নীলাদ্রির বুকে

  মবরুর আহমদ সাজু ১২ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অনেকেই সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে যান। কিন্তু এর আশপাশেই অনেক সুন্দর সুন্দর নয়নাভিরাম জায়গা আছে যা যে কোনো পর্যটকের মনকে মুহূর্তেই দোলা দিয়ে যেতে পারে! মরমি কবি হাছন রাজা, বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম, স্মৃতিবিজড়িত সুনামগঞ্জ তো প্রকৃতিপ্রেমীদের হাতছানি দিয়ে ডাকবেই। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে খাসিয়া জৈন্তা পাহাড়ের কোল ঘেঁষে সুনামগঞ্জ জেলার অবস্থান। এ জেলার উত্তরে রয়েছে ভারতের মেঘালয়, দক্ষিণে হবিগঞ্জ জেলা, পূর্বে সিলেট জেলা এবং পশ্চিমে নেত্রকোনা জেলা। সুনামগঞ্জের ইতিহাস অতি প্রাচীন আর এ ইতিহাস ঐতিহ্য দেখতে হাওরপারে দেশের মানুষ আসে বারবার। হাওরবিষ্টিত সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও দোয়ারাবাজার উপজেলার ভারতের খাসিয়া, মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত পর্যটন সমৃদ্ধ স্থানগুলোয় পর্যটক ও স্থানীয় জনসাধারণে পদচারণায় প্রতিবারই মুখরিত হয়। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওর, সীমান্ত লেক ও বারেকটিলা। সারা বছরেই এ পর্যটন স্পটগুলো ভ্রমণপিপাসুদের সঙ্গে স্থানীয় জনসাধরণের পদচারণায় মুখরিত থাকে। এখানে অসংখ্য কিংবদন্তি এবং ঐতিহাসিক ঘটনাবলী ও তথ্যাবলিতে সমৃদ্ধ। প্রাচীন ইতিহাস থেকে অনুমান করা হয়, সুনামগঞ্জ জেলার সমগ্র অঞ্চল এক কালে আসামের কামরূপ বা প্রাগজ্যোতিষপুর রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। জেলা তথ্যসূত্রে জানা যায় ‘সুনামদি’ নামক জনৈক মোগল সিপাহীর নামানুসারে সুনামগঞ্জের নামকরণ করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ‘সুনামদি’ (সুনাম উদ্দিনের আঞ্চলিক রূপ) নামক ওই মোগল সৈন্যের কোনো এক যুদ্ধে বীরোচিত কৃতিত্বের জন্য সম্রাট কর্তৃক সুনামদিকে এখানে কিছু ভূমি পুরস্কার হিসেবে দান করা হয়। তার দানস্বরূপ প্রাপ্ত ভূমিতে তারই নামে সুনামগঞ্জ বাজারটি স্থাপিত হয়েছিল। এভাবে সুনামগঞ্জ নামের ও স্থানের উৎপত্তি হয়েছিল বলে মনে করা হয়ে থাকে।

অসংখ্য হাওর-বাঁওড়, নদীনালা, খালবিলে পরিবেষ্টিত জনপদ সুনামগঞ্জ। এ জনপদে ঐতিহ্য সংস্কৃতি বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসের সরব উপাদান। আউল-বাউলের চারণভূমি সুনামগঞ্জ তার ঐতিহ্যের ধারা থেকে আজও বিচ্যুত হয়নি। লোকসাহিত্যে মহাভারতের অনুবাদক মহাকবি সঞ্চয় (পঞ্চদশ শতক), কুবের আচার্য্য, ঈশান নাগর (বৈষ্ণব কবি) দিব্য সিংহ (লাউর রাজ্যের স্বাধীন রাজা) থেকে শুরু করে সৈয়দ শাহনূর, সৈয়দ হোসেন আলম, রাধারমণ, হাছনরাজা, দুরবিন শাহ, কালাশাহ, ছাবাল শাহ, এলাহী বক্স মুন্সী, শাহ আছদ আলী, পীর মজির উদ্দিন, আফজল শাহ, শাহ আবদুল করিম এ মাটির সন্তান। পর্যটক, সৌন্দর্য পিপাসুসহ সবার উপস্থিতিতে। এখানে বিভিন্ন উৎসব ছাড়াও ছুটির দিনে আসেন সহস্রাধিক পর্যটক আসেন প্রকৃতির সান্নিধ্যটুকু লাভ করার জন্য। কেউ মোটরসাইকেলে, কেউ সিএনজি, কেউ স্পিডবোটে আবার কেউ ইঞ্জিনচালিত নৌকায় দলবেঁধে ছুটছে। তাহিরপুর উপজেলায় রয়েছে- মাদার ফিশারিজখ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের বুকে এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম, সীমান্তঘেঁষা ৩০০ ফুট উচ্চতার বারেকটিলা, উপজাতিদের মন্দির, মেঘালয় পাহাড়ের জলপ্রপাত, শাহ আরফিন (রা.) আস্তানা, সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান, উঁচু নিচু পাহাড়ের সারি, ঘন সবুজের সমারোহ, ট্যাকেরঘাট চুনাপাথর খনিজ প্রকল্প, সীমান্ত লেক, ৩টি শুল্ক স্টেশন (চারাগাঁও, বড়ছড়া, বাগলী), মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, ছোট বড় ২০টি ভারতের মেঘালয়ের বুক চিড়ে নেমে আসা পাহাড়ি ছড়া, রাজা উইক্লিবসের বাড়ি, আওলী জমিদার বাড়ি, পাহাড়ি জাদুকাটা নদী, ঝরনা, মেঘ, বৃষ্টি, উপজাতি ও বাংলাদেশিদের একত্রে বসবাসের এক মিলনমেলা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মনোরম পরিবেশ বিরাজ করছে সীমান্তবর্তী তাহিরপুর উপজেলায়। দোয়ারাবাজার উপজেলায় রয়েছে বাঁশতলা, হকনগর শহীদ স্মৃতিসৌধ, জুমগাঁও আদিবাসীসহ বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানগুলো যা পর্যটকদের নয়নাভিরাম, নৈসর্গিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ করায় বারবার আসছেন দেশি-বিদেশি হাজার হাজার দর্শনার্থী। অনেকেই ওইসব স্থানে গিয়ে তুলছেন সেলফি আর অনেকেই একান্তে বসে আছেন আবার অনেকেই বসিয়েছেন মনখুশি আড্ডা। সবার আকর্ষণ টাঙ্গুয়ার হাওর। এ হাওরের একটি প্রবাদ আছে- নয় কুড়ি বিল, ছয় কুড়ি কান্দার টাঙ্গুয়ার হাওর। জেলা তথ্যসূত্রে জানা যায় নানা প্রজাতির বনজ ও জলজ প্রাণী এ হাওরের সৌন্দর্যকে আরও দর্শনীয় করেছে।

ফুল বাগান প্রাণের স্পন্দন

সারা বছর দর্শনার্থীদের ভিড় থাকলেও বেশি ভিড় হয় বসন্তকালে। যখন গাছে গাছে শোভা পায় রক্তলাল শিমুল ফুল। ১০০ বিঘার বেশি জায়গাজুড়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে জাদুকাটা নদীর তীরে রয়েছে শিমুল ফুলের বাগান। ওপারে ভারতের মেঘালয় পাহাড়, মাঝে জাদুকাটা নদী আর এপারে শিমুল বন। সব মিলে সেখানে গড়ে উঠেছে প্রকৃতির এক অনবদ্য রূপ। জায়গাটা সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার লাউয়ের গড়। ১৪ বছর আগে ২ হাজার ৪০০ শতক জমিতে শখের বসে এ শিমুল বাগান গড়ে তোলেন জয়নাল আবেদীন নামে স্থানীয় একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। বসন্ত এলে যখন একসঙ্গে দু’হাজার গাছ ফুলে ফুলে ভরে ওঠে তখন পর্যটকদের মন নেচে ওঠে। শিমুল বনের রক্তরাঙা সৌন্দর্য দেখতে হলে ফাল্গ–ন মাস সেখানে যাওয়ার উপযুক্ত সময়।

কীভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে শ্যামলী-মামুন-এনা বাস যায় সুনামগঞ্জ। ভাড়া ৫০০-৫৫০ টাকা। সুনামগঞ্জ নেমে নতুন ব্রিজের পাড়ে মোটরবাইক দাঁড়িয়ে থাকে। কথা বলে বারেকটিলা নদীরপাড় পর্যন্ত ভাড়া নেবে ২০০ টাকা। একটাতে দু’জন চড়া যায়। জাদুকাটা নদীর সামনে নামিয়ে দেবে। ৫ টাকা দিয়ে খেয়া অতিক্রম করে ওই পারে গেলেই বারেকটিলা, ওখান থেকে জাদুকাটা নদী দেখা যায়। বারেক টিলা থেকে নেমে চায়ের দোকান আছে কিছু। তাদের জিজ্ঞেস করলেই ছবির মতো সুন্দর এই শিমুল ফুলের বাগানে যাওয়ার পথ দেখিয়ে দেবে। জাদুকাটা নদীর পারের এ বাগান এখন পর্যটকদের বাড়তি বিনোদন দিচ্ছে। মাঘের শুরু থেকেই ওই বাগানের শিমুল গাছগুলো রক্তিম আভা ছড়াচ্ছে। সারিবদ্ধভাবে লাগানো শিমুল গাছগুলো ফুলের পসরা সাজিয়েছে। যা কিনা মনোমুগ্ধকর! পাপড়ি মেলে থাকা শিমুলের রক্তিম আভা আর সুবাস মন রাঙিয়ে ঘুম ভাঙায় সৌখিন হৃদয়ে। এ যেন কল্পনার রঙ্গে সাজানো এক শিমুলের প্রান্তর। সেই সৌন্দর্য উপভোগ করতে এ সময় দলবেঁধে হাজার হাজার পর্যটক ও দর্শনার্থীরা ছুটে আসছেন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার মানিগাঁও গ্রাম সংলগ্ন এই শিমুল বাগানটি অবসর কাটানোর আদর্শ জায়গা যেন। এক পাশে শিমুল বাগান। ওপারে ভারতের মেঘালয় পাহাড়। মাঝে চোখ জুড়ানো মায়াবি জাদুকাটা নদী। সব মিলেমিশে মানিগাঁও গ্রামটি অপরূপ এক কাব্যিক ভাবনার প্রান্তর। যদিও বাণিজ্যিক চিন্তা থেকেই জাদুকাটা নদীর পাড়ে তৈরি করা শিমুল বাগান। বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে এ শিমুল বাগানে সারি সারি গাছের সবুজ পাতার সুনিবিড় ছায়ায় পর্যটকদের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। আর বসন্তের ডালে ডালে ফুটে থাকা রক্তমাখা লাল ফুলে আন্দোলিত করে পর্যটকদের মন। বর্ষা, বসন্ত কিংবা হেমন্ত। একের ঋতুতে এর এক এক রূপ

নীল রঙে রূপায়িত ‘নীলাদ্রি’

স্বর্গীয় সৌন্দর্যে ভরা জায়গাটা কাশ্মীর নয় আমাদের দেশেই! কি অবাক হচ্ছেন? স্বপ্নের সাম্পানের মতো এ যেন নীলের রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার গল্প। হ্যাঁ নীলাদ্রির কথা বলছি, ভাবছেন এটা আবার কী? ছবি দেখে কাশ্মীর ভেবে ভুল করবেন না, একে নীলাদ্রি নামেই চেনে সবাই। এর অবস্থান টেকেরঘাট, সুনামগঞ্জে। এর অপরূপ সৌন্দর্যে ডুব দিতে নিশ্চিন্ত মনে ঘুরে আসুন সুনামগঞ্জ থেকে। অনেকেই সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর দেখতে যান। কিন্তু এর আশপাশেই অনেক সুন্দর সুন্দর নয়নাভিরাম জায়গা আছে যা যে কোনো পর্যটকের মনকে মুহূর্তেই দোলা দিয়ে যেতে পারে! এমনই একটি জায়গা টেকেরঘাট চুনাপাথরের পরিত্যক্ত খনির লাইমস্টোন লেক। স্থানীয় লোকজন একে নীলাদ্রি লেক বলেই জানে। এর নামটা যেমন সুন্দর এর রূপটাও তেমনই মোহনীয়। নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতে পারবেন না পানির রং এতটা নীল আর প্রকৃতির এক মায়াবি রূপ হয় কী করে। মাঝের টিলাগুলো আর ওপারের পাহাড়ের নিচের অংশটুকু বাংলাদেশের শেষ সীমানা। বড় উঁচু পাহাড়টিতেই সীমানা কাঁটাতারের বেড়া দেয়া আছে। এ লেকটি এক সময় চুনাপাথরের কারখানার কাঁচামাল চুনাপাথরের সাপাই ভাণ্ডার ছিল যা এখন বিলীন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×