প্রজন্মের চেতনায় স্বাধীনতা

‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে বাংলার আকাশে রক্তিম সূর্য আনলে যারা তোমাদের এই ঋণ কোনো দিন শোধ হবে না।’ প্রজন্মের চেতনায় যুগ যুগ প্রতিধ্বনিত হবে এ গানের মর্মকথা। ত্রিশ লাখ শহীদের বুকের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের এ স্বাধীনতা। আজকের শিশুদের গড়ে তুলতে হবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই আদর্শে অনুপ্রাণিত করে। আর এ দায়িত্বটুকু পালন করতে হবে প্রতিটি দেশপ্রেমিক অভিভাবককে। আজ ২৬ মার্চ। অগ্নিঝরা মার্চ, বাঙালি জাতির ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় অধ্যায়। যে স্বাধীনতার শক্তিতে পৃথিবীর বুকে জেগে উঠেছিল বাংলাদেশের মানচিত্র। ২৬ মার্চ মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রেখে দেশকে মুক্ত রাখার প্রত্যয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। আজও নতুন প্রজন্মের চেতনায় উজ্জীবিত আমাদের মহান স্বাধীনতা। লিখেছেন-

  আফরোজা আক্তার ২৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জারিফের বয়স আট বছর। এটুকু বয়সেই সে বাবার কাছ থেকে শিখেছে পতাকা ওড়ানোর নিয়মাবলি। সে এখন জানে, সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পতাকা ওড়াতে হবে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান ও সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বাহন ছাড়া রাতে জাতীয় পতাকা ওড়ানো দণ্ডনীয় অপরাধ। দণ্ডায়মান স্তম্ভের চূড়ায় পতাকা বেঁধে রাখতে হবে। কোণাকৃতিভাবে দণ্ডায়মান স্তম্ভের সঙ্গে পতাকা বাঁধা যাবে না। জারিফ তার বাবার কাছে আরও শুনেছে এই লাল-সবুজ পতাকা কেমন করে আমাদের হল। এখন সে তার বন্ধুদেরও সেই গল্প শোনায়।

সিগন্যালে গাড়ি থামতেই ছোট্ট রায়ান পতাকা বিক্রি করতে দেখে আবদার করে পতাকা কেনার। মা একটু অবাকও হলেন রায়ান প্লাস্টিকের কোনো খেলনা কিনতে না চেয়ে পতাকা কিনতে চাইল দেখে। মনে মনে বেশ গর্ববোধ করলেন রায়ানের মনে কয়েকদিন আগে শোনানো স্বাধীনতার গল্পটা গেঁথেছে বলে। তাকে কিনে দিলেন একটি কাপড়ের পতাকা। তারপর বাসায় গিয়ে রায়ানকে সঙ্গে নিয়ে বারান্দায় গ্রিলের সঙ্গে বেঁধে দিলেন সেটি।

এভাবে প্রতিটি নতুন প্রজন্মের মাঝেই স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দিতে হবে সবার মাঝে। আর বাঙালির প্রতিটি চড়াই-উতরাই পেরোবার পথে তারুণ্যের রয়েছে অপরিসীম অবদান। সিপাহী বিদ্রোহ থেকে শুরু করে নীল বিদ্রোহ, তিতুমীর, দুদু মিয়া থেকে শুরু করে মাস্টারদা সূর্য সেন, প্রীতিলতা, ক্ষুদিরাম প্রমুখ জানা-অজানা বীরের রক্তসিঁড়ি বেয়ে মুখ্যত তরুণরাই ব্রিটিশ বেনিয়াদের বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করে বাংলাকে মুক্ত করতে পেরেছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেও তরুণরাই জীবন দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করে। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানেও তরুণরা গর্জে উঠেছিল নতুন করে। কিন্তু তারপরও শিক্ষা, চাকরি, ব্যবসা প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা পূর্ব বাংলার অধিবাসীরা নিদারুণ বৈষম্যের শিকার ছিলাম। ছিলাম পরাধীন। সেই পরাধীনতার দেয়াল ভেঙে স্বাধীনতার স্বাদ নিতেও বাংলার তরুণরা এবং আপাময় জনগণ যেভাবে হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছে তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল ঘটনা। শুধু দেশকে শত্রুমুক্ত করতেই নয়, আমাদের জীবনের প্রতিটি দুর্বার অর্জনে মিশে আছে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা আর বিজয় নিশান।

একাত্তরের তারুণ্যকে বলা হয় সাহসের প্রতিশব্দ। তাদের প্রাণের ধ্বনি থেকে আমাদের স্বাধীনতা শব্দটির জন্ম। সেই সময়ের তারুণ্যের গল্পগুলো এ সময়ের তারুণ্যকে সমানভাবে অনুপ্রাণিত করে। যার প্রমাণ দিয়েছে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর আরও একবার প্রমাণ করেছে বর্তমান প্রজন্মও তাদের পূর্বপুরুষদের দেখান পথেই হেঁটে চলেছে। তারুণ্যের এ শক্তিতে প্রতিটি প্রজন্মকেই আমাদের উজ্জীবিত করতে হবে।

শিশুকে স্বাধীনতার চেতনায় উজ্জীবিত করার কোনো ধরাবাধা নিয়ম নেই, নেই কোনো পাঠ্যসূচিও। প্রতিদিন জীবনযাপনের ভেতর দিয়েই অভিভাবকরা শিশুকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। শিশুকে অন্যসব কিছুর সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাস, আমাদের বীর সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজরিত স্থান এসব কিছুও জানানো উচিত। ছোটবেলা থেকে শিশুর মনে দেশপ্রেম জাগ্রত করা উচিত। শুধু পাঠ্যসূচিতে লেখা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ে শিশুরা কতটুকুই বা জানতে পারে। কতটুকু বা জানতে পারে ডিসেম্বর, একুশ কিংবা মার্চের একদিন স্কুল ছুটি কাটিয়ে কিংবা বাবা-মার সঙ্গে বইমেলা কিংবা টিএসসিতে ঘুরে বেড়িয়ে। তাই এ দায়িত্ব বাবা-মায়েরই।

গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের শিশু বিকাশ ও সামাজিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গাজী হোসনে আরা বলেন, শিশুকে গল্পচ্ছলে প্রতিদিন একটু করে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনান। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছোটদের বই শিশুকে কিনে দিন। শিশুকে সঙ্গে নিয়ে বসে সে গল্পের বইগুলো পড়ে শোনান। শিশুর সঙ্গে বসে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ছবি দেখুন। মুক্তিযুদ্ধের মোটিফভিত্তিক চিত্র বা বাণী, স্লোগান, ছবি সংবলিত মগ, চাবির রিং, ভাস্কর্যের আদলে তৈরি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ক্রিস্টালের রেপ্লিকা, ওয়ালম্যাট, খেলনা, প্লেট, শোপিস ইত্যাদি নানারকম স্মারক ঘরে সাজিয়ে রাখতে পারেন কিংবা শিশুকে উপহার দিতে পারেন।

স্বাধীনতা, বিজয় দিবসে শিশুকে উপহার দিতে পারেন স্বাধীনতার স্মারকসংবলিত পোশাক। কিনে দিতে পারেন দেশাত্মবোধক ও মুক্তিযুদ্ধের গানের সিডি। ছুটির দিনগুলোতে কিংবা গানের অনুশীলনে গাইতে বলুন এ গানগুলো। শিশুকে হোমওয়ার্ক করার জন্য কিনে দিন মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন চিত্রসংবলিত প্রচ্ছদের খাতা। পাশাপাশি শিশুর কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসটাও তুলে ধরুন। এতে নতুন প্রজন্ম বড় হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে গেঁথে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×