চিরদিনই তুমি যে আমার..

  হাবীবাহ্ নাসরীন ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দেবদাস পার্বতী।
দেবদাস পার্বতী। ছবি সংগৃহীত

ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। ভালোবেসেই ইতিহাসে শত শত বছর ধরে অবিস্মরণীয় হয়ে আছে কিছু নাম। লায়লী-মজনু, রোমিও-জুলিয়েট, দেবদাস-পার্বতী- শিরি-ফরহাদ, শশী-পুন্নু, এ নামগুলো ভালোবাসার অমর কাহিনীর নায়ক-নায়িকা হিসেবে যুগ যুগ ধরে বেঁচে আছে।

উদাহরণ। তারা উদাহরণ তৈরি করে গিয়েছেন বলেই ভালোবাসার শক্তি আরও প্রাণ পেয়েছে। ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে প্রেমের বিখ্যাত তিনটি উপাখ্যান কে-ক্র্যাফটের শাহনাজ খানের ডিজাইনে পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করার প্রয়াস নিয়ে ঘরেবাইরের আজকের আয়োজন

১. লাইলী মজনু

লাইলী-মজনু প্রেমকাহিনী বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এ কাহিনীর মূল উৎস আরবি লোকগাঁথা। কাহিনীটিকে ঐতিহাসিক দিক থেকে সত্য বিবেচনা করা হয়। কায়েস ইবনে আল মুলাওয়াহ্ ইবনে মুজাহিম। সপ্তম শতাব্দীতে আরব দেশের বনি আমির উপজাতীয় বংশোদ্ভূত এক বেদুইন কবি ছিলেন তিনি।

লায়লা বিনতে মাহদী ইবনে সাদ। তিনিও একই উপজাতীয় বংশোদ্ভূত ছিলেন। দু’জনের শৈশব কাটে একসঙ্গে। একই বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন তারা। একদিন লায়লার প্রেমে পড়ে যান কায়েস। তাকে নিয়ে কবিতা লিখতে থাকেন। সামাজিক অসম্মানের ভয়ে তারা লায়লাকে কায়েসের কাছ থেকে দূরে রাখতে চায়। তাদের দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কায়েসের কবিতা রচনা তো বন্ধ হয় না। পথিকরা কায়েসের লেখা গান গাইতে গাইতে লায়লার বাড়ির পাশ দিয়ে চলতো।

এসব শুনে লায়লা দিন দিন কায়েসের প্রেমে দিশেহারা হয়ে যায়। সে ছোট ছোট কাগজে এসব কবিতার উত্তর লিখে হাওয়ায় ভাসিয়ে দিত। একদিন এ রকম একটি ছোট্ট কবিতা গ্রামের একজনের হাতে পড়ে। সে এ কবিতার অর্থ বুঝতে পেরে কায়েসকে পৌঁছে দেয় সেটি। উত্তরে কায়েস আরও কয়েকটি কবিতা রচনা করে শুনিয়ে দেন এ বার্তাবাহককে। এভাবে চলতে থাকে তাদের ভাবের আদান-প্রদান।

সবার চাপে একসময় লায়লার বিয়ে হয়ে যায়। কায়েস এ কথা জানতে পেরে মনের দুঃখে মরুভূমিতে ঠিকানাবিহীনভাবে ঘুরে বেড়াতে থাকে। লায়লার প্রেমে পাগল হয়ে যাওয়ায় পরবর্তী সময়ে তার নাম হয়েছিল ‘মাজনুন-লায়লা’ অর্থাৎ ‘লায়লার পাগল’। যে বৃদ্ধ লোকটি লায়লা আর কায়েসের মধ্যে কবিতা বিনিময়ের কাজ করতেন, তিনি একসময় তাদের দেখা করার ব্যবস্থাও করে দেন। তবে শর্ত থাকে, দশ কদম দূরে থেকে কথা বলতে হবে।

স্বামীর মৃত্যুর পর কায়েসের প্রতি নিজের ভালোবাসার কথা আর গোপন রাখেনি লায়লা। কিন্তু এর কিছুদিন পর তিনি মারা যান। লায়লার প্রতি অপরিসীম ভালোবাসা বুকে নিয়ে তার কবর আঁকড়ে ধরে এর কিছুদিন পর মারা যান কায়েসও। মারা যাওয়ার আগে লায়লাকে উদ্দেশ্য করে পাথরখণ্ডের ওপর লেখা তার তিনটি পঙ্ক্তি পরবর্তী সময়ে খুঁজে পাওয়া যায়। প্রায় পাঁচ শ’ বছর পরও ভালোবাসার উদাহরণ হিসেবে ‘লাইলী-মজনু’রূপী লায়লা-কায়েসকেই বেছে নেয় মানুষ।

২. রোমিও জুলিয়েট

উইলিয়াম শেকসপিয়ারের লেখা নাটক রোমিও অ্যান্ড জুলিয়েটের দুটি প্রধান চরিত্র হল রোমিও ও জুলিয়েট। রোমিও ও জুলিয়েটের পরিবার বাস করতেন ইতালির প্রাচীন ভেরোনা নগরীতে। দুই বনেদি পরিবার। মন্টেগি পরিবারের একমাত্র সন্তান রোমিও। ক্যাপুলেট পরিবারের মেয়ে জুলিয়েট। দুর্ভাগ্যবশত দুই পরিবারের কর্তাদের মধ্যকার বিরোধ একসময় তাদের সব সদস্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এ দিকে প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে যায় রোমিও-জুলিয়েট। একসময় তারা গোপনে বিয়েও করে। পরে জানাজানি হয়ে গেলে জুলিয়েটের চাচাতো ভাই টাইবাল্টের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে সম্মুখযুদ্ধের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় রোমিও’র। অপরদিকে জুলিয়েটের বিমর্ষ অবস্থা দেখে তার বাবা তাকে তড়িঘড়ি করে কাউন্ট প্যারিস নামে একজনের সঙ্গে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

জুলিয়েট পাদ্রীর সাহায্য চায়। পাদ্রী তাকে এক ধরনের বিষ পান করার পরামর্শ দেন, যে বিষ পান করলে মৃত্যু হবে না, কিন্তু সবাই মৃত মনে করবে। নির্দিষ্ট সময় পর বিষের ক্রিয়া কেটে গেলে পানকারী আবার সুস্থ হয়ে উঠবে। জুলিয়েট বিষ পান করে অচেতন অবস্থায় চলে যায়। তাকে মৃত মনে করে তাদের পারিবারিক গোরস্থানে রেখে দেয়া হবে। জুলিয়েট মারা যায়নি, ওষুধ খেয়ে মৃত্যুর ভান করছে- এ কথা জানিয়ে পাদ্রী একটি চিঠি লেখেন রোমিও’র কাছে। কিন্তু সেটি তার হাতে পৌঁছায় না।

বরং নিজের চাকর বালথ্যাসারের কাছ থেকে জুলিয়েটের মৃত্যু সংবাদই পেল রোমিও। তারপর বিষ সংগ্রহ করে নিজেও জীবনের পাট চুকিয়ে ফেলার জন্যে জুলিয়েটের কবরের কাছে গিয়ে বিষপানে আত্মহত্যা করে। ততক্ষণে জুলিয়েটের বিষের ক্রিয়া শেষ হয়ে গেছে। জেগে উঠে সে দেখতে পায় রোমিও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে। এরপর রোমিওর ছুরি নিয়ে নিজেই নিজেকে শেষ করে দেয় জুলিয়েট। এভাবে মৃত্যুর মাধ্যমেই অমর হয়ে রইল দু’জনের প্রেমকাহিনী।

৩. দেবদাস পার্বতী

মাত্র ১৭ বছর বয়সে ‘দেবদাস’ উপন্যাসটি লিখেছিলেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। উপন্যাসে দেবদাস ব্রাহ্মণ জমিদার বংশের সন্তান, পার্বতী এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই দেবদাস ও পার্বতীর বন্ধুত্ব ছিল যা পরবর্তী সময়ে প্রেমে রূপ নেয়। দেবদাসকে কলকাতা শহরে পাঠান হয় পড়াশোনা করার জন্য। বেশ কয়েক বছর পর ছুটি কাটাতে গ্রামে আসে সে।

সদ্য যৌবনে পা রাখা দেবদাস ও পার্বতী একে অপরের প্রতি এক ব্যতিক্রম টান অনুভব করে। এই টান ছেলেবেলার বন্ধুত্বের মতো নয়, আরও গভীর অজানা এক টান। ওরা বুঝতে পারে, এরই নাম প্রেম। ভালোবাসাকে সারাজীবন নিজের করে রাখতে পার্বতী চায় দেবদাসের বউ হতে। প্রচলিত সামাজিক রীতি অনুযায়ী পার্বতীর মা দেবদাসের মা হরিমতির কাছে বিয়ের প্রস্তাব আনলে তিনি এ সম্পর্ক রাখতে বিশেষ উৎসাহী হোন না। পার্বতীর পরিবারে দীর্ঘকাল থেকে বরের পরিবার থেকে ‘পণ’ গ্রহণের প্রথা চলে আসছে। দেবদাসের মা তাই পার্বতীর পরিবারকে ‘বেচা-কেনা ছোটঘর’ মনে করে এ সম্পর্কে অসম্মত হোন।

এতে পার্বতীর বাবা অপমাণিত বোধ করে পার্বতীর জন্য আরও ধনী পরিবারে বিয়ে ঠিক করেন। পার্বতী এ কথা জানলে দেবদাস অন্তত তাকে গ্রহণ করবে এ আশায় রাতের অন্ধকারে তার সঙ্গে দেখা করে। দেবদাস তার বাবাকে মনের কথা জানালে বাবা কিছুতেই রাজি হোন না। বিভ্রান্ত দেবদাস বাড়ি থেকে কলকাতায় পালিয়ে যায়। সে চিঠি লিখে পার্বতীকে জানায়, সে এ সম্পর্ক আর রাখতে চায় না। পার্বতী বিয়ের জন্য প্রস্তুত হয়। এরপর দেবদাস বললেও আর সে ফিরে যেতে চায় না ও কাপুরুষতার জন্য তাকে ধিক্কার জানায়। তবুও সে দেবদাসকে বলে, তার মৃত্যুর আগে যেন সে দেবদাসকে অন্তত একবার দেখতে পায়। দেবদাস কলকাতায় ফিরে যায় ও পার্বতীর ভুবন চৌধুরী নামে এক জমিদারের সঙ্গে বিয়ে হয়।

ঘটনাক্রমে দেবদাসের সঙ্গে পরিচয় হয় চন্দ্রমুখী নামে এক বাইজির। সে দেবদাসের প্রেমে পড়ে যদিও দেবদাস তাকে ঘৃণা করতে থাকে। দুঃখ ভুলতে দেবদাস ক্রমেই মদ্যপানের মাত্রা বাড়াতে থাকে ও তাতে তার স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে। আসন্ন মৃত্যুর কথা অনুভব করতে পেরে দেবদাস, পার্বতীকে দেয়া তার পূর্বের প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করতে পার্বতীর কাছে রওনা হয়। পার্বতীর বাড়ির সামনে পৌঁছে, এক অন্ধকার শীতের রাতে দেবদাসের মৃত্যু হয়। দেবদাসের মৃত্যুর খবর শুনে পার্বতী ছুটে যায়, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই, বাড়ির লোকজন তাকে বাড়ির চৌকাঠ অতিক্রম করতে দেয় না। বুকভরা ভালোবাসা নিয়েও দুটি হৃদয় থেকে যায় অলঙ্ঘনীয় দূরত্বে।

দেবদাস নিছকই এক উপন্যাস হলেও এটি ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিককার সমাজব্যবস্থার নিষ্ঠুরতার দিকটিও তুলে ধরেছে। যে সমাজব্যবস্থা এক সত্যিকারের প্রেমের শুভ পরিণতির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবু বিচ্ছেদেই বেঁচে থাকে অমর এক প্রেমকাহিনী।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×