবে এ কথাও ঠিক যে যত গাছ হত্যা হচ্ছে তার অধিকাংশই থেকে যাচ্ছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। আমরা গাছ উজাড়ের সব চিত্র তুলে আনতে পারছি না। অবিশ্বাস্য মনে হলেও সত্যিটা এই যে, প্রতি বছর পৃথিবী থেকে ৩২ মিলিয়ন একর বনভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ বলেছে, গত ১০ বছরে বিশ্বে বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ হেক্টর বনাঞ্চল। সেই হিসেবে প্রতি মিনিটে ধ্বংস হচ্ছে প্রায় আট হেক্টর বনভূমি। পৃথিবী থেকে এভাবে ক্রমশ যদি বনাঞ্চল উজাড় হতে থাকে তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের অস্তিত্বও একদিন বিলুপ্ত হয়ে যাবে!

দেশের মোট আয়তনের ২৫ ভাগ বনভূমি থাকার কথা থাকলেও আমাদের তা নেই। প্রায়ই দেখা যায় শহরের কোনো উদ্যানে স্থাপনা নির্মাণে পরিবেশবিদদের কথা উপেক্ষা করে গাছ কাটা হচ্ছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় করে সেখানে গড়ে তোলা হচ্ছে চিংড়ি ঘের। গাছ কাটার ফলে সবুজ পাহাড় ন্যাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামাজিক বনায়নের শত শত গাছ কেটে নিয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালীরা। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাড়তি বসতি স্থাপনেও প্রতিনিয়ত কাটা পড়ছে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। শিল্পাঞ্চলও গড়ে উঠছে কোনো না কোনো গাছ হত্যার মধ্য দিয়ে। প্রশ্ন হল, আর কতদিন চলবে গাছ হত্যার এ অনৈতিক খেলা?

গাছের কাছে আমরা ঋণী। আমরা সেই ঋণ শোধ করছি অসভ্য বর্বর যাযাবর মানুষের মতো। আমাদের শিক্ষা আছে, দীক্ষা আছে, জ্ঞান আছে, আছে গর্ব করার মতো অনেক কিছু। আমরা ভালো করেই বুঝি আমাদের ভালো-মন্দ। শুধু ব্যক্তিগত বা মুষ্টিমেয় মানুষের স্বার্থের কারণে মানব জাতির ললাটে নেমে আসুক চরম বিপর্যয়- এমন অনাকাক্সিক্ষত চাওয়াটা কারও কাম্য হতে পারে না। তাই সবার স্বার্থে, সবার কল্যাণে গাছ উজাড় নয়, গাছ সংরক্ষণ করতে হবে। বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। আর সময়টা এখনই। সারা দেশে চলছে বৃক্ষমেলা। দেশের সব পরিবারের সব সদস্য যেন বৃক্ষমেলা থেকে একটা করে গাছের চারা কিনে লাগায় এবং তার যেন পরিচর্যা করে। অফিস-আদালতের ফাঁকা জায়গায়, রাস্তার ধার, অনাবাদি জমি, উপকূলীয় অঞ্চল, নদীর ধারে অর্থাৎ যেখানে গাছের চারা লাগান যায় সেখানেই পুঁতে দিন একটা সবুজ গাছের চারা। পরিচর্যার জন্য একটু সচেতন হোন। গাছের চারার সঙ্গে আপনার সবুজ স্বপ্নও দিন দিন বেড়ে উঠবে। দেশ সবুজ হয়ে উঠবে। সেই সবুজের ছোঁয়ার মনও হয়ে উঠবে সবুজ।

লেখক : চেয়ারম্যান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter