গরমকালে স্বস্তিকর খাবার দাবার

শওকত আরা সাঈদা (লোপা) ডায়েটিশিয়ান অ্যান্ড ইন-চার্জ, পারসোনা হেল্থ, ধানমণ্ডি, ঢাকা

  যুগান্তর ডেস্ক    ১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হঠাৎ করেই তীব্র গরমে আমরা প্রত্যেকেই হাঁপিয়ে উঠেছি। এই প্রচণ্ড গরমে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। দেখা দিচ্ছে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাও। ঠাণ্ডা-কাশি জ্বর লেগেই আছে বাসার কারও না কারও। পেটের সমস্যায় কারও হচ্ছে ডায়রিয়া আবার কারও কোষ্ঠকাঠিন্য। অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পানি ও ইলেক্টোলাইট বের হয়ে যাচ্ছে। শরীর হয়ে যাচ্ছে পানিশূন্য। এছাড়া থাকে হিটস্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা। তাই যারা নিয়মিত হাঁটেন, তারা সময় পরিবর্তন করে সকালে না হেঁটে বিকাল/সন্ধ্যার পর হাঁটা শুরু করুন। তবে গরমে খুব বেশি হাঁটা, ব্যায়াম, অত্যাধিক পরিশ্রম, অত্যাধিক খাবার খাওয়া কোনোটাই ঠিক না।

এ সময় আমরা কি খাচ্ছি, কিভাবে খাচ্ছি সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ থাকতে এ সময় একটু বুঝেশুনেই খেতে হবে। কারণ আমরা যেটা খাই, সেটা রক্ত সঞ্চালনের মাধ্যমে ত্বকে যায় বা চুলে যায়, দেহেরও পুষ্টি চাহিদা মিটায়।

তবে যারা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন তাদের জন্য এই গরমকাল বেশ উপযুক্ত। কারণ এ সময়ের জন্য উপযোগী ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারগুলো সাধারণত লো ক্যালরির হয়। আর অতিরিক্ত মসলাযুক্ত খাবার বাদ দিতে হবে। শাকসবজি, ফলমূল, বিশেষ করে যেগুলোতে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যেমন ভিটামিন এ, ই, সি এই জাতীয় খাবার বেশি খেলে বোনাস হিসেবে শরীরের পাশাপাশি ত্বকও বেশ ভালো থাকবে। তেলে বা ঘিয়ে ভাজা খাবার একেবারেই বাদ দেয়া ভালো। গরমের দিনে সঠিক পুষ্টির জন্য ও স্বাস্থ্য রক্ষায় আমাদের উচিত সুষম খাবার তালিকা (Balance Diet) থেকে খাদ্যের ৬টি পুষ্টি উপাদানের চাহিদাই যেন পূরণ হয় সেদিকে খেয়াল রাখা।

পানি ও তরল পানীয়

পানি পানের সময় খেয়াল রাখতে হবে সেটা যেন অবশ্যই বিশুদ্ধ হয়। প্রতিদিন ২.৫ লিটার থেকে ৩ লিটার পর্যন্ত পান করতে পারেন। প্রস্রাবের রং স্বাভাবিক না হলে পানির পরিমাণ আর একটু বাড়াতে পারেন। পানি শরীরের ভেতরকে স্নিগ্ধ, আর্দ্র, সতেজ ও পুষ্ট রাখে। তবে কিডনি রোগী ও ফ্লুয়িড রিটেনশন সিনড্রমের রোগীদের পানি পানের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে আর ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। কাগজি লেবুর, কাঁচা আমের শরবত, তরমুজ, বাঙ্গি, পুদিনা পাতার শরবত, তেঁতুল, দুধ, বেল, শসার জুস, গাজরের জুস, ডাবের পানি, টক দইয়ের লাচ্ছি, ইসবগুল প্রভৃতি দিয়ে শরবত করে খেতে পারেন। এছাড়া বিভিন্ন ফল ও টক দইয়ের স্মোদি খেতে পারেন। এগুলো দেহকে ঠাণ্ডা রাখে। চা, কফি দেহের ক্লান্তি দূর করে এবং কাজে উৎসাহ জোগায়। অত্যধিক গরমে হালকা লিকারের লেবুর চা বা গ্রিন টি খেতে পারেন।

সালাদ

গরমের সময় দই, শসা, টমেটো, গাজর, কাঁচা পেঁপে, কাঁচামরিচ, ধনেপাতা, পুদিনাপাতা, লেবু, পেঁয়াজ ইত্যাদি দিয়ে সালাদ করা যায়। অনেক সময় এর সঙ্গে পাকা পেয়ারা ও আপেল দিয়েও সালাদ করা যায়। সালাদ তৈরি করে ফ্রিজে কিছুক্ষণ রেখে পরে খাওয়া যেতে পারে। লেবুতে থাকে প্রচুর ভিটামিন সি ও পটাশিয়াম, যা দেহকে ঠাণ্ডা রাখে এবং ত্বক মসৃণ রাখে।

সবজি

গ্রীষ্মকালের সবজি মোটামুটি সবগুলোই ভালো। যেমন : ঝিঙা, চিচিঙ্গা, পটল, করলা, পেঁপে, কচু, বরবটি, চালকুমড়া, টমেটো, শসা ইত্যাদি। নিরামিষ রান্নায় চার-পাঁচ ধরনের সবজি ও হালকা মসলা, অল্প তেল দিয়ে রান্না করলে ভালো।

ডিম, মাছ, মাংস ও দুধ

ভাজা ডিমের চেয়ে পোচ, সেদ্ধ ডিম তাড়াতাড়ি হজম হয় তাই খাবার তালিকায় ডিম রাখুন। মাংসের মধ্যে মুরগির মাংস সহজপাচ্য। সমুদ্রের মাছে সোডিয়াম ও আয়োডিন থাকে প্রচুর। পুকুর ও নদীর মাছ ভালো। গরু, খাসির মাংস না খেয়ে ছোট মাছ, ছোট মুরগি, পাতলা ডাল, টক দই, পাতলা দুধ, খাদ্যতালিকায় রেখে দৈনিক চাহিদা পূরণ করতে হবে। দুধের সঙ্গে কয়েক ফোঁটা মধু মিশিয়ে খেলে তা শরীরকে ঠাণ্ডা রাখে। অল্প তেলে কম মসলায় ঝোলের তরকারি খেলেও শরীর ঠাণ্ডা থাকবে আর অ্যাসিডিটিও হবে না।

ফল

শরীরের সুরক্ষায় ফল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। গরমকালে আমাদের দেশে আম, কাঁঠাল, জাম, পেয়ারা, লিচু, তরমুজ, ফুটি, বাঙ্গি ইত্যাদির মতো প্রচুর ফল পাওয়া যায়। এক দিনে বেশি ফল একসঙ্গে না খেয়ে প্রতিদিনই কিছু না কিছু খেলে ভিটামিন ও আয়রনের চাহিদা পূরণ হবে। এছাড়া ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের চাহিদা মেটাতে টক ফল ও মিষ্টি ফল দুটোই খাবার তালিকায় রাখুন।

শর্করা জাতীয় খাবার

এ ধরনের খাবার পাবেন ভাত, রুটি, চিড়া, মুড়ি, সুজি, সাগু, চিনি, আলু ও ফল থেকে। দুধ থেকেও পাওয়া যায়। আমে থাকে প্রচুর ভিটামিন ‘এ’। এতে কোনো প্রোটিন বা ফ্যাট নেই, শর্করা থাকে। তবে গরমে শর্করার চাহিদা মিটাতে ভাত, রুটি, চিনির পরিমাণ কমিয়ে ফল, সবজি, দুধ, দই খাবার তালিকায় বেশি রাখুন।

গরমে যেসব খাবার খাওয়া যাবে না

অ্যানার্জি ড্রিংকস বা চিনিযুক্ত ফলের জুস : অ্যানার্জি ড্রিংকস শরীরের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। কোমল পানীয় পানে কোনো উপকার নেই। বিশেষ করে অ্যালকোহলযুক্ত বেভারেজ পান করলে শরীরে আরও বেশি পানি শূন্যতার সৃষ্টি করে। এর পরিবর্তে ডাবের পানি, আখের জুস, চিনি ছাড়া ফলের জুস ইত্যাদি খেতে পারেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে অতিরিক্ত ঠাণ্ডা বা গরম কোনো কিছু যেন খাওয়া না হয়।

অতিরিক্ত তেল চর্বি : গরমের দিনে অতিরিক্ত তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলা ভালো। এ জাতীয় খাবার শরীরের তাপমাত্রা বাড়ায় সেই সঙ্গে ঘাম ও অস্বস্তি দুই-ই বাড়াবে। গরু, খাসি, মগজ ভুনা এ ধরনের খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। চর্বির সঙ্গে অতিমাত্রায় চিনিযুক্ত খাবারও এড়িয়ে চলতে হবে।

ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার

অতিরিক্ত তেল বা ডুবো তেলে ভাজা খাবার, ঘি, মাখন, পনির, মেয়নেজ, ফাস্টফুড, পোলাও, কাচ্চি, গরু ও খাসির মাংস, ভুনা খাবার, অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার অবশ্যই এড়িয়ে যেতে হবে।

বাসি বা অতিরিক্ত খাবার

তাজা খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। অনেক বেশি আইটেম করলে বেশি খাবার খাওয়া হয় যা শরীরকে ক্লান্ত ও অসুস্থ করে ফেলে। তাই অবশ্যই পরিমিত খেতে হবে। বাসি খাবার খাওয়া যাবে না।

আমরা সবাই একটু নিয়ম মেনে এবং সচেতন হলেই এ প্রচণ্ড গরমের আবহাওয়াতেও থাকতে পারি সুন্দর ও সুস্থ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×