নিমতলী প্রাসাদ

  লেখা ও ছবি : সুমন্ত গুপ্ত ২৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অফিস থেকে বাসায় ফিরেছি সেই কখন। হাতে কোনো কাজ ছিল না তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরঘুর করছিলাম। হঠাৎ করে চোখে পড়ল প্রায় আড়াইশ’ বছরের পুরনো ঢাকার ঐতিহাসিক নিমতলী প্রাসাদ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে। দেখেই আমি চোখ আবিষ্ট করলাম খবরটির দিকে। ঢাকার মোগল নায়েব-নাজিমদের জন্য ২৫০ বছর আগে নির্মিত প্রাসাদ ভবনের মূল অংশ সংরক্ষণের অভাবে ইতিমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। একটি অংশ বর্তমানে বিদ্যমান যা সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছর পূর্তি উদযাপন কর্মসূচির আওতায় ২০০৯ থেকে ২০১১ সালে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু নিয়মিত ব্যবহার না করায় আবার তা কার্যকারিতা হারাচ্ছিল এবং স্থায়ীভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছিল। ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এ ভবনে জাদুঘর স্থাপন করা হয়েছে। ১৭০০ থেকে ১৯০০ সাল পর্যন্ত ঢাকা এবং পূর্ব বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনভিত্তিক নিদর্শন দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে। এসব নিদর্শন ঢাকার বহু বনেদি ও সংস্কৃতিবান পরিবার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। আমি মনে মনে ছক করে ফেললাম সামনের সপ্তাহে যখন ঢাকায় যাব তখন ঘুরে আসব এ ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা থেকে। চলে এলো কাক্সিক্ষত দিন। সকালে ঢাকায় এসে পৌঁছেছি। আমার অস্থায়ী ডেরায় কিছু সময় বিশ্রাম নেয়ার জন্য নিদ্রা দেবীর আশ্রয়ে গেলাম। যাওয়ার আগে মোবাইল কে নির্দেশ দিয়ে গেলাম আমায় ঠিক সকাল নয়টার মধ্যে ডেকে দেয়ার জন্য। মোবাইল তো তার প্রতি দেয়া নির্দেশমতো ঠিক সময়েই বেজে উঠল কিন্তু আমার নিদ্রা দেবীর আবেশ থেকে উঠতে মন চাইছিল না। তাই আরও কিছু সময় নিদ্রা দেবীর আবেশে থাকতে লাগলাম। বেশ মনের আনন্দে ঘুমাচ্ছিলাম রণে ভঙ্গ করলেন সহধর্মিণী সানন্দা এসে। কি উঠবে না ঘুম থেকে, আর কত ঘুমাবে। বলতেই ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি ঘড়ির কাঁটাতে সকাল সাড়ে এগারোটা বাজি বাজি। দেখে তো আমার চোখ মাথায় ওঠার যোগার তাই দেরি না করে ওঠে পরলাম। ঘুম থেকে ওঠে ভাবলাম নতুন যে গন্তব্যে যাব তার ঠিকানাই তো বের করা হয়নি, তাই আবার যোগাযোগ মাধ্যমে ঢু মারলাম। উবারে লোকেশন দিয়ে দেখলাম আমার অস্থায়ী ডেরা থেকে গন্তব্যে যেতে পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগবে। তাই ভাবলাম দুপুরের পেট পূজা শেষ করেই বের হই। পেট পূজা শেষ করে তৈরি হয়ে নিলাম। আমার সঙ্গে সহধর্মিণী সানন্দা গুপ্ত আর অনিক গুপ্তও তৈরি হয়ে নিল নতুন গন্তব্যে যাওয়ার জন্য। অস্থায়ী ডেরায় বসেই উবারে কল দিলাম। স্বল্প সময়ের মধ্যে গাড়ি এসে উপস্থিত। বেড়িয়ে পরলাম- আমরা গাড়িতে উঠতেই পাইলট মহোদয় জানতে চাইলেন কোথায় যাব, বললাম নিমতলী ওই জায়গায় নতুন একটি জাদুঘর আবিষ্কৃত হয়েছে। পাইলট মহোদয় বললেন, তাহলে লোকেশন মেপে দেখানো পথেই এগিয়ে যাই। আমি বললাম ঠিক আছে, আমরা চলছি এগিয়ে, ঘড়ির কাঁটায় তখন তিনটা বাজে। শুক্রবার তার পরেও রাস্তায় যানজট লেগে আছে। দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছলাম লোকেশন ম্যাপ অনুযায়ী। কিন্তু এখন কোন দিকে যাব তাই বুঝতে পারছিলাম না। কয়েকজনের কাছে জানতে চাইলাম নিমতলী দেউড়ি জাদুঘরটি কোথায়, কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারছিল না। হঠাৎ রিদওয়ান আক্রাম ভাইয়ের কথা মনে হল সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিলাম। ফোন দেয়ার পর রিদওয়ান আক্রাম ভাই পাইলট মহোদয়কে গন্তব্যে যাওয়ার পথ বলে দিলেন। আমাদের গুগলে দেখানো পথটি ভুল ছিল তাই উল্টো পথে যাওয়া শুরু করলাম আমরা। যানজট পেড়িয়ে আমরা এসে পৌঁছলাম আমাদের কাক্সিক্ষত গন্তব্যে কিন্তু ঘড়ির কাঁটায় তখন চারটা পাঁচ বাজে। প্রবেশদ্বারে লেখা দেখলাম এশিয়াটিক সোসাইটি ঐতিহ্য জাদুঘরটি। সামনে এগুতেই সেখানে উপস্থিত দ্বাররক্ষী না বলে দিলেন- এখন আর ঢোকা যাবে না। অনুরোধ করার পর বলেন, ঠিক আছে আমি ভেতরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে আসি ওনারা ঢুকতে দিতে চাইলেই তবে ঢোকা যাবে। কিছুক্ষণের মধ্যে দ্বাররক্ষী এসে গেট খুলে দিলেন। বলেন দ্রুত জাদুঘরটি দর্শন করে আসতে হবে। আমরা এগিয়ে চললাম জাদুঘরের দিকে। জনপ্রতি বিশ টাকা করে টিকিট কিনে সামনের দিকে এগিয়ে চললাম। দেখা পেলাম সেই কাঙ্ক্ষিত জাদুঘরের নতুন রং লেগেছে। দেখলে মনে হবে মাঝারি আকৃতির কোনো সুরম্য ভবন। মনের ভেতর বিস্ময় নিয়ে প্রবেশ করলাম ভবনে। দেউড়ি অর্থাৎ প্রবেশপথটি ঠিক মধ্যে। ভবনের নিচতলায় ডান দিকে পাশাপাশি দুটি ঘর। প্রতিটি ঘরে তিন দিকের দেয়ালে স্মারক রাখার জায়গা করা হয়েছে। আর বাঁয়ে আছে একটি ঘর। আমরা প্রবেশ করলাম ঘরে ভেতর, ঘরটি খুব সুন্দর করে সাজানো আছে নানা স্মারক দিয়ে। আর বাঁয়ে আছে একটি ঘর। দেউড়ি ভবনেই ছিল এশিয়াটিক সোসাইটির প্রথম কার্যালয়। নিচতলায় তাই রাখা হয়েছে ১৯৫২ সালের ৩ জানুয়ারি যাত্রা করা এশিয়াটিক সোসাইটির নানা স্মারক। আরেকটি ঘরে ডিজিটাল মনিটরে নায়েব-নাজিমদের আমলে ঢাকার ইতিহাসভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে। নিচতলায় তিনটি গ্যালারি দেখে সরু একটি সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠলাম। পুরনো সিঁড়িতে কাঠ বসিয়ে নতুনত্ব দেয়া হয়েছে। দোতলায় একটি ঘর, দৈর্ঘ্য-প্রস্থে প্রায় সমান। আলোকচিত্র ও তৈলচিত্র আছে বেশ কিছু। পরের বিস্ময় তৃতীয় তলার দিকে আমরা এগিয়ে গেলাম। দেখে মনে হল জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় গ্যালারি এটি। ৪৫ ফুট দৈর্ঘ্যরে এ কামরায় রাখা হয়েছে মসলিন, ধাতব মুদ্রা ও তৈজসপত্র। সুপরিসর ঘরে নবাব নুসরাত জংয়ের দরবারের ত্রিমাত্রিক উপস্থাপনাও তুলে ধরা হয়েছে। যেন জীবন্ত! হঠাৎ করে দেখে মনে হবে দরবারে বসে আছেন নুসরাত জং। নবাবের হাতে হুঁকার নল। পেছনে একজন কাপড়ের পাখায় নাড়িয়ে বাতাস দিচ্ছে নবাবকে। পুরো ভবনটা এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যেন দর্শনার্থীরা নবাবি আমলে ফিরে যেতে পারেন। আমি, সানন্দা আর অনিক মিলে স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ছবি তুলতে লাগলাম। ১৭ থেকে ১৯ শতক পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের স্মারক দেখা গেল জাদুঘরে। সময়কাল ধরে ধরে সাজানো হয়েছে। ঢাকায় সুবেদারি আমলের পর আসে নবাবি আমল। নায়েব-নাজিমদের নবাব নামেই ডাকা হতো। ঢাকা নিয়াবত বলা হতো এ অঞ্চলকে। তখনকার ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য আছে। নবাবদের তালিকা আছে। তাদের কাজকর্মের বর্ণনা আছে। নবাবদের আওতায় ত্রিপুরা আর চট্টগ্রামও ছিল। তার বর্ণনাও দেখা গেল জাদুঘরে। আছে তখনকার দালানকোঠা, মসজিদ, ভবন সম্পর্কেও তথ্য। ঢাকার গান-বাজনা, পোশাক, খাবার নিয়েও থাকছে অনেক তথ্য। সব মিলে পাঁচটি কক্ষে পাঁচ গ্যালারি। দেখা পেলাম জাদুঘরের কিউরেটর জাহাঙ্গীর হোসেনের তিনি জানালেন, ১৭ জন ব্যক্তির কাছ থেকে ইতিমধ্যে ৮৩টি স্মারক পাওয়া গেছে। সবই প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে আছে মসলিন শাড়ি, ধাতব মুদ্রা, আসবাব, তৈজসপত্র, দরবারে ব্যবহার হতো এমন হুঁকা, কাঁটা চামচ, চাকু, রাইস ডিশ, প্লেট, বাটি, স্যুপের পাত্র, শাড়ি, শাল, হরিণের শিং, ক্যাশবাক্স, বাতি, কলস, ঝাড়বাতি, পানদান, কোরআন শরিফ, গয়নার বাক্স, সাবানদানি, দোয়াত ইত্যাদি। এগুলো দিয়েছেন জেবউননেছা, মুহাম্মদ জালালউদ্দিন, আনজালুর রহমান, শায়লা পারভীন, সৈয়দ আবেদ হাসান, জিন্নাতুল বাকিয়া, এ ই আর খান, সাদউর রহমান, হাশমতি আরা বেগম, হোমায়রা খাতুন, মো. রফিকুল ইসলাম, নাজমুল হক, মালিয়া আলম, জিনাত পারভীন, সুলতান মাহমুদ রহমান, লুৎফুল করিম ও আবদুস সালাম। তারা সবাই পুরান ঢাকার বাসিন্দা। এদিকে জাদুঘরের সবার বাসায় ফেরার তাড়া তাই আমরা আর দেরি না করে বেরিয়ে পরলাম। বলে রাখা ভালো, দর্শকদের জন্য প্রতি শুক্রবার ও শনিবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত নামাজের বিরতি থাকবে। জাদুঘর পরিদর্শনের জন্য দর্শকদের প্রবেশ মূল্য ২০ টাকা এবং ছাত্রছাত্রীদের পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে ১০ টাকা। বিদেশি দর্শকদের জন্য ২০০ টাকা।

যাবেন কীভাবে : ঢাকার যে কোনো প্রান্ত থেকে আপনাকে যেতে হবে এশিয়াটিক সোসাইটি প্রধান কার্যালয়ে যা নিমতলীতে অবস্থিত। মতিঝিল থেকে রিকশায় খরচ পরবে ৬০ থেকে ৮০ টাকা।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×