আদিবাসী অনুষঙ্গে ফ্যাশনের ধারা

কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি বা পার্বত্য চট্টগ্রামে ঘুরতে গিয়ে চাকমা, মণিপুরি, সাঁওতালদের পোশাক কিনে আনেননি এ রকম মানুষ খুব কমই আছেন। এর কারণ হচ্ছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের পোশাক, গহনাসহ বিভিন্ন অনুষঙ্গ বরাবরই আমাদের ফ্যাশনে বেশ জনপ্রিয়। জানাচ্ছেন-

  আফরোজা আক্তার ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আধুনিক জীবনযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ ফ্যাশন। দিনবদলের ধারায় প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে ফ্যাশনের ধরনও। নতুনত্ব থাকায় আদিবাসী তথা পাহাড়ি পোশাক-পরিচ্ছদ এখন প্রবেশ করছে মূলধারার ফ্যাশনে।

সমতলের বাসিন্দারা পাহাড়ে বসবাসরত মানুষের জীবনযাপন নিয়ে সব সময়ই খানিকটা কৌতূহলী থাকেন। বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান প্রভৃতি স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ৪০টির মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায় সাধারণত তাদের পোশাকের জন্য ফেব্রিক নিজেরাই তৈরি করে থাকে। সেগুলো খুব রঙিন। আদিবাসী মোটিফেই ডিজাইনগুলো পূর্ণতা পায় পোশাকের ক্যানভাসে। আদিবাসী পোশাকের ক্যানভাসে দেখা মিলবে পাখি, প্রজাপতি, ফুল-পাতার ব্যবহার। লাল মাটিতে রঙিন ডিজাইন তাদের ঐতিহ্যগত দিক। ফ্যাশন ডিজাইনাররা সমতলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে পাহাড়ের ফ্যাশনের মেলবন্ধন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বহুদিন ধরে। আর তাদের স্বকীয় আর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও গহনায় ভিন্নতা থাকায় তা ফ্যাশন হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে সমতলের মানুষদের মধ্যে। নামকরণের প্রয়োজনে একেই বলা হচ্ছে আদিবাসী ফ্যাশন।

আদিবাসীদের পোশাকের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেলে ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধ হচ্ছে বাঙালি ফ্যাশন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য মিলও খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন অধিকাংশ আদিবাসীদের একখণ্ড কাপড় কোমরে একপ্যাঁচে জড়িয়ে পরতে দেখা যায়। চাকমা সমাজে এর নাম কোমরকাট। ধারণা করা হয় এখান থেকেই লং স্কার্টের উৎপত্তি। চাকমা, মগ বা মারমা, ত্রিপুরা মেয়েরা তাদের দৈনন্দিন জীবনে যে পোশাক পরে তা থামি বা পিনন নামে পরিচিত। এই থামি এখন অনেকেই পরছেন।

থামি কেটে হাল ফ্যাশনে সালোয়ার-কামিজ, শার্ট, ফতুয়া প্রভৃতিও তৈরি করা হচ্ছে। আবার অনেক ফ্যাশন হাউস থামির ডিজাইন ঠিক রেখে পাতলা সুতায় শাড়ি বুনছেন। পাহাড়ি মেয়েরা লাল, সবুজ, নীলের মিশেলে রেওন সিল্কের ভারি নকশা করা পোশাক পরে উৎসব উদযাপন করেন। এ পোশাকটি উজ্জ্বল রং আর বুননে চমৎকারভাবে তৈরি। বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানে আদিবাসী কাপড় থেকে তৈরি ফতুয়া, প্যান্ট, পায়জামা, ব্লেজার, স্কার্টের সঙ্গে পাহাড়ি গহনা সাজে আনছে ভিন্নমাত্রা। জুম পোশাকের বাহার এখন আধুনিক তরুণীদের দারুণ প্রিয়। পাহাড়ি অঞ্চলে জুম তুলার সুতা থেকে তৈরি সালোয়ার-কামিজ, ফতুয়া থেকে শুরু করে সব পোশাকেই রয়েছে তরুণীদের আকর্ষণ। আর এভাবেই ডিজাইনারদের হাত ধরে আদিবাসী ফ্যাশন প্রবেশ করছে মূল ধারার ফ্যাশনে। যা হাল ফ্যাশনে বেশ সমাদৃত হচ্ছে।

পোশাকের পাশাপাশি আদিবাসী গহনার ফ্যাশনও এখন বেশ জনপ্রিয়। আদিবাসীদের গহনায় জ্যামিতিক মোটিফের ব্যবহার বেশি। কাঠামো বেশ বড়সড়। আদিবাসী গহনার মধ্যে আছে বড় মালা, নেকলেস, পায়েল, কানের দুল, তাজ, বাজু প্রভৃতি। আদিকালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা, খুমি ইত্যাদি আদিবাসীরা পিতলের তৈরি ‘পয়সার মালা’ পরতেন। পয়সার মালা এখন আমাদের ফ্যাশনেও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। রাজবংশীয়রা ভালোবাসতেন রুপার, কাঠের মালা পরতে। একসময় পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমা মেয়েদের সিলভারের হাঁড়ির কানি গলায় পরিয়ে রাখা হতো, যাতে মঙ্গোলিয়ানরা মারমা মেয়েদের দিকে দৃষ্টি না দেয়। হাঁড়ির কানির নিচের অংশে কয়েকটি পয়সা যুক্ত করে এখন নতুন নকশার কানের দুল তৈরি করছেন ডিজাইনাররা। পোশাক ও গহনার পাশাপাশি আদিবাসী ফ্যাশন অনুষঙ্গ ও স্টাইলে নতুনত্ব আনতে মাথায় পেঁচিয়ে নিতে পারেন রঙিন ওড়না, গামছা কিংবা স্কার্ফ। আদিবাসী ফ্যাশন অনুষঙ্গে যুক্ত করতে পারেন আদিবাসী নকশার ছাতা, বোহামিয়াম ব্যাগ, ঝোলার মতো ব্যাকপ্যাক প্রভৃতি।

বর্তমানে বিভিন্ন ফ্যাশন হাউস আদিবাসী অনুষঙ্গের প্রতি জনপ্রিয়তার কথা মাথায় রেখে পোশাক, গহনা, জুতা, ব্যাগের পাশাপাশি নিত্যব্যবহার্য জিনিসও তৈরি করছেন। আদিবাসী ধারায় ঘর সাজাতে চাইলে ডাইনিং টেবিলে বিছাতে পারেন গারোদের পিনন, জানালায় ঝোলাতে পারেন চাকমাদের কাপড়ের তৈরি পর্দা, বমরেও কম্বল দিয়ে তৈরি করে নিতে পারেন সোফার কভার কিংবা পিনন দিয়ে কুশন। ম্রোদের কাপড় দিয়ে তৈরি দেয়ালচিত্রও নজর কাড়বে সবার।

আদিবাসী পোশাক ও গয়না নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে ফ্যাশন হাউস বিশ্বরঙ, বান্দরবানের জত্রিয়া, চট্টগ্রামের আরিয়ান ফ্যাশন, আনিন্দ্য ও ডলস হাউস। ফ্যাশন হাউস ডলস হাউসে পাওয়া যাবে বমদের কোমর তাঁতে বোনা কাপড় থেকে তৈরি করা বিভিন্ন ব্লেজার। মণিপুরি তাঁত এম্পোরিয়ামে পাওয়া যাবে মণিপুরি শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ প্রভৃতি। প্রবর্তনায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের তৈরি গামছা, ওড়না, চাদর, ব্যাগ ইত্যাদি পাওয়া যাবে। আদিবাসী পোশাক ও ব্যাগের দেখা মিলবে ট্রাইবাল ক্র্যাফট এম্পোরিয়ামে। ফ্যাশন হাউস চরকায় রয়েছে কোমরতাঁতে তৈরি শতরঞ্জি। ড চিং চিং অনলাইন শপে পাওয়া যাবে আদিবাসী গহনা। ‘ভরহবৎু’ নামেও তাদের একটি অনলাইন পেইজ রয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×