আলমডাঙ্গার লালব্রিজ বধ্যভূমি

  আবু আফজাল সালেহ ১৯ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গায় রয়েছে একটি বধ্যভূমি। যা ১৯৭১ সালের গণহত্যার একটি নিদর্শন। আলমডাঙ্গার কুমার নদের ওপর অবস্থিত লালব্রিজের দু’পাশে ছিল পাকিস্তানি মিলিশিয়া বাহিনীর ক্যাম্প। রেললাইনের খুলনাগামী ডাউনে অর্থাৎ লালব্রিজের আলমডাঙ্গার পাশে ১টা ও নদের অপর পাড়ে কুষ্টিয়ার দিকে কালিদাসপুরে আরেকটা মিলিশিয়া ক্যাম্প ছিল। আপের দিকে আসা ট্রেন লালব্রিজের আলমডাঙ্গা মাথায় দাঁড় করাত। অন্যদিকে, যাওয়া ট্রেন লালব্রিজের কালিদাসপুর প্রান্তে দাঁড় করিয়ে নিরাপরাধ যাত্রীদের ধরে ধরে নিয়ে যেত। অকথ্য নির্যাতন শেষে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ এ বধ্যভূমিতে পুঁতে রাখত। মুক্তিযুদ্ধকালীন পাক ঘাতকরা ট্রেন থামিয়ে স্বাধীনতাকামী প্রায় ২ হাজার নারী-পুরুষ হত্যা করে রেলব্রিজের পাশে ওয়াপদা ভবনের বাউন্ডারির মধ্যে ও পার্শ্ববর্তী দুটি বধ্যভূমিতে পুঁতে রাখে। এ গণহত্যার প্রধান হোতা ছিলেন মেজর রানা, মেজর আজম খান, ক্যাপ্টেন নকডি ও হাবিলদার এনায়েত।

লালব্রিজের কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও বাঙালি নর-নারীর ওপর পাশবিক নির্যাতনের সাক্ষী এটি। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের জুনের শেষ থেকে ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত নারকীয় নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় এবং এখানে পুঁতে রাখা হয়। সেই সময় এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের হলুদ খালাসি ঘর ছিল। এ কক্ষেই স্বাধীনতাকামী যুবক, নারী-পুরুষকে নির্যাতন শেষে হত্যা করা হতো। লাশ পুঁতে রাখা হতো বা ফেলে রাখত পাকপিশাচ ও তাদের দোসররা। ‘টর্চার সেল’ নামক সেই হলুদ কক্ষটি ঘিরে এখন বধ্যভূমির স্তম্ভ বা কমপ্লেক্স।

স্মৃতিস্তম্ভ

ইতিহাস থেকে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রথমে চুয়াডাঙ্গাকে অস্থায়ী রাজধানী হিসেবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সে হিসেবে ১০ এপ্রিল, ১৯৭১ সালে চুয়াডাঙ্গায় শপথ নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু এ খবর পাকিরা জেনে যাওয়ায় চুয়াডাঙ্গার ওপর নজরদারি বাড়িয়ে দেয় এবং অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন সিদ্ধান্ত নিয়ে বৈদ্যনাথতলার বর্তমানে মুজিবনগর ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান হয়। সেই সময় আলমডাঙ্গা স্টেশন বা প্রায়ই লালব্রিজের কাছে ট্রেন থেকে শত শত নারী-পুরুষ নামিয়ে নিয়ে নির্যাতন শেষে হত্যা করে এখানে পুঁতে রাখত পাকপিশাচরা। সে স্মৃতি স্মরণ রেখে বীরাঙ্গনের অন্যতম নেতা সোলাইমান ছেলুনের নেতৃত্বে এখানে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ ও কমপ্লেক্স করা হয়। প্রতি দিন হাজারও দর্শনার্থী আলমডাঙ্গা রেলস্টেশনের লালব্রিজের কাছের এ বধ্যভূমিতে আসেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানি ও রাজাকারদের নারকীয় তাণ্ডবের ধ্বংসলীলা দেখতে।

২০০৯ সালে নরপশু পাকবাহিনী বাঙালি জাতির ওপর জঘন্যতম এ নির্যাতনের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে আলমডাঙ্গা বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও বাস্তবায়ন কমিটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। ২০১২ সালে নির্মাণ করা হয় এ স্মৃতিস্তম্ভ।

নারী নির্যাতনের প্রতীকী চিহ্ন

নরপশুরা নারীদের ধর্ষণ করত নির্বিচারে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ বধ্যভূমির গর্তে পাওয়া গেছে শত শত মানুষের মাথার খুলি ও হাড়। অনেকে এ বধ্যভূমিতে এসে তাদের আত্মীয়স্বজনদের আজও খুঁজে ফেরে। কেউ গুমরে কেঁদে ওঠে আবার কেউ নীরবে চোখের পানি ফেলে ফিরে যায় আপন ঠিকানায়।

দেয়ালের সঙ্গে কিছু ভাস্কর্যের কাজ রয়েছে, আঙিনায় রয়েছে কিছু বিখ্যাত ও শহীদের ভাস্কর্য, মিউজিয়ামের ভেতরের কিছু কিছু ফিগার, ১৭৫৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাঙালির ধারাবাহিক মুক্তিসংগ্রামের সচিত্র ছবি ইত্যাদি কমপ্লেক্সে রয়েছে।

বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রতীকী চিহ্ন

ছোট্ট কমপ্লেক্স, আরও স্মৃতিচিহ্ন বাড়ানো যায়- চেষ্টা করছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ও বাসিন্দারা। এটির নকশা ও তদারকি করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার একঝাঁক তরুণ-তরুণী। নেতৃত্বে চারুকলা অনুষদের শিক্ষক এলাকার কৃতীসন্তান আবদুস সালাম।

যাতায়াত

ঢাকা বা যে কোনো প্রান্ত থেকে চুয়াডাঙ্গা/আলমডাঙ্গায় আসা যাবে। ট্রেনে এলে আলমডাঙ্গা স্টেশনে নেমে ১ কিমি দূরের এ বধ্যভূমি দেখা যাবে।

থাকা ও খাওয়া

চুয়াডাঙ্গা ও আলমডাঙ্গাতে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।

চুয়াডাঙ্গা থেকে আপনি ইচ্ছা করলে খুব সহজেই বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী মুজিবনগর ও যাওয়ার পথে যুদ্ধকালীন আট বীরযোদ্ধার হত্যাকাণ্ডের স্থান। আট কবর। মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ ও কমপ্লেক্স অনেক অজানাকে জানতে পারবেন অজান্তেই। তাই স্বাধীনতার মাসে হোক মুক্তিযুদ্ধকালীন এসব স্মারকস্থান।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×