মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর

আমাদের চেতনার বাতিঘর

  গাজী মুনছুর আজিজ ২৬ মার্চ ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাত্তরে জয়বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচার করা হতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নানা অনুষ্ঠান। কেমন ছিল এ বেতার কেন্দ্রের সম্প্রচার যন্ত্রাংশ? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কলম, সিগারেট খাওয়ার পাইপ, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের পোশাক, শহীদ ক্যাপ্টেন নূরুল হুদার পোশাক, মেজর খালেদ মোশাররফের ক্যামেরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শহীদ রশিদুল হাসানের পোশাক, শহীদ অধ্যাপক আবুল হাশেম মিয়ার কাঁচি, স্ট্রে, শহীদ এ.এস.এম হাবিবুল্লাহের সোয়েটার, জামা, চশমা, শহীদ শামসুল করিম খানের কোরআন শরিফ, শহীদ ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বির ব্যবহার করা কালো রঙের গাড়ি, মুক্তিযুদ্ধকালীন স্বাধীন বাংলার পতাকা, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করা অস্ত্র, বারুদ যুদ্ধবিমান, দলিল, চিঠিপত্র, আলোকচিত্র। এমন ১৭ হাজারের বেশি স্মৃতিস্মারক আছে ঢাকার আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। আর ৯ তলা এ জাদুঘর ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১০২ কোটি টাকা। মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্ট এ জাদুঘরের উদ্যোক্তা। জাদুঘরটির ট্রাস্টিরা হলেন- আসাদুজ্জামান নূর, আলী যাকের, সারা যাকের, রবিউল হুসাইন, মফিদুল হক, জিয়াউদ্দীন তারিক আলী, আক্কু চৌধুরী ও ডা. সারওয়ার আলী।

এ জাদুঘর ২০১৬ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছে। জাদুঘরটি নির্মাণের তহবিল সংগ্রহের জন্য উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে আহ্বান জানানো হয়েছিল সর্বস্তরের মানুষের প্রতি। সে আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন নানা পর্যায়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। ফলে এ জাদুঘর গড়ে উঠেছে সর্বস্তরের মানুষের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। অবশ্য জাদুঘরের শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ সেগুনবাগিচার একটি ভাড়া বাড়িতে।

জাদুঘরে প্রবেশ গেটের বাঁয়ে আছে ছোট্ট একটি সবুজ উদ্যান। এ উদ্যানের এক পাশে আছে লম্বা পুকুর। সে পুকুরে ফুটে আছে পদ্মফুল। আর আছে নৌকা। চাইলে পুকুর পাড়ে পা ঝুলিয়ে বসতে পারবেন দর্শনার্থীরা।

জাদুঘর ভবনে ভূগর্ভস্থে আছে তিনটি তলা। এ তলাগুলোয় আছে আর্কাইভ, ল্যাবরেটরি, প্রদর্শনশালা কার পার্কিং ইত্যাদি। নিচতলায় জাদুঘর কার্যালয় ও মিলনায়তন। সিঁড়ি বেয়ে জাদুঘরের মূল আঙ্গিনা বা প্রথম তলায় এলেই সামনে আছে শিখা চির অম্লান। এ শিখার চারপাশে পানি, মাঝখানে জ্বলছে শিখা। শিখার ওপরের দেয়ালে লেখা আছে ‘সাক্ষী বাংলার রক্তভেজা মাটি, সাক্ষী আকাশের চন্দ্রতারা, ভুলি নাই শহীদের কোনো স্মৃতি, ভুলব না কিছুই আমরা’। এ ছাড়া শিখা চির অম্লানের পাশের দেয়ালে লেখা আছে জাদুঘরের উদ্যোক্তা, জাদুঘর নির্মাণে দাতাদের নাম। আর শিখা অম্লানের সামনে দাঁড়িয়ে একটু বাঁয়ে ওপরে দেখা যাবে মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহার করা একটি বিমান ছাদের সঙ্গে আটকানো। এর পাশের দেয়ালে আছে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার ব্রোঞ্জের তৈরি ভাস্কর্য। এ ছাড়া এ তলায় আছে মুক্তমঞ্চ, ক্যান্টিন, মুক্তিযুদ্ধের বইসহ বিভিন্ন স্মারক বিক্রয় কেন্দ্র ও টিকিট কাউন্টার। ভবনের দ্বিতীয় তলায় আছে গবেষণা কেন্দ্র, পাঠাগার। তৃতীয় ও চতুর্থ তলায় আছে চারটি প্রদর্শনকক্ষ। পঞ্চম তলাটি আন্তর্জাতিক প্রদর্শনকক্ষ।

প্রথম প্রদর্শনকক্ষটির নাম ‘আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের সংগ্রাম’। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান পর্ব, রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন হয়ে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত দেশের ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে এ প্রদর্শনকক্ষে। এ ছাড় এ কক্ষে আছে ফসিল, প্রাচীন টেরাকোটা, মৃৎপাত্র, শিলাখণ্ডসহ নানা ধরনের নিদর্শন। সঙ্গে আছে ঐতিহাসিক ঘটনা ও ঘটনা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আলোকচিত্র।

দ্বিতীয় প্রদর্শনকক্ষের নাম ‘আমাদের অধিকার আমাদের ত্যাগ’। এ কক্ষে ঢুকলেই চোখে পড়বে বিশাল একটি সাদাকালো ছবি। ছবিটি স্বাধীনতার দাবিতে রেসকোর্স ময়দানে অগণিত মানুষের বিশাল সমাবেশের। আলোকচিত্রী শুক্কুর মিয়া ১৯৭০ সালের ৩ জানুয়ারি এ ছবি তোলেন। যে ক্যামেরা দিয়ে এ ছবি তোলা হয়েছে সেই ক্যামেরাটিও আছে ছবির নিচে। এখানে আরও আছে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের ছবি, মেহেরপুরে বৈদ্যনাথ তলার আম বাগানে গঠিত মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার বা মুজিবনগর সরকার গঠনের ছবি, মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহার করা রাইফেল, গুলির বাক্স, মুক্তিযুদ্ধে শহীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রীও আছে। এ কক্ষে একাত্তরের ২৫ মার্চের কালরাতের গণহত্যার ঘটনাও উপস্থাপন করা হয়েছে স্থাপনাকর্মের মাধ্যমে। এ কক্ষে আরও দেখা যাবে অপারেশন সার্চলাইট নামে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকায় ঘুমন্ত বাঙালির ওপর ট্যাংক, কামান, সাঁজোয়া যান নিয়ে যে অতর্কিতে হামলা চালিয়েছে তার নমুনা। সে জন্য কক্ষের এ অংশটুকু অন্ধকার রাখা হয়েছে। এ অংশে আরও আছে সে দিনের সেই গণহত্যার আলোকচিত্র।

চতুর্থ তলায় আছে দুটি প্রদর্শনকক্ষ। প্রথমটির নাম ‘আমাদের যুদ্ধ, আমাদের মিত্র’। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের জীবনযাত্রা, বিদেশি গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের বড় আকারের ডিজিটাল প্রিন্ট, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ, বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ হওয়া, রাজাকারদের তৎপরতা, মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলাযুদ্ধের আশ্রয়স্থল, মুক্তিযুদ্ধে দেশে-বিদেশে যারা বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছেন বা জনমত গড়েছেন সে সবই উপস্থাপন হয়েছে এ কক্ষে। আরও আছে পণ্ডিত রবিশঙ্করের উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রে আয়োজিত কনসার্ট ফর বাংলাদেশের বিটলসের শিল্পী জর্জ হ্যারিসন ‘বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ শিরোনামে যে গান গেয়েছেন জর্জের হাতে লেখা সেই পাণ্ডুলিপি ও সুরের স্টাফ নোটেশনও। জাদুঘরের শেষ প্রদর্শনকক্ষটির নাম ‘আমাদের জয়, আমাদের মূল্যবোধ’। এখানে আছে নৌযুদ্ধের বিভিন্ন নিদর্শন। বিলোনিয়ার যুদ্ধের রেলস্টেশনের রেলিং, ট্রলি, মিত্রবাহিনীর ছত্রীসেনাদের আক্রমণ, আগুনে পোড়া ঘরবাড়ি, অর্জিত বিজয়, ১৯৭২ সালের স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সংবিধানের অনুলিপিসহ নানা নিদর্শন।

১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিরপুরে মুসলিম বাজার ও জল্লাদখানা বধ্যভূমি খননের কাজ করে এবং পরে ২০০৮ সালে এ জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে একটি স্মৃতিপীঠ নির্মাণ করে। এখানে মুক্তিযুদ্ধে দেশের যেসব জায়গায় গণহত্যা হয়েছে সেসব স্থানের মাটি, গণহত্যার নানা তথ্য এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গণহত্যার তথ্য সংরক্ষিত আছে। এখানে খনন করে উদ্ধার করা শহীদের মাথার খুলি, হাড়সহ বিভিন্ন নমুনা সংরক্ষিত আছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে।

জাদুঘরের একটি ভ্রাম্যমাণ জাদুঘরও আছে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ভ্রাম্যমাণ জাদুঘর প্রদর্শিত হয়। এ ছাড়া জাদুঘর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাংবাদিকতার জন্য বজলুর রহমান স্মৃতিপদক প্রদানসহ গণ্যহত্যা, মানবাধিকার, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবসে অনুষ্ঠান, বক্তৃতা, প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজন করে থাকে।

ছবি : লেখক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×