সোনারগাঁয়ের লোক ও কারুশিল্প মেলা

  শওকত আলী রতন ২৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লোক ও কারুশিল্প মেলা
লোক ও কারুশিল্প মেলা। ফাইল ছবি

সোনারগাঁয়ের লোক ও কারুশিল্পের মেলায় গেলে চোখে পড়বে অতি মনযোগের সঙ্গে মেলার স্টলে বসেই শিল্পীরা কেউ কাঠের তৈরি জিনিসের ওপর নকশা করছে, কেউ মাটির তৈরি শিল্পের ওপর রং ও নকশা করছে আবার কেউ কেউ হাতপাখায় নকশা উঠাচ্ছে আবার কেউবা শীতল পাটি বুনাচ্ছে। এ চিত্র যেন আমাদের ঐতিহ্যবাহী গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেসামগ্রীর অংশবিশেষ।

নিকট অতীতে এসব পেশার সঙ্গে জড়িতরা এ পেশার মাধ্যমেই জীবন-জীবিকা নির্বাহ করত। বর্তমানে দেশের কোনো অঞ্চলেই শিল্পের কারুকার্য ও নকশার কাজে শিল্পীদের ব্যস্ততা চোখে না পড়লেও এ শিল্পকে যুগ যুগ টিকিয়ে রাখতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তবুও যেন প্রযুক্তির কারণে বারবার হার মানছে গ্রামবাংলার এতিহ্যবাহী নানা জিনিসপত্রের তৈরির সঙ্গে জড়িত শিল্পীরা।

তবু বাপ-দাদার এ পেশাকে ধরে রাখতে দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে তারা। আর ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প যাতে একেবারে হারিয়ে না যায় সে লক্ষেই প্রতিবছরের মতো এবারও নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁয়ের শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী এলাকায় বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন চত্বরে ১৫ জানুয়ারি থেকে মাসব্যাপী শুরু হয়েছে লোককারু শিল্প মেলা ও লোকজ উৎসব। সোনারগাঁয়ের লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের চত্বরে সোনারতরী মঞ্চে প্রধান অতিথি হিসেবে মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ। গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকজ ও সংস্কৃতির ব্যবহার্য জিনিসপত্রের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয় করানোর জন্য ফাউন্ডেশনের এ মেলার আয়োজন। আমাদের দেশের প্রাচীন গ্রামীণ মেলাগুলোর মধ্যে সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্প মেলা অন্যতম।

এ বছর মেলায় বাংলাদেশের পল্লী অঞ্চল থেকে ৬০ কারুশিল্পী অংশ নিয়েছেন। প্রতিবছরই কারুশিল্পীরা মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। এসব শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেবল বিক্রির উদ্দেশ্যেই নয়, মাটির ভালোবাসা ও বাপ-দাদার পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্যই সারা বছরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে এসব পণ্যের সঙ্গে মানুষের পরিচয় করিয়ে দেয়াই মূল উদ্দেশ্য। শিল্পীরা আরও বলেন, প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে বিদেশি সব পণ্য। কিন্তু আমাদের শিল্পকে যদি আমরা নিজেরাই টিকিয়ে রাখার উদ্যোগ না নেই তা হলে এক সময় হারিয়ে যাবে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির সব পণ্যসামগ্রী।

এ বছর মেলায় ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান পণ্যের পসরা সাজিয়েছে ঝিনাইদহ ও মাগুরার শোলাশিল্প, রাজশাহীর শখের হাঁড়ি, ঢাকার মৃৎশিল্প, কিশোরগঞ্জের টেপাপুতুল, রাজশাহীর কাগজের শিল্প, ঠাকুরগাঁয়ের বাঁশ ও বেতশিল্প, রাজশাহীর মুখোশ, সোনারগাঁয়ের নকশি হাতপাখা, চট্টগ্রামের পাখা, রংপুরের শতরঞ্জি, সোনারগাঁয়ের হাতি ঘোড়া পুতুল ও কাঠের কারুশিল্প, নকশিকাঁথা, হাতপাখা, মুন্সীগঞ্জের শীতল পাটি, মানিকগঞ্জের তামা-কাঁসা ও পিতলের কারুশিল্প, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান জেলার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কারুপণ্য, কিশোরগঞ্জের টেরাকোটা শিল্প, সোনারগাঁয়ের জামদানি, পাটের কারুশিল্প ও নকশি পাখা, নাটোরের শোলার মুখোশ শিল্প, মুন্সীগঞ্জের পট চিত্র, ঢাকার কাগজের হস্তশিল্প ইত্যাদি এ মেলায় স্থান পেয়েছে। বাংলার আবহমানকাল থেকে এসব শিল্পের সঙ্গে মিশে আছে হাজারও পরিবার। শিল্পের সঙ্গেই মিছে আছে একেকটি পরিবারের সুখ-দুঃখ হাসি কান্না। প্রত্যেক শিল্পী যেন একেকটি শিল্পের প্রতিচ্ছবি। এসব শিল্পীর কল্যাণে এখনও হারিয়ে যাওয়া দুর্লভ পণ্য মেলার দর্শনার্থীরা সংগ্রহ করার সুযোগ পাচ্ছে।

ঝিনাইদহের শোলার শিল্প নিয়ে মেলায় এসেছেন গোপেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী। তিনি জানান, দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের উদ্যোগে আয়োজিত মেলায় অংশ নিচ্ছি। প্লাস্টিক ও অন্যান্য শিল্পের কাছে হার মেনেছে আমাদের দেশীয় শিল্পীরা। বাঙালি জাতিসত্তাকে উপলব্ধি করার মতো এখনও প্রয়াস জোগায় আমাদের গ্রামীণ এসব শিল্পীরা। কিন্তু এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষজন যদি স্বাবলম্বী না হতে পারে তাহলে এক সময় বন্ধ হয়ে যাবে পরিবেশবান্ধব শিল্প। তিনি দাবি করেন, সরকারি উদ্যোগে রাজধানীর ঢাকায় আমাদের একটি জায়গা নির্ধারণ করে সারা বছর বসার ব্যবস্থা করলে ভালো হতো, যেখানে বিদেশি পর্যটকদের পণ্য কেনার সুযোগ তৈরি করতে পারলে আমরা লাভবান হব। এতে করে শিল্পীরা বাঁচবে অন্যদিকে দেশও লাভবান হবে । মেলায় অংশগ্রহণ করছি রাজশাহীর শখের হাঁড়ির কর্ণধার শ্রী সুশান্ত কুমার পাল জানান, বাঙালির প্রাণ ছিল মাটির তৈরির তৈজসপত্র। নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার হতো এসব পণ্য কিন্তু নানা আগ্রাসনের কারণে আজ দেশীয় সব শিল্প হারিয়ে গেছে। মেলায় আগত দর্শনার্থীদের জন্য লোক ও কারুশিল্প মেলায় লোকজ উৎসবে লোকজ নাটক, লোক কাহিনীর যাত্রাপালা, বাউলগান, পালাগান, কবিগান, ভাওয়াইয়া ও ভাটিয়ালি গান, জারি-সারি ও হাছন রাজার গান, লালন সঙ্গীত, মাইজভাণ্ডারী গান, মুর্শিদী গান, আলকাপ গান, গায়ে হলুদের গান, বান্দরবান, বিরিশিরি আর অন্যান্য শিল্পগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পুঁথি পাঠ, গ্রামীণ খেলা, লাঠি খেলা, দোক খেলা, ঘুড়ি ওড়ানো, লোকজ জীবন প্রদর্শনী, লোকজ গল্প বলা, পিঠা প্রদর্শনীর আয়োজন বসে প্রতিদিন বিকালে ।

রাজশাহী থেকে বায়োস্কোপ নিয়ে মেলায় এসেছেন আবদুল জলিল। হেলেদুলে গানের মাধ্যমে মানুষকে বায়োস্কোপ দেখতে উদ্বুদ্ধ করেন তিনি। তিনি দুই যুগ আগে এ পেশায় জীবন-জীবিকার কাজ শুরু করলেও প্রযুক্তির বিপ্লব ঘটায় এখন আর কেউ বায়োস্কোপ দেখতে চায় না। তার পরও প্রতিবছর মেলায় আসতে হয় কেবল মানুষের ভালোবাসার টানে।

বাংলা সংস্কৃতির ঐতিহ্যকে ধরে রেখে আজও বায়োস্কোপ নিয়ে ঘুরে বেড়ান রাজশাহীর আবদুল জলিল। মেলা চলবে আগামী ১৪ ফেরুয়ারি পর্যন্ত। বাংলাদেশের লোক ও কারুশিল্পের ঐতিহ্য, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিলুপ্তপ্রায় লোকজ ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার, সংগ্রহ, সংরক্ষণ, গবেষণা, প্রদর্শন এবং পুনরুজ্জীবন এ মেলার মূল উদ্দেশ্য। আপনি ঘুরে আসতে পারেন ঐতিহ্যবাহী লোক ও কারুশিল্প মেলা থেকে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×