বেড়ানো

কুয়াকাটা থেকে চর বিজয়

  মুহাম্মদ জাভেদ হাকিম ১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা শহরের যানজট ঠেলেঠুলে লঞ্চ ছাড়ার কিছুক্ষণ বাকি থাকতেই, একে একে বারোজন ভ্রমণ বন্ধু সদরঘাট টার্মিনালে হাজির হই। বন্ধু সোহেল, আগেভাগেই আমাদের জন্য দুটো ডিলাক্স কেবিন বরাদ্দ রেখেছিল। ৬টা ৪০ মিনিটে হুইসেল বাজিয়ে ঘাট ছেড়ে যায় লঞ্চ। ফতুল্লা যেতেই সংগঠনের ব্যানার বারান্দায় টানানো হয়।

আমরা যেখানে ভ্রমণে যাই সেসব জায়গাগুলো হল প্রকৃতির চাদর। অথচ আমরা অনেকেই অসচেতনভাবে প্লাস্টিকের গ্লাস, প্লেট, বোতল, চিপস-চকলেটের মোড়কগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে আসি। যা কয়েক যুগেও পচে না। এতে প্রকৃতির মারাত্মক দূষণ ও বিপর্যয় ঘটে। অথচ একটু সচেতন হলেই তা রোধ করা সম্ভব। তাই আমরা দুর্গম অঞ্চলের নয়নাভিরাম কোথাও ভ্রমণে গেলে, খাবারের পাত্র হিসেবে কলাপাতা ব্যবহার করি।

সকাল ৬টায় পটুয়াখালী। ঘাটে আগেই রেডি থাকা মাইক্রোতে চড়ে ছুটি কুয়াকাটা। আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাই সাগরপাড়। এদিকে শেষ রাত হতেই শান্ত সাগর অশান্ত। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ২নং সতর্ক সংকেত। নাশতা সারতে সারতেই আমাদের কুয়াকাটা’র ভ্রমণ বন্ধু ওমর মিজান, কাঁচা বাজার নিয়ে হাজির। আর দেরি নয়। দ্রুত ঘাটে চলে যাই। ইঞ্জিন বোট নিয়ে শফিক মাঝিও রেডি। বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটায় উত্তাল বঙ্গোপসাগরের নোনা পানিতে বোট ভাসালেন মাঝি। একটা সময় দৃষ্টির সীমা হতে হারিয়ে গেল, চলাচলরত অন্যান্য জলযানগুলো। তখন বিশাল দরিয়ার মাঝে শুধু আমরাই। মাঝে মধ্যে গাঙ চিল উড়ে যায় আপন মনে। সবাই যখন খোশগল্পে মশগুল তখন মাঝির চিৎকারে উৎসুক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাই। মোবাইল ফোনে চরের দিক নির্দেশনা চাইছেন, আর জোরে জোরে বলছেন, কুয়াশার জন্য দিক হারিয়ে ফেলেছেন। আড়াই ঘণ্টার জায়গায় অতিরিক্ত আরও প্রায় সোয়াঘণ্টা পর চরের নিশানা পেলাম। সবাই উৎফুল্ল। চুলো, হাঁড়ি, পাতিল, বাজার-সদাই সব নিয়ে এবার ছোট ডিঙ্গিতে চড়ে পর্যায়ক্রমে দামাল পোলাপানগুলো চরের দিকে যেতে লাগল। একসময় আমিও কয়েকজনসহ ডিঙ্গিতে চড়লাম। তীরে ভিড়ার কাছাকাছি ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটে গেল।

আনন্দে ডিঙ্গির আগায় ফটোশ্যুট আর বাঁধন হারা ঢেউয়ের ঝাপটায় পল্টি খেয়ে ভিজে জবুথবু। শরীরে ভেজা কাপড় তাতে কী? ব্যাগে তো আছে, আরে সেটাও তো ভিজেছে। এমনকি কাঁথা-বালিশসহ। তবুও দুঃখ নেই। যখন তাঁবু পাতার জন্য চরের মাঝামাঝি যাই। বুঝতে আর বাকি রইল না যে আমরা এসেছি নীল জলরাশির বঙ্গোপসাগরের বুকে মাথা উঁচু করা, অপার সৌন্দর্যময় কোনো নয়নাভিরাম প্রকৃতির সান্নিধ্যে। সবাই বেশ পুলকিত।

দীর্ঘ পথ পরিক্রমার ক্লান্তি যেন সব ঝরে পড়ল। শুরু হল দে-ছুটের অপেক্ষাকৃত তরুণদের দৌড়ঝাঁপ। কেউ মাছ কাটা, কেউ চুলা সেট করা কেউবা আবার ক্যাম্পিংয়ের জন্য তাঁবু টানানোতে মহা ব্যতিব্যস্ত। সঙ্গে নেয়া সিলিন্ডার চুলায়, রফিক ভাই দিলেন ডালে-চালে মিলিয়ে খিচুড়ি বসিয়ে। বেলাল রাতের বারবিকিউর জন্য আনা মাছের আঁশটা ছাড়াতে দিচ্ছে পাণ্ডিত্যের পরিচয়। জসিম-হানিফ নয়া মোবাইল সেটে ছবি তোলায় এমন ভাব, যেন তারা বিশাল বড় মাপের স্থিরচিত্র গ্রাহক।

উঠতে হবে সাতসকাল। সবাই যে যার মতো তাঁবুতে ঢুকে পড়লাম। বেশ একটা মজার ব্যাপার হল, রাতে তাঁবুবাসী হিসেবে এই চরে- কোনো ভ্রমণ দল হিসেবে আমরাই হলাম প্রথম। একেক তাঁবুতে দুই-তিনজন। ঘুম যখন ভাঙল তখন মাত্র আলো ফোটে। ঝটপট সবাই রেডি। বাঁশের আগায় ঢাউস সাইজের লাল-সুজের পাতাকা উড়িয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, বীর ও নির্যাতিতদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করার মধ্য দিয়ে দিনের শুরু। কুয়াকাটা থেকে চরটির অবস্থান পূর্ব-দক্ষিণে। পানি পথে প্রায় ৪০ কিমি. দূরবর্তী গাছপালা, জন্তু, প্রাণী ও প্রায় মানব বসতিহীন চর থেকে দেখা আকাশের রক্তিম আভার রূপ অবিশ্বাস্য ভালোলাগার মতো। যা আজীবনের সুখস্মৃতির গল্প হয়ে রবে। এবার আমরা আরও এগিয়ে যাই চরের উত্তর দিকে। উত্তাল বাতাসে বাঁশের আগায় থাকা লাল-সবুজের পতাকাটা পতপত করে ওড়ে। যতই এগিয়ে যাই ততই মুগ্ধতা ভর করে। চরের চারদিকে সমুদ্র। টালমাটাল ঢেউ আছড়ে পাড়ে রেখে যায় শামুক, ঝিনুক। দূর থেকে মনে হবে সাদা শিউলি ফুল, প্রেয়সীর আগমনে যতন করে কেউ বিছিয়ে রেখেছে। আরও কিছুটা এগোতেই চোখে ধরা দেয় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। তাদের ভুবনে আমাদের আগমন মেনে নিতে পারেনি। ভালোভাবে ছবি তোলার আগেই লাপাত্তা। আমরাও আর পাখিদের বিরক্তির কারণ না হয়ে রণে ভঙ্গ দিয়ে দক্ষিণে ছুটি।

চরটি ২০১৭ সালের শেষের দিকে, জেলেদের তথ্যমতে, আরিফ রহমান নামক এক শৌখিন পর্যটক কুয়াকাটার বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা নিয়ে চরটিতে প্রথম যান। তিনি নাম রাখেন চর বিজয়। যদিও আমি স্থানীয় এক জেলে হতে বেশ কয়েক বছর আগেই চরটির জেগে উঠার খবর পেয়েছিলাম। কিন্তু সময়-সুযোগের অভাবে যাওয়া হয়নি। আরিফ রহমানের তথ্যমতে চরটি বর্ষায় অনেকাংশ ডুবে যায় বিধায় এখনও সরকারিভাবে নথিভুক্ত করা হয়নি। চরটির ভৌগোলিক ও প্রকৃতির সৌন্দর্য এক কথায় দারুণ। হতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য বঙ্গোপসাগরের বুকে সেন্টমার্টিনের মতো আরেক নয়নাভিরাম লীলাভূমি। সেই সুদূরপ্রসারী ভাবনা হতেই সৌন্দর্যের আধার জেগে উঠা চরটির, জুতসই একটা নাম রাখি এক্সিলেন্ট দে-ছুট ল্যান্ড।

যাবেন কিভাবে : সদরঘাট নৌ-টার্মিনাল থেকে বিভিন্ন কোম্পানির লঞ্চ সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টা পর্যন্ত পটুয়াখালীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। সেখান থেকে বাসে বা রেন্টকারে কুয়াকাটা। এছাড়া সায়েদাবাদ ও গাবতলী থেকে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সরাসরি কুয়াকাটা পর্যন্ত যায়। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে ইঞ্জিন-স্পিড বোটে এক্সিলেন্ট দে-ছুট ল্যান্ড [চরবিজয়]।

লাগবে ক’দিন : যদি ক্যাম্পিং না করা হয় তাহলে আসা-যাওয়া দুই রাত আর মাঝে একদিন হলেই যথেষ্ট।

খাবেন কী সেখানে : সংখ্যায় দুই-তিনজন হলে জেলেদের কাছ থেকে মাছ-ভাত কিনে খেতে পারেন। এছাড়া লোকসংখ্যা বেশি হলে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি ও খাবার সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে।

ভ্রমণ তথ্য : পুরো চরে মাত্র কয়েকজন জেলে মাছ ধরার সুবিধার্থে অস্থায়ীভাবে বসবাস করে। দল ভারি না হলে রাতে ক্যাম্পিং করার প্রয়োজন নেই। কুয়াকাটা থেকে সহজ যাতায়াত ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণের জন্য যোগাযোগ করতে পারেন কুয়াকাটা গেস্ট হাউসের স্বত্বাধিকারী মাতলুব শরীফ ও ওমর মিজানের সঙ্গে। ফোন/মোবাইল নং ০৪৪২৮৫৬০২৪, ০১৭৬১৭১৫২২৬

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×