ঈদে উৎসবে বাঙালির রসনাবিলাস

শুধু রসনাবিলাস নয়, খাদ্য প্রস্তুত ও খাদ্য গ্রহণকে উপভোগ্য করে তোলার প্রয়াস বরাবরই ছিল বাঙালির। সে প্রয়াস আজও দৃশ্যমান হয় ঈদের আনন্দে, বিভিন্ন উৎসবে ও আয়োজনে। ঈদ মানে আনন্দ। প্রতিবছরই অপার আনন্দের উপলক্ষ হয়ে আসে দু’টি ঈদ উৎসব। এর মধ্যে কোরবানি ঈদটি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে নানারকম রান্নাবান্না আর গোশতের রকমারি খাবার-দাবারে। গোশতের নানা পদের রান্না- কোরমা, কালিয়া, কাবাব, কোফতা, শাহী রেজালা, কালা ভুনা, কড়াই গোশত, রোস্ট আরও কত নাম। বাঙালির এই রসনাবিলাস নিয়ে এবারের আয়োজন।

  সেলিম কামাল ০৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুসলিম বাঙালির রান্নার সুনাম ও খ্যাতি আবহমান কালের। আরব, মোগল, পাঠান, প্রতিচ্য ও পশ্চিমা রন্ধনশৈলীর সংমিশ্রণে সৃষ্টি হয়েছে সেই ঐতিহ্য।

তারই ধারাবাহিকতায় আমরা এসে পৌঁছেছি একবিংশ শতাব্দীতে। খাবারের নানা উপকরণের মিশেল দিয়ে উদ্ভাবন করা হয় ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের খাবার। আর কোরবানির ঈদে যখন ঘরে ঘরে নানা রকম মাংসের ছড়াছড়ি, তখন সেই মাংস দিয়ে নানা পদের লোভনীয় রান্নার কথা নাইবা বললাম। বাঙালির রসনাবিলাস নিয়ে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন তার রচনা বিলাস প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘তৎকালীন মুসলিম সমাজের রন্ধনশালার ত্রাহি ত্রাহি গন্ধে আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণেরও পৈতা ছেঁড়ার সাধ জাগে।’ শুধু বেগম রোকেয়াই নন, নানা গল্প কিংবা উপন্যাসে লিখে গেছেন পরবর্তীকালের সাহিত্যিকরাও।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক, চলচ্চিত্র ও নাট্য পরিচালক হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন ‘হেমন্তের নতুন ধান খেয়ে হাঁসের গায়ে চর্বি হয়, সেই হাঁস নতুন আলু দিয়ে ভুনা করে শীতের সকালে চালের রুটি দিয়ে খাওয়ায় যে কী স্বাদ’ অথবা ‘চাকচাক করে কাটা আলু ঘিয়ে ভেজে তার সঙ্গে ভাজা শুকনামরিচ মাখিয়ে ভাতের সঙ্গে খাওয়া।

জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ফেরদৌস,হঠাৎ বৃষ্টির মত মিডিয়ায় তার আবির্ভাব। কোরবানি ঈদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন,সকালবেলা কোরবানির রান্নার যে স্বাদ সেটা অসাধারণ। মা খিচুড়ির সঙ্গে মাংস রান্না করত। আমার খুব প্রিয় একটা খাবার। সে খাবার অসাধারণ হয়ে উঠতো মায়ের হাতের ছোঁয়ায়। এখনও মা ঈদের দিন রান্না করেন। মার হাতের রান্না ছাড়া কোরবানির ঈদ চিন্তাও করতে পারি না।

আগ্রহের আধিক্যে অনেকে নিজেদের বাসায় অনুসরণ করেছেন হুমায়ূন আহমেদের রেসিপি। কালিজিরা চালের প্রতি সম্ভবত তার বিশেষ দুর্বলতা ছিল, বেশ কয়েকটি লেখায় এসেছে এর উল্লেখ। ‘মাতাল হাওয়া’ উপন্যাসে কালিজিরা চালের ভাতের সঙ্গে ছিল মুরগির মাংস আর ‘মধ্যাহ্ন ২’ উপন্যাসে কালিজিরা চালের ভাতের সঙ্গে বেড়ে দেয়া হয়েছে বাটিভরা খাসির মাংস আর পেঁয়াজ। একইভাবে ‘ইলিশ মাছের ডিমে’র তরকারির কিংবা ‘কাঁঠালের বিচি দিয়ে ঝাল মুরগির সালুন’-এর কথাও এসেছে বেশ কয়েকটি উপন্যাসে।

বর্তমান সময়ের কথাসাহিত্যিক মাহবুব রেজা তার বিবিধ লেখায় তুলে এনেছেন বৈচিত্র্যময় রেসিপি। পুঁইশাক দিয়ে ইলিশের মাথা, লতি-চিংড়ি, গন্ধরাজ লেবু, আম-শুঁটকি সহযোগে ঘন ডাল, গরম ভাত..., লতি দিয়া ইচা মাছ, মুরগির গিলা-কলিজা-গলা-পায়ের ঝাল তরকারি দিয়া ভাত খাই, কাঁঠালের বিচি দিয়ে চ্যাপা শুঁটকি, জালি দিয়ে ঝোল ঝোল করে ইলিশ মাছ আলু দিয়ে দেশি লাল মোরগের ঝোল, বালাম চালের ঝরঝরে ভাত মরিচ পেঁয়াজ কুচি আর সুগন্ধি লেবু, কাজলি মাছ দিয়ে চাক চাক করে আলুর ঝোল, মেথি দিয়ে শোল আর ঘন মাষকলাইয়ের ডাল, নতুন চালের খিচুড়ি হাঁসের ঝাল মাংস বেগুন ভাজি সবশেষে গরম চা- রেসিপিগুলো দেখলেই বোঝা যায় তার ভোজনবিলাসী মন সাহিত্যের পাতায় কীভাবে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে এ রসনা বিলাসিতার পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। সিরাজগঞ্জ এলাকার মানুষের বিশেষ আগ্রহের খাবার- ‘ঘাঁটি’। বড় কোনো মাছের মাথা দিয়ে লাউ-আলু-মুগ ডালের ঘণ্ট। কালিজিরা, শইলা পাতা দিয়ে রাঁধা খাবার সেই এলাকার মানুষের অনেক পছন্দের খাবার এ বস্তুটি আমাদের বাসার সবার পছন্দ। কুড়িগ্রাম, রংপুর এসব অঞ্চলে স্থানীয় ভাষায় ‘সিদল’ খুবই পরিচিত। এটি মূলত ছোট মাছের শুঁটকি উল্লেখযোগ্য একটি রেসিপি। শুঁটকি, কচুর ডাঁটা ও পাতা মসলাসহযোগে পাটায় বেটে রোদে শুকিয়ে এটি তৈরি করা হয়। ঠাকুরগাঁও এলাকায় এক অদ্ভুত কম্বিনেশনের খাবার খাওয়া হয়। বোয়ালমাছের ঝোল এবং বেগুনের লাবড়া দিয়ে ভাপা পিঠা বেশ মজার। কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, সেতাবগঞ্জ, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের লোকদের খাবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অধিকাংশ তরকারি কিংবা মিষ্টান্ন তৈরিতে নারকেলের ব্যবহার। সিলেট-শ্রীমঙ্গলের একটি বিশেষ খাবার নাগা মরিচের আচার। চট্টগ্রাম অঞ্চলে গরুর মাংসের বৈচিত্র্যময় রান্না রসনাবিলাসে পরিপূর্ণতা এনে দেয়।

ঢাকার মানুষের খাবারের মধ্যে রয়েছে নবাবী আভিজাত্য। খাবারের রাজ্যে যেন তারাই নবাব। তাদের বিশেষ খাবারের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের কাবাব, কোফতা, কালিয়া, রোস্ট, পোলাও, বিরিয়ানি, বিভিন্ন রকম শরবত, হরেক রকম রুটি ইত্যাদি। এসব খেতে রসনা বিলাসী মানুষেরা ছুটে যান বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ।

তবে ঈদ কিংবা অন্যান্য অনুষ্ঠানাদিতে তাদের রসনাবিলাসের মাত্রা বেড়ে যায়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×