ধলেশ্বরীর তীর ঘেঁষে ভাসমান পাঠশালা

  রিয়াজ রিপন ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভাসমান পাঠশালা
ভাসমান পাঠশালা। ছবি সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক অনলাইন পত্রিকায় অনন্য এক বিদ্যানিকেতন নিয়ে বাংলাদেশের যখন জয়জয়কার ধ্বনি উঠল, তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, পরের দিন উভচর সেই স্কুলঘর আর ওই জায়গাটা দেখে আসব বলে। কোনো ডান-বাম চিন্তা না করে সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম ব্যাগে ভরে ক্যামেরা আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে।

ঢাকা থেকে মাওয়া যাওয়ার একটি সহজ ও নতুন পথ হয়েছে কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া পাড় হয়ে আলীপুর পর্যন্ত। শহর থেকে মাত্র ২৫ মিনিটের পথ, আলীপুর সেতুসংলগ্ন এ বাঁশের স্কুলটি। সম্প্রতি সারা পৃথিবীতে ছয়টি দেশের মধ্যে ভবনের অবকাঠামোর বিচিত্রতার কারণে এবং নান্দনিকতার বাছ-বিচারে এ ভাসমান বিদ্যালয়টি আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত হয়েছে। বাংলাদেশের মুদ্রায় হিসাব করলে প্রায় দেড় কোটি টাকার পুরস্কার অর্জন করেছে শিক্ষাকেন্দ্রটি।

আধা ঘণ্টার মধ্যে সবুজ প্রকৃতির ছায়াঘেরা আলীপুর সেতুসংলগ্ন ভাসমান বিদ্যালয়টিতে পৌঁছি। সেখানে নদীর মুক্ত বাতাস হু হু করে বইছিল। আমি ব্রিজের ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পাই নদীর তীর, ছোট্ট ছোট্ট কোষা নৌকায় বসে জাল দিয়ে মাছ ধরছেন অনেকেই। রোদে পুড়ে গরুর গা ধুয়ে দিচ্ছেন। কৃষাণীর মুখে হাসি, ছোট মেয়েরা শাপলা শালুক কুড়াচ্ছে। গ্রামের এ চিরায়ত দৃশ্য দেখে আনন্দই লাগে। সেখানে গিয়ে বিদ্যালয়টিতে কোনো পাঠদান না দেখায় অনেকটাই অবাক হওয়ার পরিস্থিতি আর কি। পরক্ষণেই বিদ্যালয়ের কর্তব্যরত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বর্ষার কয়েক মাসে বিদ্যালয়টিতে পাঠদান করা হয়ে ওঠে না। তবে তারা খুব শিগগিরই শিক্ষা কার্যক্রম আবার শুরু করবেন বলে জানালেন।

নদীর জোয়ারে ভেসে বেড়ানো সেতুসংলগ্ন নদীর কোলঘেঁষা বিদ্যালয়টি বাঁশ, দড়ি আর ড্রাম দিয়ে এক অভিনব পদ্ধতিতে নির্মিত এ কাঠামো সৌন্দর্য। ড্রাম ব্যবহারে বিদ্যালয়টি ভাসমান অবস্থায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। নদীর জোয়ারের সময় পানির ওপর ভেলার মতো ভাসতে থাকে স্কুলটি। পানি কমে গেলে আবার নির্দিষ্ট স্থানে বসে পড়ে। স্থানীয় সুবিধাবঞ্চিত যেসব দরিদ্র মানুষ জীবিকার জন্য দিনভর কাজ করে বেড়ান তাদের সন্তানদের মৌলিক শিক্ষার চাহিদা মেটায় এ বিদ্যালয়টি। ব্রিজ থেকে ২০ ফুট নিচে প্রায় দেড়শ’ ফুটের লম্বা অবকাঠামোতে তিনটি শ্রেণিকক্ষ, একটি স্বল্প পরিসরে খেলার কৃত্রিম মাঠ, আর ছোট ছোট দু-তিনটি কক্ষ নিয়ে নির্মিত এ বিদ্যালয়টি। মাত্র দু’জন শিক্ষক আর প্রায় ত্রিশজন শিক্ষার্থীসহ শিক্ষা কার্যক্রম চলছে গত কয়েক বছর ধরে।

বিদ্যালয়টির আশপাশের পরিবেশের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় সবুজের হাতছানি আর মায়াবী জলকেলি। নদীর ছোট ছোট ঢেউ, জোয়ারে প্লাবিত ধানি জমি, পাশে নদীর তীর বেয়ে বাঁশ ও ড্রামে নির্মিত বিদ্যালয়টি দেখে বিমোহিত হতে হয়। প্রবেশদ্বারের সম্মুখ প্রান্তে রয়েছে স্বল্প পরিসরে একটি নার্সারি। বর্ষার দিনগুলোয় একটু পানি বেড়ে যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম ঠিকভাবে চলছিল না। বঞ্চিত উদ্যোক্তাদের সম্পর্কে বিদ্যালয়ে কর্তব্যরত আশিস ও জ্যেষ্ঠ কর্মী নজরুলকে প্রশ্ন করা হলে তারা জানান, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অক্ষরজ্ঞান দিতে উদ্যোক্তারা নিরলসভাবে কাজ কাজ করে যাচ্ছেন।

গ্রামীণ পরিবেশ ভ্রমণপ্রিয় যে কোনো ব্যক্তির কাছে উপভোগ্য হয়ে উঠবে। কখনও কখনও নৌকায় পাল তুলে ধলেশ্বরীর বুকে মাঝি মাল্লার বৈঠা হাতে ভেসে চলা কিংবা জীবিকার তাগিদে নদীতে জেলেদের মাছ ধরা, পরিবারের চাহিদা মেটাতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের খাদ্য উপকরণ সংগ্রহ বা কুড়ানি দেখে আপনার ভালো লাগবে।

সম্প্রতি রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত হওয়া আগা খান অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার ২০১৯ এ আনন্দসভায় ভূষিত হয় এ প্রকল্পটি। প্রকল্পটির স্থপতি সাইফ-উল হক। বিভিন্ন দেশকে পিছু ফেলে বাহরাইন, ফিলিস্তিন, রুশ ফেডারেশন, সেনেগাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৫টি স্থাপনার সঙ্গে যৌথভাবে পুরস্কারটি জিতেছে বাংলাদেশের এ স্থাপনাটিও।

তাই এটি নিজের চোখে দেখতে ও একটু গ্রামীণ পরিবেশের স্বাদ পেতে সময়-সুযোগ বুঝে যে কোনো দিন বেরিয়ে পড়তে পারেন আপনার পরিবার কিংবা বন্ধুদের নিয়ে।

কীভাবে যাবেন

কেরানীগঞ্জ উপজেলার হযরতপুর ইউনিয়নের আলীপুর ব্রিজের নিকটস্থ দক্ষিণ কানারচরের ধলেশ্বরী নদীর তীরবর্তী বাঁশের স্কুল, গ্রামীণ পরিবেশ, জীবন-জীবিকা জানা ও ঘুরে দেখার জন্য সহজ উপায় হল মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ থেকে সিএনজি করে কলাতিয়া গিয়ে ওখান থেকে আবার সিএনজি নিয়ে আলীপুর ব্রিজ। জনপ্রতি মোট ৪০ টাকা করে মাত্র ২৫ মিনিটে পৌঁছে যাওয়ার সহজ উপায়।

হেমায়েতপুর থেকেও অটোরিকশা করে যাওয়া যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবহন বাস না থাকায় বাসযোগে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কয়েক দিনের জন্য কলাতিয়া ও আলীপুর মধ্যস্থ একটি ব্রিজের কাজের কারণে ব্রিজের ওপর দিয়ে পার হওয়ারও ব্যবস্থা স্থগিত রাখা হয়েছে। বিকল্প হিসেবে মানুষ ও মোটরসাইকেল পারাপারের জন্য ট্রলার ব্যবস্থা রয়েছে। যে কোনো দিন ঘুরে আসতে পারেন আপনার পরিবার-পরিজন নিয়ে। শুভ কামনা রইল, আপনার ভ্রমণে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×