২০১৮

ফ্যাশনে বাংলাদেশ

সালতামামি

  গাজী মুনছুর আজিজ ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বছর শেষে দেশীয় হাল ফ্যাশনের ক্যানভাসে ফিরে তাকালে খুব ভালো কিছু হয়েছে এমনটা বলা যাবে না। আবার একেবারেই কিছু হয়নি এমনটিও বলা যায় না। তবে নতুন কিছু করার চেষ্টা ছিল সবার মনে-প্রাণে। বলা যায় নিজেদের রঙে-ঢঙে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছেন অনেকেই। আবার নিজেদের রঙ-ঢঙের সঙ্গে বাইরের বা পশ্চিমা রঙ-ঢঙের মিশেল করার চেষ্টাও করেছেন অনেকে। ফলে নিজেদের জায়গা থেকে নতুন কিছু একটা করা গেছে পুরোপুরি বলা যাচ্ছে না; অন্যদিকে পশ্চিমার মিশেলটাও যে পুরোপুরি করা গেছে এমনটাও বলা যাচ্ছে না। তাই চেষ্টা চলছে বলাই শ্রেয়।

আড়ংয়ের ফ্যাশন ডিজাইনার ফয়েজ হাসান বলেন, ২০১৮ সালটা খুব একটা ভালো যায়নি। বলা যেতে পারে অস্থিরতা ছিল। অস্থিরতা বলতে সবাই কিছু একটা করতে চেয়েছেন বা চেষ্টা করেছেন, তবে সেটা করতে পারেননি বলে মনে হয়। অবশ্য এ চেষ্টার ফলটা হয়তো নতুন বছরে পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। যে চেষ্টাগুলো করা হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হল- ইভেন্টের নামে পরিবর্তন আনা। যেমন অন্যান্য বছরগুলোতে ঈদ সংগ্রহ, পূজা সংগ্রহ, বৈশাখ সংগ্রহ বা শীত সংগ্রহ- ইত্যাদি নামে ইভেন্টগুলোর প্রচার ছিল। ইভেন্টগুলো ছিল দেশীয় মাত্রায়। সেখান থেকে বেরিয়ে কেউ কেউ ২০১৮ সালে ইভেন্টগুলোকে সামার কালেকশন, উইন্টার কালেকশন, স্প্রিং কালেকশন, ফল কালেকশন বা বিভিন্ন নামে প্রচার চালিয়েছেন। যেটা অনেকটা ওয়ার্ল্ড ফ্যাশনের অনুসরণ বলা যেতে পারে। শুধু নামে নয়, ওয়ার্ল্ড ফ্যাশনের রঙ-ঢঙকেও অনুসরণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। যেমন- ওয়ার্ল্ড ফ্যাশনের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে হালকা রঙ ও প্রিন্টেড প্রাধান্য পায়। সেই অনুসরণ হিসেবে আমাদের দেশীয় ফ্যাশনেও এবার হালকা রঙটাকে প্রাধান্য দিয়েছেন অনেকে। আবার ভারি ভারি কাজের পরিবর্তে হালকা রঙের প্রিন্টেরও প্রাধান্য ছিল। আসলে আমরা সাধারণত প্রাইমারি কালারটাকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করে আসছি। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ফ্যাশনের কালারের দিকে খেয়াল করলে দেখা যায়, সেখানে প্রাইমারি কালারটাকে কম ব্যবহার করে সেখান থেকে হালকা একটা রং ব্যবহার করছে। ঠিক এ ধারাটা এবার আমাদের পোশাকেও লক্ষ করা গেছে। যেটাকে ওয়ার্ল্ড ফ্যাশনের অনুসরণ বলা যেতে পারে।

ফ্যাশন প্যাটার্ন অনেকটাই ঘুরে ঘুরে আসে। সে ধারাবাহিকতা লক্ষ করা গেছে এবারের ফ্যাশনেও। এবার অনেকেই ৬০ বা ৭০ দশকের ফ্যাশনটা আনার চেষ্টা করেছেন নিজেদের ছকে ফেলে। বিশ্বব্যাপীও এবার সেটাই হয়েছে। এখানেও বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার চেষ্টা করেছি আমরা।

গরম কিংবা নানা কারণে এবার প্রিন্ট বেশি চলেছে। কমেছে ভারির ব্যবহার। আর সে কারণে ক্যাজুয়াল ফ্যাশনের ব্যবহার বেশি হয়েছে। অথবা বলা যায় ক্যাজুয়াল ফ্যাশনটাকে রেডি টু ওয়্যারে নিয়ে আসা হয়েছে। অর্থাৎ ক্যাজুয়াল ফ্যাশনটাকে মেইনস্ট্রিমের ফ্যাশনে ফেলা হয়েছে। ফলে পার্টি ড্রেস বলে যে আওয়াজটা ছিল, সেটা একটু কমেছে বলা যায়। সেখানে ক্যাজুয়ালটাকেই সবখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে একাধিক পোশাক ব্যবহারের প্রচলনটা বেড়েছে। আবার এর সঙ্গে মেচিং করে জুতার কদরও বেড়েছে। যেহেতু ক্যাজুয়ালটাকে সবখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাই সব ক্যাজুয়ালের সঙ্গে আলাদা আলাদা মোচিং জুতার দরকার পড়েছে। বলা যায় অনেকটা ফ্যাশনটাকে কমপ্লিট করার জন্য এটা করেছেন। অন্যদিকে সেই তুলনায় গয়নার ব্যবহার কম দেখা গেছে। বলা যায়, এখানেও মানুষ হালকা হতে চেষ্টা করেছেন।

বড় ইভেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিলের ফ্যাশন আয়োজনটা হয়নি। অন্যদিকে আড়ংয়ের ঈদ ফ্যাশনসহ তাদের ৪০ বছর পূর্তি উৎসব ছিল ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির বড় আয়োজন। এছাড়া অঞ্জন’স, কে ক্র্যাফট, লা রিভ, প্রেমস কালেকশনসহ বেশ কয়েকটি হাউস ঈদসহ বিভিন্ন উপলক্ষে ফ্যাশন শো করেছেন। অন্যদিকে দেশী দশের হাউসগুলো এ বছরই তাদের কো-ব্র্যান্ডগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেছেন। এসব কো-ব্র্যান্ড হচ্ছে নিপুণের মাকু, কে ক্রাফটের ইয়াংকে, অঞ্জন’সের আর্ট অব ব্ল–, রং বাংলাদেশের ওয়েস্ট রং, বাংলার মেলার বাংলা হাট, সাদাকালোর বিয়ন্ড সাদাকালো, বিবিয়ানার বালিকা বেলা, দেশালের এসেন্স অব দেশাল, নগরদোলার হ্যান্ড টাচ ও সৃষ্টির প্রিন্ট ক্রাফট। উদ্যোক্তারা জানান, এসব কো-ব্র্যান্ডের মাধ্যমে নতুন আঙিকে নতুন ভাবনায় দেশী দশের নতুন করে পথচলা শুরু হল। আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিন নিপুণের কর্ণধার আশরাফুর রহমান ফারুক বলেন, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশীয় উপকরণে দেশীয় স্টাইলের বাইরে পোশাক ক্রেতার হাতে তুলে দিতেই দেশী দশের এসব কো-ব্র্যান্ড। যদিও আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো অনেক আগে থেকেই কো-ব্র্যান্ড তৈরি করে এবং ক্রেতারাও তা গ্রহণ করেন। তবে আমাদের দেশে ধারণাটি নতুন। ক্রেতারা কীভাবে এটাকে গ্রহণ করবে তার জন্য হয়তো একটু অপেক্ষাও করতে হবে। আমাদের চেষ্টা থাকবে মূল ধারার চেয়ে একটু আলাদাভাবে কো-ব্র্যান্ডগুলোকে উপস্থাপন করা। সাদাকালোর আজহারুল হক আজাদ বলেন, আপাতত কো-ব্র্যান্ডগুলো বসুন্ধরা সিটির দেশী দশেই প্রদর্শনী ও বিক্রির ব্যবস্থা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য দেশী দশেও এ ব্যবস্থা করা হবে। সেই সঙ্গে কো-ব্র্যান্ডগুলোর আলাদা আলাদা বিক্রয় কেন্দ্র খোলার প্রচেষ্টাও আমাদের রয়েছে। এ কো-ব্র্যান্ডের মাধ্যমে দেশীয় ঘরানার পোশাকগুলোকে আন্তর্জাতিক রূপ দেয়ার চেষ্টা রয়েছে বলে যেমন মনে হয়, তেমনি এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম দেশীয়টাকে গ্রহণ করে আন্তর্জাতিকতার একটা স্বাদ নিয়ে বড় হবে বলেও প্রত্যাশা করা যায়।

ভিন্ন কিছু করার প্রয়াসে বিশ্বরঙ ২০১৭ সালে ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য-স্থাপনা নিয়ে উঅঈঈঅ ঞড় উঐঅকঅ শিরোনামে পোশাক করেছিল। একই বছর তারা পোশাকে উপস্থাপন করেছে বাংলা সিনেমার পোস্টার। এমন ব্যতিক্রমী কাজ এ বছর হয়েছে বলে চোখে পড়েনি। এছাড়া মানাস নামের হাউস শিল্পীদের কাছ থেকে কপিরাইট নিয়ে কাজ করেছেন। এটা খুবই ভালো দিক। শিল্পী কামরুল হাসানের তিন কন্যা ছবি দিয়ে তাদের শাড়ি চোখে পড়েছে। এছাড়া তাদের বাংলা কবিতা, বাংলা সিনেমার পোস্টার নিয়ে করা কাজও চোখে পড়েছে।

এছাড়া এবারের ঈদ, পূজা বা বৈশাখে বিভিন্ন হাউস ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন; আর এর মাধ্যমে সবাই চেষ্টা করেছেন যাতে অন্য বছরের কাজের সঙ্গে এ বছরের কাজের বিষয়ের মিল যেন না থাকে। যেটা অনেকটা রুটিনমাফিক কাজ। তাই খুব ব্যতিক্রমী কিছু হয়েছে বা বিপ্লব ঘটেছে এমন কিছুর আভাস পাওয়া যায়নি। তবে আবারও বলছি সবাই মনে-প্রাণে চেষ্টা করেছেন। সেটাই বা কম কীসের।

জয় হোক দেশী ফ্যাশনের।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×