সজল স্মরণে কক্সবাজারে ম্যারাথন

এভারেস্টজয়ী সজল খালেদের উদ্যোগে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ রোডে ২০০৮, ২০০৯ ও ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত হয় বাংলা ম্যারাথন। ২০১৩ সালে এভারেস্ট জয় করে নামার পথে সজল মারা যান। তাই বন্ধুকে স্মরণ করে এবার একক ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয়েছে- গাজী মুনছুর আজিজ

  যুগান্তর ডেস্ক    ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পথের মাইলস্টন দেখেও আনন্দ পাওয়া যায়, আর সেটা অনুভব করি পূর্ণ ম্যারাথনে নেমে। আনন্দের কারণ; সামনে আর কতটা পথ দৌড়াতে হবে তা ভেবে। ৩০ ডিসেম্বর এ ম্যারাথন করি কক্সবাজারের সমুদ্রের তীর ঘেঁষা মেরিন ড্রাইভ রোডে। এ রোডে আগেও একাধিকবার ম্যারাথন করেছি। তবে সে ম্যারাথন ছিল প্রতিযোগিতা। আর প্রতিযোগীও ছিল অনেক। তবে এবারের ম্যারাথন একক। আর এটি কোনো প্রতিযোগিতাও না। এটি শুধুই এভারেস্টজয়ী বন্ধু সজল খালেদ স্মরণে একক ম্যারাথন।

সকাল সাড়ে ছয়টায় লাবনী সৈকত পয়েন্ট থেকে ম্যারাথন শুরু করি। সৈকতের বিপরীতে সূর্য তখন কেবল উঁকি দিচ্ছে। পর্যটন নগরী কক্সবাজারের পথে তখনও পর্যটকের হাঁটা-চলা শুরু হয়নি। লাবনী থেকে সুগন্ধা, কলাতলী হয়ে এগোই। কিছুক্ষণের মধ্যে আসি দরিয়ানগর সৈকত। মেরিন ড্রাইভ রোডের প্রকৃত সৌন্দর্যটা মূলত এ দরিয়ানগর সৈকত থেকেই শুরু। পিচঢালা পথের একপাশে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত, আর অন্যপাশে সবুজ গাছগাছালিতে ঢাকা পাহাড়। আবার পথের দুই পাশে সারি-সারি গাছ। সব মিলিয়ে ভালো লাগার। এ ভালোর আবেশ গায়ে মেখেই এক সময় চলে আসি হিমছড়ি সৈকত ও হিমছড়ি জাতীয় উদ্যানের কাছে। এখানে একটু পানিবিরতি দিই। তারপর আবার শুরু করি।

আস্তে আস্তে সূর্যের তেজ বাড়ে। কক্সবাজার থেকে ইনানি সৈকত বা টেকনাফ যাওয়া-আসার পর্যটকের গাড়ির চলাচলও বাড়ে। বাস, মাইক্রোবাস, জিপ বা অটোরিকশায় চেপে পর্যটকরা যাওয়া-আসা করছেন। খোলা জিপে কেউ কেউ মাথা তুলে গায়ে হাওয়া লাগিয়ে মনের আনন্দে চলেছেন। কেউ আবার গানের সুর তুলেছেন প্রকৃতিতে মুগ্ধ হয়ে। এসব দেখতে দেখতেই পেচারদ্বীপ হয়ে পাড়ি দিই রেজুখাল ব্রিজ। আমার আগে আগে অটোরিকশায় আছেন সাইক্লিস্ট আবুল হোসেন আসাদ। ম্যারাথনের শুরু থেকেই তিনি আছেন। আমার ছবি তুলছেন।

শীত মৌসুম হওয়াতে সূর্যের তেজ খুব একটা গায়ে লাগছে না। সমুদ্রের পাড় বলে হালকা বাতাসও বইছে। অন্যদিকে সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ গর্জন তুলে আছড়ে পড়ছে পাড়ে। সব মিলে অন্য আমেজ। এ আমেজের রেশ ধরে হলুদ, লাল আর কালো রঙের মাইলস্টন গুনতে গুনতে একসময় চলে আসি ইনানি সৈকতের সেতুর কাছে এবং পূর্ণ করি ম্যারাথনের অর্ধ পথ। তখন মধ্য দুপুর। এখান থেকেই আবার ফিরতে শুরু করি লাবনী সৈকতের উদ্দেশে। কারণ এখান থেকে ফিরলেই ম্যারাথনের নিয়ম অনুযায়ী ৪২.১৯৫ কিলোমিটার পূর্ণ পথ পারি দেয়া হবে।

পথের বিভিন্ন স্থানে ডাব বিক্রেতারা ডাব ঝুলিয়ে বসে আছেন। কোনো কোনো স্থানে আবার তরমুজ বিক্রেতা বসেছেন তার খেতের তরমুজ নিয়ে। সমুদ্রের পাড়ে যে জমিন আছে, সে জমিনে চাষ করা হয়েছে ছোট আকৃতির এ তরমুজ। উৎসাহী পর্যটকরা গাড়ি থামিয়ে ডাব বা তরমুজ খাচ্ছেন। কেউ আবার ডাব বা তরমুজ খাওয়ার ছবি বা সেলফিও তুলছেন। এসব দেখেই এগোই।

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত হিসেবে কক্সবাজারের পরিচিতি আছে পৃথিবীজুড়ে। দেশের প্রধান পর্যটননগরীও এটি। এছাড়া সৈকতের পাড় ঘেঁষা এ মেরিন ড্রাইভ রোডটি সত্যিই অনন্য সৌদর্যের। সেজন্য বন্ধু সজল খালেদ চেয়েছেন এ মেরিন ড্রাইভ রোডে ম্যারাথন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে রোডটিকে দেশি-বিদেশি পর্যটকের কাছে পরিচিত করে তুলতে। পাশাপাশি এ ম্যারাথনের মাধ্যমে আরও বেশি বিদেশি পর্যটককে বাংলাদেশে টেনে আনা ও পর্যটনের উন্নয়ন করাও ছিল সজলের মূল উদ্দেশ। সে উদ্দেশেই সজল খালেদের উদ্যোগে এ মেরিন ড্রাইভ রোডে ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো ম্যারাথন প্রতিযোগিতা হয়। এ ম্যারাথনের নাম ছিল- বাংলা ম্যারাথন। এ ধারাবাহিকতায় ২০০৯ ও ২০১০ সালেও এ ম্যারাথন হয়। তিনটি ম্যারাথনেই আমি অংশ নিই এবং সফলভাবে শেষ করি। প্রথমবার ম্যারাথনের আয়োজক হিসেবে ছিল বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব। দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারের আয়োজক ছিল এক্সট্রিমিস্ট নামের সংগঠন। এরপর আর এ ম্যারাথন হয়নি। কারণ ২০১৩ সালে এভারেস্টজয় করে নামার পথে সজল মারা যান। অবশ্য তার লাশ এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। আর সেজন্যই বন্ধুর স্মরণে আমার এ একক ম্যারাথন। পাশাপাশি আমার এ ম্যারাথনের মাধ্যমে আমি চাই মেরিন ড্রাইভ রোডটিকে সজল খালেদের নামে নামকরণ করে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে এখানে ম্যারাথন প্রতিযোগিতা হোক। আর এ ম্যারাথনের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটকের দৃষ্টি আকর্ষণ করাও সম্ভব হবে। এছাড়া এ ম্যারাথনকে উদ্দেশ্য করে কক্সবাজারে বেড়াতে আসা দেশি-বিদেশি পর্যটকের মাঝে সৈকত পরিচ্ছন্নতার তাগিদ এবং সৈকত ও সৈকত পাড়ের জীববৈচিত্র্য রক্ষা বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করাও সম্ভব হবে।

সারাদিনে এ পথে অসংখ্য পর্যটক, স্থানীয় মানুষ, অটোরিকশা, বাস, মাইক্রোবাস আসা-যাওয়া করছে। আমার হয়তো কারও মুখ চেনা নেই। কিন্তু কেউ কেউ আমাকে চিনে রেখেছেন। তাই ফিরতি পথে কয়েকজন স্থানীয় ও কয়েকজন অটোরিকশার চালক জিজ্ঞাসা করেন- ভাই আর কত হাঁটবেন? আর কত দৌড়াবেন?

বছরের শেষ সময় হওয়াতে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল। এ ঢলের কারণে কলাতলী থেকে লাবনী যাওয়ার পথ পর্যটক, অটোরিকশা আর গাড়িতে ভরপুর। তাই পথের পাশ দিয়ে হাঁটাও কষ্টকর। সেজন্য সাবধানে এগোই। ৩টা ৫০ মিনিটে লাবনী সৈকতে এসে শেষ করি সজল স্মরণে আমার একক ম্যারাথন।

আবুল হোসেন আসাদ ও গাজী মুনছুর আজিজ

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter