মন পবনের নাও

স্বপ্নের ফেরিওয়ালার সঙ্গী আমরাও

হুমায়ূন আহমেদ ১৩ নভেম্বরের ১৩ কে অপয়া কিংবা জন্মের সময় মোমবাতি নিভে যাওয়াকে অমঙ্গলের চিহ্ন বলে মজা করতে ছাড়েননি নিজের জন্মদিন নিয়ে। কেউ কি ভেবেছিল বাংলা সাহিত্যের আকাশে সেদিন এক নতুন সূর্য উঠেছিল যার কিরণে মোমবাতির আলোর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে

  তোফায়েল আহাম্মদ তানজীর ১৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হুমায়ূন আহমেদ ১৩ নভেম্বরের ১৩ কে অপয়া কিংবা জন্মের সময় মোমবাতি নিভে যাওয়াকে অমঙ্গলের চিহ্ন বলে মজা করতে ছাড়েননি নিজের জন্মদিন নিয়ে। কেউ কি ভেবেছিল বাংলা সাহিত্যের আকাশে সেদিন এক নতুন সূর্য উঠেছিল যার কিরণে মোমবাতির আলোর প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। শৈশবে উদ্দেশ্যবিহীন ঘোরাফেরার মাঝেই একদিন কদম ফুলের মতো মিষ্টির খোঁজ পান, পরদিন ছোটবোন শেফুকেসহ মিষ্টির আশায় ওই বাড়িতে গিয়ে পেয়ে যান স্বপ্নলোকের চাবি। জোছনার ফুল মাখানো দুরন্ত শৈশব পেরিয়ে যিনি কিনা একাধারে হয়ে উঠেছিলেন বংশীবাদক, ম্যাজিকম্যান, আহমাদিয়া হোটেলের বাবুর্চি কাম প্রোপাইটরসহ আরও কত কি? ছোট্ট একটা জীবন কত বিচিত্রভাবেই না কাটিয়েছেন, আর আমাদের সুযোগ করে দিয়েছেন বৈচিত্র্যের স্বাদ আস্বাধনের।

নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার থেকে শুরু করে মেঘ বলেছে যাব যাব, অপেক্ষা, অন্ধকারের গান, জনম জনম, তোমাকে, বাসর, দিনের শেষে, চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস, আনন্দ বেদনার কাব্য ইত্যাদি উপন্যাসগুলোর হাসিকান্না যেন আমাদের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনাকে একাকার করে দিয়েছে। মনে হয়, উপন্যাসগুলো আমাকেই নিয়ে লেখা। মূল চরিত্রটি আমি। বৃষ্টিবিলাস উপন্যাসের সেই বৃষ্টিতে বাবাকে নৃশংসভাবে খুন হতে দেখে ভয় পেয়ে বৃষ্টি এলেই পাগল হয়ে যাওয়া ছেলেটির কথা। উপন্যাসের শেষে কত স্বার্থত্যাগী প্রেম যে কিনা ধনীর দুলাল প্রতিষ্ঠিত পাত্রকে বিয়ে করা বাদ দিয়ে গভীর ভালোবাসায় হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে ভয় পাওয়া ছেলেটিকে ভালো করে দিতে চায়।’

আমাদের নিজেদের ইতিহাস নিয়ে উপন্যাস এত সুন্দর করে লিখেছে কি কেউ কোনো দিন? মধ্যাহ্ন, মাতাল হাওয়া, জোসনা ও জননীর গল্প যেন নতুন করে নতুন সুতোয় গেঁথেছে পুরো বাংলাদেশকে। তার লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস গৌরীপুর জংশন কেন ইংরেজি, রাশিয়ান, হিন্দিসহ পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছিল এর উত্তর জানতেই হয়তো আগ্রহ নিয়ে বইটি পড়লাম। আহ! একজন স্বপ্নদ্রষ্টা যে কতভাবে তার স্বপ্ন সাজাতেই পারে তারই নমুনা যেন গৌরীপুর জংশন। বইটি পড়ে ট্রেন, পরিত্যক্ত ওয়াগন, লাইনম্যান, মালবাবু, কুলি থেকে শুরু করে ট্রেনের চাকাকেও যেন মনে হয় একান্ত আপন। উপন্যাসের একটু উদ্ধৃতির লোভ হচ্ছে পাঠকদের জ্ঞাতার্থে- ‘এই স্টেশনে কত প্রিয়জনের বিদায় দৃশ্য সে দেখেছে- কত মধুর সেসব দৃশ্য। বিয়ের পর মেয়ে স্বামীর সঙ্গে চলে যাচ্ছে। মেয়ের বাবা-মা-ভাই-বোন-এরা সবাই এসেছে বিদায় দিতে। ট্রেন চলতে শুরু করা মাত্র এরা সবাই ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াতে শুরু করল। যেন কিছুতেই এই ট্রেনকে চোখের আড়াল করবে না। মেয়ের বৃদ্ধা দাদি তিনিও দৌড়াচ্ছেন। গার্ড সাহেব এই দৃশ্য দেখে বাঁশি বাজিয়ে ট্রেন থামিয়ে দিলেন। গম্ভীর মুখে বললেন, ব্রেকে গণ্ডগোল আছে, এই ট্রেন এক ঘণ্টা লেট হবে। আহা! এই গার্ড সাহেবের মতো লোক হয় না। এরা আসলে ফেরেশতা। মানুষের সাজ-পোশাক পরে ঘুরে বেড়ায়। সবাই ভাবে সে বুঝি আমাদের মতোই একজন মানুষ। এটা উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জয়নালের একটি সংলাপ।

হৃদয়ে কত প্রেম ছিল বলে তিনি নবনী, তোমাকে, কৃষ্ণপক্ষ, মেঘ বলেছে যাব যাব সেদিন চৈত্রমাস, শ্রাবণ মেঘের দিনের মতো প্রেমের উপন্যাস লিখতে পেরেছেন? শুধু কি উপন্যাস? ডজন খানেকের অধিক সিনেমা কোনটা ভুলে যাওয়া যায়? আগুনের পরশমণির মতো সিনেমা একটাই তো যথেষ্ট অমরত্বের জন্য। আর নাটকের কথা কি বলব? এসব দিন রাত্রির সুখী নীলগঞ্জের স্বপ্নদ্রষ্টা আসলে কে? আমার তো মনে হয় আমরা সবাই। হুমায়ূন আহমেদ শুধু ভাবনাটা আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া বহুব্রীহি তো রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়েছে তুই রাজাকার বলে। এছাড়া উড়ে যায় বকপক্ষী, হাবলঙ্গেও বাজারে, কিংবা জলিল সাহেবের পিটিশন কোনটার চেয়ে কোনটা ভালো! গত হুমায়ূন-বইমেলায় গিয়ে না পড়া তিনটি বই কেনার পাশাপাশি একটি বইয়ে চোখ পড়তেই বুকের মাঝে যেন নতুন এক শূন্যতার সৃষ্টি হল ফেরা উপন্যাসটি দেখে। আচ্ছা! এরকম উপন্যাস কি আর কখনও আসবে বাংলা সাহিত্যে?

একজন লেখক এত কষ্টের মালা কীভাবে গাঁথেন? আমিন ডাক্তারের বিনা কারণে বারো বছর জেল খেটে চেনা গ্রামে অনেচনা হয়ে ফিরে আসার দৃশটি যেন চোখের পাতার সঙ্গে সঙ্গে তৃষিত হৃদয়টাকেও ভিজিয়ে দেয়। ফেরা উপন্যাসের আমিন ডাক্তারের চরিত্রটির সঙ্গে আর কোনো চরিত্রের তুলনা চলে? আসলে এসব প্রশ্নের উত্তর মিসির আলীর মতো যুক্তিতে না খুঁজে বরং আমরা হিমুকে দিয়েই অন্য একটা হিমুকে জেনে নিই। হুমায়ূন আহমেদের মধ্যে কার দখল বেশি- হিমু নাকি মিসির আলী। এর উত্তরে তিনি নিজেই বলেছেন হিমুর কথা। হিমু যুক্তির চেয়ে আবেগকেই উপরে রাখে। আমরা বাঙালি জাতি হিসেবে হয়তো আবেগকেই বড় করে দেখি। একজন শিক্ষক হিসেবে জানি, যুক্তি দিয়ে যা সম্ভব নয় আবেগ দিয়ে তা সহজেই সম্ভব। এই আবেগ দিয়েই তো আমরা ইংরেজদের সঙ্গে লড়াই করেছি এবং তাদের তাড়িয়েছিও। এই আবেগ থেকেই আমরা সঠিক হিসাব করে ফেলেছি যে, পাকিস্তানিরা আমাদের বঞ্চিত করছে; সেই আবেগ দিয়েই নির্বাচনে তাদের হারিয়েছি, প্রশিক্ষিত সৈন্য এবং পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি বিনা অস্ত্রে শুধু একটি আহ্বানে! শৃঙ্খলিত মাকে মুক্ত করেছি, না হয় ভাইকে হারিয়েছি তাকে কী? ভাইয়ের রক্তের চেয়ে কি মায়ের ইজ্জত বড় নয়?

মৃত্যুর পূর্বে লেখা হুমায়ূন আহমেদের কচ্ছপ কাহিনী পড়ে আবেগে আপ্লুত হয়েছি, আবারও সৃষ্টি! তাও ক্যান্সার হাসপাতাল! তবে রহস্যময় সংখ্যা কিংবা প্রাইম নাম্বার যাই বলুন, হুমায়ূন আহমেদের তিন এ আমার বৃদ্ধ স্কুল শিক্ষক পিতা, আমি, এবং আমার স্কুলে ছাত্র/ছাত্রীরা অবশ্যই আছি, থাকব। স্বপ্নের ক্যান্সার রিসার্চ সেন্টারে থাকবে মা, মাটি ও মানুষের সংমিশ্রণ। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি ধনী, গরিব, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষক, শ্রমিক সবাই এগিয়ে আসছে। তাদের স্বপ্নের ফেরিওয়ালা স্বপ্ন নিয়ে এসেছে, এখন শুধু সামনে এগুনোর পালা।

লেখক : শিক্ষাবিদ, অধ্যক্ষ ও কলামিস্ট

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×