মেঘবালিকার বাড়ি

  লেখা ও ছবি শান্তনু চৌধুরী ২০ আগস্ট ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মেঘবালিকার বাড়ি।
মেঘবালিকার বাড়ি। ছবি সংগৃহীত

সবুজের সমারোহের মাঝে প্রথমেই চোখে পড়ে বাইতুল ইজ্জত পুলিশ ট্রেনিং ক্যাম্প। এটা ছাড়িয়ে যাওয়ার পর বিচিত্র অভিজ্ঞতা। কখনও গভীর খাদের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে গাড়ি। কখনও দীর্ঘ সমতল, সুউচ্চ পাহাড়, ঘন সবুজ বৃক্ষরাজি আর আদিবাসী পাহাড়িদের জীবনযাত্রা দেখে বাড়তে থাকে মনের খোরাক। বান্দরবানের কাছাকাছি এসে পৌঁছে গাড়ি খাড়া চলতে শুরু করলে বুঝতে হবে এই গাড়ি আর উঠবে না। কারণ গাড়ি তখন শুভলং-এর পাহাড়ে। গাড়ি না ওঠার ধারণাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে দেবে গাড়ির সহকারী। ভয়ার্ত পর্যটককে সে ডাক দেবে ‘মেঘলা আইয়ন’ ‘মেঘলা আইয়ন’ বলে।

প্রথমেই গাড়ি থেকে নেমে একটি ছোট পর্যটন গেট। যেখানে লেখা ‘পর্যটনকেন্দ্র মেঘলা’। টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকার পর গেটের পাশেই ১০০ ফুট গভীর খাদ বেয়ে নামতে হবে নিচে। আছে কটেজ, রেস্ট হাউস, শিশু পার্ক ও নয়নাভিরাম একটি লেক। লেকে নানা ধরনের বড় মাছ চাষ হয়। আছে নৌবিহারের ব্যবস্থা। রয়েছে ক্যাবল কারও।

ছাতাঘর ও গোলঘর রয়েছে পুরো এলাকায়। এতে বসে বসে পথের ক্লান্তি ভুলে জিরিয়ে নেয়া যায় আর অবসরে উপভোগ করা যাবে ভালোবাসা। এই পর্যটনকেন্দ্রের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ঝুলন্ত সেতু। দুটি ঝুলন্ত সেতু যেন দু’পাহাড়ের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেছে। ঝুলন্ত সেতুতে ঝুলে ঝুলে পার হয়ে এলাম অপর পাহাড়ে। সেই পাহাড় খাড়া উঠে গেছে দিগন্তে। যেখানে চোখ হারিয়ে যায়। মেঘলা পর্যটনে রয়েছে হরিণ, বানর, সাপ, গয়াল, বনবিড়াল, খরগোশ প্রভৃতি।

মেঘলা পর্যটনকেন্দ্র ছাড়িয়ে গোধূলি বেলায় এবার আমাদের গন্তব্য মূল শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে একটি পাহাড়ে। স্থানীয়দের কাছে এটি টাইগার হিল নামে পরিচিত হলেও পুস্তকি নাম ‘নীলাচল’। পাহাড়ি অন্যসব পথের মতো এই পথ রোমাঞ্চে ঠাসা। নানা চড়াই-উতরাই পেরুতে পেরুতে এক সময় মিতালি হবে মেঘের সঙ্গে। এক মুগ্ধ আবেশে ভরে যাবে মন।

একেবারে শেষ পাহাড়ের মাথায় চারপাশকে মনে হবে ছোট জগত। পুরো পৃথিবীকে মনে হবে নাগালের মধ্যে। হাতের মুঠোয়। কারণ নীলাচলের পাহাড়ের চারপাশে আকাশ তার সীমানা টেনেছে। চারদিকের প্রকৃতি এত সুন্দর ছড়িয়ে রেখেছে নিজেকে ক্লিকের পর ক্লিক যেন চলতেই থাকবে।

২০০৬ সালে এই পর্যটন স্পটটি চালু হয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০০ ফুট উচ্চতার নীলাচল যেতে পথের ধারে চোখে পড়বে অষ্টবিংশতি বৌদ্ধ মন্দির ও রত্নপ্রিয় বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র। ফিরতি পথে সন্ধ্যা নামে। তবে সেটা সন্ধ্যা নয়। আকাশ ভেঙে যেন জোছনা পড়ে। মেঘে মাটিতে মাখামাখি। ভালোবাসাবাসি জোছনার সঙ্গেও। দূরে নীল আকাশ মনে হচ্ছে পাহাড়ের সঙ্গে ফিরতি পথে দাঁড়িয়ে গল্প সারছে। আমরাও গল্প শেষে পথ ধরি।

রাতে বান্দরবান শহরের সাঙ্গু নদীর সেতুতে দাঁড়িয়ে চন্দ্রাহত জোছনা উপভোগ করি। পরে টুকটাক কেনাকাটা। পরদিন ভোরে গন্তব্য নীলগিরি। আমরা বান্দরবান থেকে রিজার্ভ গাড়ি নিয়েছিলাম। এতে পথে পথে জিরিয়ে জিরিয়ে যাওয়ার সুবিধা। এখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে খাদ আর স্বচ্ছ নদী দেখা। বান্দরবান জেলা সদর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত নীলগিরি। বান্দরবান পাহাড়ের ওপর দিয়ে নির্মিত থানচি আলীকদমের এই সড়কটি বাংলাদেশের সবচেয়ে উঁচু সড়ক। নীলগিরির পাহাড়ি পথটি অন্যসব পথের চেয়ে আলাদা। কোথাও পথের খেয়ালে পথ হারিয়েছে।

এই পথের শেষ তো আরেক পথ আদৌ আছে কিনা সেটা অজানাই রয়ে যাবে। যদি না রোমাঞ্চ অনুভব করার মন না থাকে। হঠাৎ গাড়ি চলে যাবে অনেক নিচে। মনে হবে এই বুঝি পড়ে যাচ্ছেন পাহাড়ি খাদে। আবার সেখান থেকে লড়াকু সৈনিকের মতো জেগে উঠবে ইঞ্জিন। ঘোৎ ঘোৎ শব্দে। আমাদের দক্ষ চালক এসব সামলাচ্ছিলেন নানা মজার মজার গল্প করে। এর মধ্যেই আমাদের না জানিয়ে ডানে পাহাড়ের ওপর উঠে গেল গাড়ি। এটা চিম্বুক পাহাড়। গাড়ি থেকে নেমেই যেন প্রশান্তির ছোঁয়া পেলাম। বাংলার দার্জিলিং বা পাহাড়ের রাণী বলা হয় একে।

যেদিকে চোখ পড়বে ঘন জঙ্গল। এ এমন এক দৃশ্য যা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। নানা নাম না জানা পাহাড়ি ফুল দৃশ্যকে আরও সতেজ করে তুলেছে। তবে রক্ষণাবেক্ষণে আরও মনোযোগী হতে হবে। বেশ কিছুটা সময় কাটিয়ে আবারও চলা শুরু করে পাহাড়ি গাড়ি। নীলগিরি পৌঁছে আমাদের মুগ্ধতা যেন কাটতেই চায় না। যেদিকেই তাকাই চোখ ফিরিয়ে নিতে পারি না। অসাধারণ সুন্দর সবকিছুই। যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্বপ্নরাজ্য। এখানে আকাশ পাহাড়ের সঙ্গে মিতালি করে। মেঘবালিকা চুমু দিয়ে যায় পাহাড়ের চূড়ায়। হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে দেয়া যায় মেঘের পালক।

মেঘের দল এখানে খেলা করে আপনমনে। সে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। আকাশ, বাতাস, সবুজ আর মেঘের দল লুটাপুটি খায় পদতলে। এ এক শিহরণ জাগানো অনুভূতি না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। অবচেতন মনে হারিয়ে যাবেন ক্ষণিকের জন্য। সবচেয়ে ভালো লাগবে যখন হাত দিয়ে ধরা যাবে মেঘ। মেঘের সঙ্গে ধাক্কা খাবে শরীর, মন পবনের নাও। আশপাশের পাহাড়ে কখনও মেঘ কখনও রোদের লুকোচুরি খেলা চোখে পড়বে। এক পাহাড়ে বৃষ্টি তো আরেক পাহাড়ে রোদ। নীলগিরিতে বেশ কয়েকটি কটেজ রয়েছে। কেউ চাইলে আগে থেকে রাত কাটালে বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন।

পাহাড়ে রাতের সৌন্দর্যও অসাধারণ। ফিরতি পথে আমরা নামি শৈল প্রপাতে। তখন রোদ উঠেছে মেঘ পিয়নের যাওয়ার সময় প্রায়, যেসব চিঠি হয়নি বিলি পড়েছে যেন ঝরনায়। পাহাড়ি ফল খাই। ঝরনার কলতান ছন্দ হয়ে বাজে।

সূর্য্যি মামা তার দিনান্তের পাঠ শেষে বাড়ি ফিরছে। আমরা তার পিছু পিছু। বিকালের আবির আলো লাল পাহাড়কে আরও রাঙিয়ে তুলেছে। বন্ধুর পথে আমরা ফিরছি। সেই পথের বাঁকে বাঁকে খেলা করছে রহস্য রোমাঞ্চের জগত। আকাশের তারাগুলো চোখের ইশারায় কথা বলছে। শেয়ালের হুক্কা হুয়া রব। ঝিঁ ঝিঁ ডাকছে। জোনাকিরা আলো ছড়াচ্ছে। চাঁদের বাত্তিতে আবার আসার কসম কাটছি। গাড়ি ছুটছে সাঁ সাঁ শব্দে। রাতের নীরবতা ভঙ্গ করে।

কীভাবে যাবেন

যে কোনো জায়গা থেকে বান্দরবান গিয়ে সেখান থেকে রিজার্ভ গাড়িতে করে বান্দরবান ঘোরা ভালো। স্বর্ণ মন্দির, জাদিসহ দেখার আছে অনেক কিছু। এছাড়া বিভিন্ন গন্তব্যে পাহাড়ি চান্দের গাড়িও ছাড়ে।

কোথায় থাকবেন

মেঘলা, নীলাচল বা নীলগিরিতে বা আশপাশে কটেজ রয়েছে। এছাড়া বান্দরবান শহরে রয়েছে নানা মানের ও দামের আবাসিক হোটেল।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×