সুখের ঠিকানা

  জোবায়ের রুবেল ০৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সুখের ঠিকানা
সুখের ঠিকানা। ছবি সংগৃহীত

সেতু ও ইমরান চার বছর প্রেম করার পর দুই বছর সংসার করছেন। প্রেম করার সময় ভালোই ছিল কিন্তু সংসার করতে এসে তারা পড়েছেন নানা ঝামেলায়। প্রতিদিন ঝগড়া চলেছে নিজেদের মধ্যে। কখনও ঘুমানো নিয়ে, কখনও খাওয়া নিয়ে, কখনও ফেসবুক নিয়ে, কখনও বাজার করা নিয়ে আবার কখনও টাকা-পয়সা নিয়ে।

তাই বলে যে তাদের ভালোবাসা কমে গেছে তা কিন্তু না। ভালোবাসা ঠিকই আছে। সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়, যা তারা বুঝতে পারছেন না। এমন পারিবারিক সমস্যায় শুধু সেতু আর ইমরানই নয় অধিকাংশ মানুষ নিজেদের তৈরি এ ফাঁদে পড়ে শুধু হাহাকার করছে কিন্তু বের হতে পারছেন না।

লোকের মুখে প্রায়ই বলতে শোনা যায় সুখ ও শান্তিতে থাকার জন্য ভালো সম্পর্ক খুব দরকার। কিন্তু এ কথাটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। সুখ ও শান্তিতে থাকার জন্য ভালো সম্পর্কের কোনো দরকার নেই। কারণ- সুখের সঙ্গে শর্ত যুক্ত হলে সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয় না। এতে ব্যক্তির স্বতন্ত্রতা হারায়। আর মানুষ যখন স্বতন্ত্রতা হারায় তখন সে এমনিতেই দুঃখী হয়ে যায়। তখন তার সুখ-দুঃখের নিয়ন্ত্রণ থাকে অন্যের হাতে। মানুষ বিশ্বাসই করতে পারে না সুখের জন্য কোনো কিছুরই দরকার নেই। কোনো কিছু না মানে কোনো কিছুই না। প্রতিটি মানুষ পুরোটাই একটা সুখের ডিব্বা। প্রকৃতিগতভাবে মানুষ জন্ম থেকেই সুখী। মানুষের দুঃখের প্রধান কারণ হচ্ছে- তারা জন্মগতভাবেই সুখী এ কথাটা বিশ্বাস করতে না পারা। আর কোনো কারণ নেই। এ কথাটা আগে বিশ্বাস করুন। তাহলেই আসল সুখটা নিজে নিজেই অনুভব করতে পারবেন।

ধরুন- আপনার হাতে পূর্ণ এক গ্লাস দুধ। আপনি কি সেই গ্লাসের মধ্যে আরও দুধ রাখতে পারবেন? অবশ্যই না। আবার যদি মনে করেন, দুধে একটু চিনি দিয়ে মিষ্টি বাড়াবেন অথবা দুধে রং দিয়ে আরও সাদা করবেন। তা হলে কি সেই দুধ প্রকৃতিক থাকবে? এ দুধ কি তখন স্বতন্ত্রতা হারাবে না?

তেমনিভাবে একটু ভেবে দেখুন, সেতু আর ইমরান কি ভাবেনি তাদের বিয়ে হলে তাদের জীবন আরও রঙিন হবে, আরও মধুময় হবে, সুখ আরও দীর্ঘস্থায়ী ও শান্তিময় হবে। তাহলে কি আপনার সুখের অবস্থা ওই দুধের মতোই হবে না? মনে মনে ভেবে দেখুন। যেখানে দুধের পুষ্টি, স্বাদ, রং ও গন্ধ সবই পূর্ণাঙ্গ। ঠিক তেমনই মানুষের নিজের ভেতরে যে সুখ আছে শান্তি আছে, মানুষ সেদিকে না তাকিয়ে বাইরে থেকে সুখ আনার চেষ্টা করে। একটা পূর্ণাঙ্গ জিনিস তো আপনি আরও পূর্ণাঙ্গ করতে পারবেন না।

আচ্ছা সুখ কি বাইরে তৈরি হয়? না কি নিজের ভেতরে? যদি মনে খটকা থাকে তাহলে বলি, বিয়ে করলে/ডিভোর্স হলে অথবা কোটি টাকা পেলে সব মানুষের মনে কী একই ধরনের প্রতিক্রিয়া হয়? সবাই কী সুখী হয় অথবা দুঃখী? যখন একই ঘটনায় ভিন্ন ভিন্ন মানুষের মধ্যে আলাদা আলাদা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় তখন সেটি ল’ না বা ইউনির্ভাসেল ট্রু না। একই ঘটনায় কেউ সুখী হয় কেউ দুঃখী হয়। তাহলে কী বলতে পারেন, ভুল জায়গায় আপনি সুখ খুঁজছেন। কথায় একমত না হলে আরও ভাবুন।

নানা গবেষনায় দেখা গেছে ৯৯ শতাংশ মানুষ এই কমন ভুলটাই করে যাচ্ছে। যে সুখ ও শান্তিতে থাকার জন্য ভালো দাম্পত্য/সম্পর্কের খুব দরকার। মানুষের নিজের সঙ্গে নিজের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই অন্য সম্পর্কগুলো বুঝি না। বেশ জোর দিয়েই বলা যেতে পারে, আপনি পাশের বাসার ভাবির সম্পর্কে যতটা জানেন, নিজের সম্পর্কে তার অর্ধেকও জানেন না।

সম্পর্কের মধ্যে সমস্যার শুরু কীভাবে হয়?

অবশ্যই প্রত্যাশা থেকে। মানুষের সব সম্পর্কের আধার হল প্রত্যাশা। প্রথমে কি হয়- প্রিয় মানুষটির সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেই চলবে, আর কিছু চাই না জীবনে। কিন্তু তিন মাস পরেই কি হয়? মন কি বলে? স্বামী কেমন হবে, যে আমার জীবন সুখ আর শান্তিতে ভরে দেবে। বউ কেমন হবে, যে সব সময় অনুগত থাকবে? সন্তান কেমন হবে, যে আমার সেবা করবে আর আদেশ মেনে চলবে? এ প্রত্যাশা দিন দিন বাড়তেই থাকে। লোকে এক সময় প্রত্যাশা আর প্রয়োজনের পার্থক্যই বুঝতে পারে না। মানুষের প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু প্রত্যাশা মিটানো অসম্ভব।

পূর্ণ করার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও কোনো মানুষ কারো সব প্রত্যাশা পূর্ণ করতে পারবে না। কারণ- প্রত্যাশার জন্ম হয় মস্তিষ্কে, কোনো অন্য ব্যক্তি তার প্রত্যাশার কথা জানতেই পারে না। মানুষ প্রত্যাশাকে সব সম্পর্কের আধার করে বলেই, সম্পর্ক থেকে সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারছে না। কারো ব্যবহারে আপনি কষ্ট পেলে, প্রতিবার নিজেকে প্রশ্ন করুন- এই কষ্ট কী আপনার প্রয়োজন থেকে তৈরি, না কি প্রত্যাশা থেকে? এ প্রশ্নের উত্তর একবার বুঝতে পারলেই ভালো সম্পর্কের আসল রহস্য বুঝতে পারবেন। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এ প্রশ্নের উত্তর ৯৯ শতাংশ মানুষ নিজের মনের মতো করে ভাবে।

আর একটা ব্যাপার, দু’জন ব্যক্তি যখন কাছে আসে, তখন তারা একে অপরের জন্য সীমা আর মর্যাদা নির্ধারণের চেষ্টা অবশ্যই করে। এ সীমা আর মর্যাদা বেঁধে দিয়ে দ্বিতীয় ব্যক্তির ওপর নিজের প্রত্যাশা মতো নির্ণয় তার ওপর চাপিয়ে দেই। এ সবই আপনি করেন মনে মনে। এর পরে ব্যক্তি যখন তার স্বতন্ত্র (নিজের মতো) আচরণ করে তখন আপনার কাছে মনে হয় সে ব্যক্তি সীমা লঙ্ঘন করছে। আর তখনই তার মন দুঃখে ভরে যায়। হৃদয় ভরে ওঠে ক্রোধে। প্রতিহিংসার ভাবনায় সে এগিয়ে যায়। নিজে যে কষ্ট ভোগ করেছে তার থেকে বেশি কষ্ট বা শিক্ষা অপরকে দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করে। আর এ প্রতিশোধ নিতে গিয়ে সে স্বয়ং অন্যায় করে ফেলে। দ্রুত আবার সে অপরাধী হয়ে ওঠে।

আপনি নিজেই কী নিজের সব প্রত্যাশা পূরণ করতে পেরেছেন? নিজের যে প্রত্যাশা আপনি পূরণ করেননি, তার জন্য কি নিজেকে কখনও শাস্তি দিয়েছেন? দেননি! এমনকি শাস্তি দেয়ার কথা ভাবেনওনি। তাহলে আপনি যাদের শাস্তি দেয়ার কথা ভাবছেন তারা কি আপনার না? তারা কারা? আপনার বাবা-মা, বউ, বাচ্চা, ভাই-বোন, বন্ধু বা কলিগ এরা কারা? তাদের থেকে নিজেকে আলাদা ভাবছেন বলেই, দিন দিন সমস্যা বেড়েই চলেছে। ভালো সম্পর্কের আধার হল ভালোবাসা-প্রেম-মায়া। আর সেই প্রেম থাকে মানুষের হৃদয়ে।

তাই প্রত্যেক প্রতিশোধের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে নিজেকে এ প্রশ্ন অবশ্যই করুন- যে এ সিদ্ধান্ত কি স্বার্থ থেকে জন্মেছে, না কি প্রেম থেকে? শুধু এই প্রশ্নটাই যথেষ্ট। বাস্তবে কারো প্রত্যাশা, আশা বা ইচ্ছা ভঙ্গ হওয়াই কি সব সময় কারো অপরাধ? প্রত্যাশা তো অনেক কারণেই অপূর্ণ হতে পারে। বিনা পরিস্থিতি বিচার করে কাউকে অপরাধী মেনে নেয়া ন্যায় নয় প্রতিশোধ। ন্যায়ের আধার তো দয়া-ভালোবাসা-ধৈর্য আর প্রতিশোধের আধার ক্রোধ-অহংকার-হিংসা। এর কোনোটাই তো সুখ আর ভালো সম্পর্ক এনে দিতে পারে না।

এসবই সব মানুষই জানে। সেতু আর ইমরান ওরাও জানে। তাহলে কেন তারা মানতে পারছে না। কেন হৃদয় প্রতিশোধের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে? মনের অজান্তেই কেন এমন আচরণ করছেন? এর বড় কারণ হচ্ছে মানুষ নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। তাই সে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। সে প্রথমে তার কাছের মানুষ তারপর পরিবার, সমাজ, দেশ আরও ক্ষমতা পেলে সারা পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এটা একটা লোভ। এ লোভটা থাকে মনের গোপন কোণে। মানুষ সেটি বুঝতেই পারে না। মানুষ সেই লোভটারই গোলাম। কিন্তু লোভ কী শান্তি নিয়ে আসতে পারে? নিজেই বিবেচনা করুন।

তাহলে এর সমাধান কী? এর সমাধান কী করা সম্ভব? এর সঠিক উত্তর আপনি আগে থেকেই জানেন। শুধু সঠিক সময়ে আপনি ভুলে যান। আপনার মন আপনার দখল এমনভাবে নিয়েছে যে, প্রয়োজনের সময় আপনি জ্ঞান শূন্য হয়ে যান। বিনা বিচারে আপনি শুধু পুতুলের মতো অভিনয় করে যাচ্ছেন।

আপনার ব্রেনের অনেক ক্ষমতা সে আপনার অনুমতি ছাড়াই আপনার শরীরের মধ্যে অনেক কিছু করতে পারেও, তেমনি তার ইচ্ছা মতো আপনাকে পরিচালনাও করতে পারে। বাস্তব সত্য হল সে প্রতিদিনই তাই করছে। আপনি কি আপনার ইচ্ছা মতো চলছেন? না কি অন্য কারও ইচ্ছায়? এক মানুষ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। শুধু একটি পার্থক্য আছে। তা হল ব্রেনকে ডিরেকশন দেয়াতে। মানে চিন্তায়। ওই যে সারাদিন আপনি আপনার সঙ্গে কথা বলে চলেছেন। ওই খানে।

আপনাকে যেটা করতে হবে তা হল ওই চিন্তাকে এবং ব্রেনকে ডিরেকশন দেয়ার ক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সেটি পারলেই সব সংকট আপনা আপনিই সমাধান হয়ে যাবে। আর এটা যে না পড়ে সে নিজেই তো একটা সংকট। সে অশান্তি ছাড়া আর কি ছড়াতে পারবে? একটা কথা কি ভেবেছেন কখনও, যে বেশির ভাগ সিদ্ধান্ত আমরা সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য নেই না; নেই মনকে শান্ত করার জন্য।

যদি মনকে আপনার দখলে নিতে চান। ভালো সম্পর্ক চান। ক্যারিয়ারে সাফল্য চান এবং সুখ-শান্তি চান। তাহলে নিজেকে সময় দিন। নিজের চিন্তাগুলোকে আগে পর্যবেক্ষণ করুন। প্রতিদিন সকাল আর রাতে দশ মিনিটের জন্য একা একা বসুন, বড় করে কয়েকবার দম নিন এবং চোখ বন্ধ করে গভীরভাবে খেয়াল করুন। আপনি কি ভাবছেন। বিড়াল যেমন ইঁদুরের জন্য অপেক্ষা করে ঠিক সেই ভাবে। তবে আপনার কোনো ভাবনার পক্ষে বা বিপক্ষে আপনি যাবেন না। আপনি শুধু আপনার ভাবনাগুলোর দর্শক হবেন।

আর প্রতিদিন নিজের জ্ঞান আরও বাড়ানোর চেষ্টা করুন। নিজের সঙ্গে নিজের সুসম্পর্ক হলে অন্যের সঙ্গেও আপনার সুসম্পর্ক হবে। নিজের সঙ্গে সৎ ব্যবহার করুন, অন্যের সঙ্গেও সৎ ব্যবহার করতে পারবেন। একটা কথা মনে রাখবেন- ভালো কাজ বা ভালো ব্যবহার ভবিষ্যতের জন্য সুখ তৈরি করে না; ভালো ব্যবহার নিজেই একটা সুখ। কোনো কিছু পাওয়ার আইন হচ্ছে আগে দিতে হবে। আগে পাবেন পরে দিবেন এমন হয় না। নিয়মে নেই। তাই সবার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করুন, সম্মান করুন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×