শিশুর মানসিক বিকাশে খেলাধুলা

  কেয়া আমান ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফুটবল খেলা।
ফুটবল খেলা। ছবি সংগৃহীত

আজকের শিশু আমাদের ভবিষ্যৎ, তারাই হবে দেশ গড়ার কারিগর। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সঠিকভাবে বেড়ে উঠতে যেমন প্রয়োজন শারীরিক সুস্থতা, তেমনই প্রয়োজন মানসিক সুস্থতা।

গবেষকদের মতে, জন্মের পর থেকেই শিশুর শরীরের বৃদ্ধি আর মনের বিকাশ ঘটতে থাকে। বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গের পরিবর্তন ও আকৃতি সুগঠিত হতে থাকে। অন্যদিকে জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা, আবেগ ও অন্যের সঙ্গে মেলামেশা করার দক্ষতা অর্জিত হয়।

শারীরিক শক্তি ও মানসিক চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধিমত্তা বিকাশের অন্যতম মাধ্যম হল খেলাধুলা। খেলাধুলাই একমাত্র সুস্থ শরীর গঠন, সঠিক ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও মানসিক বিকাশে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, খেলাধুলা বা ছোটাছুটি করতে না পারা শিশুরা পরবর্তীকালে নানা সমস্যায় ভোগে। মাঠে খেলাধুলার সময় শিশুদের শরীরে রক্তপ্রবাহ অনেক বেড়ে যায়।

এটা শিশুদের দেহ-মন গঠন এবং সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা নানা পরিস্থিতি সামাল দিতে শেখে। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। পরাজয় মেনে নিতে শিখে। বাইরে খেলাধুলা ছাড়া এটা সম্ভব না।

খেলাধুলার গুরুত্ব

খোলা প্রান্তর বা মাঠের সঙ্গে দুরন্ত এক শৈশবের সম্পর্ক রয়েছে। মাঠ শিশু-কিশোরদের বিনোদনের একটি বড় অনুষঙ্গ। আজকের শহরে বড় হওয়া ছেলেমেয়েরা জানেই না খোলার মাঠে দৌড়ঝাঁপের মজাটা কী। মাঠ মানেই খোলা আকাশের সঙ্গে পরিচিত হওয়া। মাঠ মানেই অনেক শিশু-কিশোরের সঙ্গে মেলামেশা, যা পারস্পরিক মিথষ্ক্রিয়ার মাধ্যমে শিশুর মনোজগৎ বিস্তৃত হতে সাহায্য করে।

প্রতিদিন খেলাধুলার মাধ্যমে আস্তে আস্তে শিশুর শরীর, হাড় ও মাসল শক্তিশালী হয়। তারা দ্রুত বেড়ে ওঠে। নিয়মিত মাঠে খেলাধুলা শিশুদের উদ্দীপনা, কর্মক্ষমতা ও সহনশীলতা বৃদ্ধি করে, হার ও জিতকে সহজে মেনে নিতে সাহায্য করে। তাই শিশুর জন্য মাঠে খেলার ব্যবস্থা করতে হবে। অবসর সময়ে পরিবারের সবাই মিলে টিম হয়েও শিশুর সঙ্গে বাইরে বা বাড়িতেই খেলাধুলা করতে পারেন। পাশাপাশি ছবি আঁকা, সঙ্গীতচর্চাসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কাজেও শিশুকে উদ্বুদ্ধ করুন।

কোথায় খেলবে শিশুরা

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলার মাঠ শিশুর মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অথচ যেভাবে শহরায়ন হচ্ছে তাতে ধারণা করা যায় হয়তো খুব শিগগিরই মাঠগুলো নগরায়নের আগ্রসানে হারিয়ে যাবে। এজন্য প্রতিটি স্কুলে মাঠের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। স্কুলে মাঠ না থাকলেও শিশুকে খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা উচিত হবে না। রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় এখনও কিছু কিছু খেলার মাঠ ও পার্ক রয়েছে।

ইলেকট্রনিক খেলার সরঞ্জাম দিয়ে ঘরের মধ্যে বন্দি না রেখে অভিভাবকদের শিশুকে বাসার কাছাকাছি ওই জায়গাগুলোতে নিয়ে যেতে হবে। যদি সেটাও সম্ভব না হয় তবে বাড়ির ছাদ, বড় ব্যালকনি বা বারান্দায়ও শিশুর জন্য খেলার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ছাদে খেলতে গিয়ে যাতে শিশু ব্যথা না পায় সেজন্য ছাদে মোটা ফ্লোর ম্যাট বিছিয়ে দিতে পারেন। অন্যদিকে যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থাও করতে হবে সর্বাগ্রে।

অন্যান্য বিনোদন কার্যক্রম

শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশে পড়াশোনার পাশাপাশি সাইক্লিং, সাঁতার কাটা, দড়ি লাফ, ঘুরতে যাওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের বিনোদন কার্যক্রম শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তাই এ ধরনের বাইরের খেলাধুলায় শিশুকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

ভিডিও গেমসের ক্ষতিকর প্রভাব

এক সময় বিকাল বেলাটা শিশুর খেলাধুলার জন্য বরাদ্দ থাকলেও, এখন পড়াশোনার চাপ সামলাতে পড়ন্ত বিকাল বেলায়ও শিশুকে বই-খাতা নিয়ে এ কোচিং থেকে সে কোচিং ছুটতে হয়। অন্যদিকে যখন সময় পায় তখনও মাঠ কিংবা খোলা জায়গার অভাবে শিশুরা খেলাধুলার করতে পারেন না। খেলাধুলা চিত্তবিনোদন ও আনন্দের খোরাক। চিত্তবিনোদন শূন্যতায় অল্প বয়সেই বিভিন্ন অপরাধ চক্রে জড়িয়ে যাচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। খেলাধুলা না করায় বর্তমানে শিশু-কিশোরদের অবসর কাটে টিভি, মোবাইল, কম্পিউটার কিংবা ভিডিও গেমসে, যা শিশুর চোখের জন্য ক্ষতিকর। তাছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় শিশুরা নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছে। নিজেই তৈরি করে নিচ্ছে আলাদা এক জগৎ। যে জগৎ শিশুর সহজ-সরল জীবনকে ধ্বংস করে দিতে বাধ্য।

শৈশবকালের একাল-সেকাল

মাত্র কয়েক দশক আগেও মাঠ ছাড়া স্কুল-কলেজ কল্পনা করা না গেলেও এখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রাণ খুলে দৌড়ানোর, খেলাধুলা করার জায়গার বড় অভাব। সেসঙ্গে সভ্যতার ক্রমবিকাশ আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে হারিয়ে গেছে এক সময়কার গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী খেলা দাড়িয়াবান্ধা, কানামাছি, ঘুঁটি খেলা, গোল্লাছুট, বৌচোর, এক্কা-দোক্কা, মোরগ লড়াই, ডাংগুলি, ইচিং বিচিং, জোঁলাভাতি, কাবাডি, ঘুড়ি প্রভৃতি। আগে গ্রামে কিংবা শহরের অলিতে-গলিতে এসব খেলা দেখা যেত। আর এখন অলিতে-গলিতে ক্রিকেট ছাড়া অন্য কোনো খেলা আর তেমন দেখা যায় না।

স্কুল কলেজ ছাড়াও আগে প্রচুর খোলা প্রান্তর চোখে পড়ত। খোলা প্রান্তরে বা মাঠে ঘুড়ি ওড়ানোটা এক সময় ছিল আনন্দের অন্যতম উপকরণ। ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে পরিচয় ঘটে সবুজ ঘাসের সঙ্গে, নদীর সঙ্গে, আকাশের সঙ্গে। এখনকার শিশুরা এ অনুভূতি জানেই না।

নাগরিক জীবনের প্রতি ঝুঁকে পড়ার পাশাপাশি আমরা আমাদের অনেক নির্মল আনন্দ বিসর্জন দিয়ে এখন একেবারেই যান্ত্রিক হয়ে উঠেছি। তাই যেভাবেই হোক শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে শিশুকে মাঠে খেলার সুযোগ করে দিতে হবে। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে বিকল্পস্থানে খেলার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ শিশুদের একটি আনন্দমাখা শৈশব উপহার দেয়া আমাদের দায়িত্ব।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×