প্রত্নতাত্ত্বিক ট্যুরিজম বিকাশে আগ্রহী এলিজা

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ০৫ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রত্নতাত্ত্বিক ট্যুরিজম বিকাশে আগ্রহী এলিজা
প্রত্নতাত্ত্বিক ট্যুরিজম বিকাশে আগ্রহী এলিজা। ছবি সংগৃহীত

ভ্রমণকন্যা এলিজা বিনতে এলাহী। বাংলাদেশি এ নারী ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের ৬৪টি জেলা। প্রতিটি জেলায় খুঁজে বেরিয়েছেন ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন। অর্থাৎ এ দেশের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য নিজ চোখে দেখে সেগুলো ক্যামেরায় ধারণ করেছেন, সেগুলো নিয়ে গবেষণা করছেন।

তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাংলাদেশের হেরিটেজ-বিষয়ক তার এ যাত্রা শুরু হয় ২০১৬ সালের ১৭ মে রাজধানী ঢাকার বলধা গার্ডেন থেকে আর ৬৪ জেলা ভ্রমণের শেষটা হয়েছে চলতি বছরের ২৮ আগস্ট বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। তার এ উদ্যোগের নাম দিয়েছেন ‘কোয়েস্ট : অ্যা হেরিটেজ জার্নি অব বাংলাদেশ।’ দেশের ৬৪টি জেলা ঘোরার পাশাপাশি মোট ৪৭টি দেশ ঘোরার অভিজ্ঞতাও এলিজার আছে।

এলিজা বিনতে এলাহী বেড়ে উঠেছেন একান্নবর্তী পরিবারে। স্বামী ও এক ছেলেকে নিয়ে তার সংসার। ঢাকায় বসবাস হলেও এলিজা জামালপুরের মেয়ে। দেশের একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেন।

তিনি ইতিমধ্যে নেদারল্যান্ডসের দি হেগ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লাইড সাইন্সেসে কমিউনিকেশন ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধীনে বাংলাদেশে হেরিটেজ ট্যুরিজমের ওপর গবেষণা সমাপ্ত করেছেন। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প বিকাশে হেরিটেজ ট্যুরিজমের গুরুত্ব’।

এছাড়াও লেখক হিসেবেও তিনি কম যান না। এশিয়া মহাদেশ ভ্রমণের ওপরে তার লেখা দুটো বই এলিজা’স ট্রাভেল ডায়েরি ও এলিজা’স ট্রাভেল ডায়েরি-২ পাঠক সমাদৃত হয়েছে।

নিজের আগ্রহ, পরিবারের সাপোর্টে আর নিজের উপার্জিত অর্থে বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো সংরক্ষণ এবং এগুলো দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছেন এলিজা বিনতে এলাহী। ইংরেজি সাহিত্য পড়তে গিয়ে গ্রিক ও ইজিপ্সিয়ান সভ্যতা ও স্থাপনা সম্পর্কে জানা হয়ে যায়। তা থেকেই এলিজার আগ্রহ তৈরি হয় বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ওপর।

তবে তার বয়স যখন চল্লিশ ঠিক তখনই বাংলাদেশের হেরিটেজগুলো দেখতে বেরিয়ে পড়েন তিনি। এ বিষয়ে এলিজা বলেন, আমার ঘুরে বেড়ানোর এ অধ্যায়টা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। আমি সবচেয়ে বেশি ঘুরেছি আমার মায়ের সঙ্গে। আর আমার বয়স যখন ৪০ ঠিক তখন ২০১৬ সালে বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো দেখতে বেরিয়ে পড়ি।

আমার উদ্দেশ্য বাংলাদেশে হেরিটেজ ট্যুরিজম বা প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যটনের গুরুত্বকে তুলে ধরা। সেই লক্ষ্যে দেশের প্রাচীনতম ইতিহাস ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর তথ্য, ভিডিও চিত্র ও স্থিরচিত্র সংগ্রহ করেছি। তরুণ প্রজন্মের কাছে দেশের ইতিহাস ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে চাই।

ভ্রমণকন্যা এলিজা ট্যুরের সময় দিনভর ঘুরে বেড়িয়ে সন্ধ্যায় গল্প করতেন বিভিন্ন স্থানীয় সংগঠনের সঙ্গে। স্কাউট, ফটোগ্রাফি সোসাইটিসহ জেলার বিভিন্ন সংগঠনের তরুণ সদস্যদের নিজ জেলার গৌরবগাঁথা শোনাতেন। হেরিটেজ পর্যটনের সম্ভাবনার কথা বলতেন।

এ ভ্রমণকন্যার কাছে জানতে চেয়েছিলাম তার ভালোলাগার কিছু স্থাপনার কথা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেকটা জেলাই সমৃদ্ধ। আমার ভালো লেগেছে, মুঘল আমলের সাতটা হাম্মামখানা আর বৌদ্ধবিহারগুলো। আমরা শুধু জানি পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা ময়নামতির কথা। তবে আমি ঘুরতে গিয়ে ১৬-১৭টা বৌদ্ধবিহার খুঁজে পেয়েছি। এর মধ্যে কুমিল্লাতেই পেয়েছি ৫টা।

যেগুলোর কথা আমরা জানতাম না। যেগুলো সেভাবে দেখার উপযোগী করা হয়নি। তিনি বলেন, ভ্রমণের মৌসুমে পর্যটনের নগরীগুলোতে খুব চাপ পড়ে যায়। কিন্তু যদি বাংলাদেশের প্রত্যেকটি জেলায় লুকিয়ে থাকা হেরিটেজগুলোকে তুলে ধরা যায় তাহলে এদেশের পর্যটন শিল্প অনেকটা পথ এগিয়ে যাবে।

দেশের বাইরে ৪৭টা দেশ ঘুরেছেন এলিজা। তিনি বলেন, আমি যখন নেদারল্যান্ডসে ছিলাম তখনই ২৫টা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছি। এছাড়াও পুরো নেদারল্যান্ডসের ১২টা রাজ্য ঘুরেছি। সেখানকার ৩৬টা শহর ঘুরেছি। সেখানে যেটা দেখেছি, তারা খুব পরিচ্ছন্ন আর দেশকে অনেক ভালোবাসেন। কোনো একটা কাগজ পড়ে থাকতে দেখলে তারা সেটা নিজ দায়িত্বে ফেলে দেন। একটা ছোট্ট ঘটনা বলি, এক শীতের সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছিলাম। তখন এক লোককে দেখলাম যার আনুমানিক বয়স হবে ৭০। যিনি লাঠিতে ভর দিয়ে হাঁটছেন। সেখানকার কমবেশি সবাই অনেক কুকুর পছন্দ করেন। তো ওই লোকের সঙ্গেও দুটো কুকুর ছিল। এর মধ্যে একটি কুকুর রাস্তার মধ্যে মলত্যাগ করল। এরপর যেটা ঘটল সেটা অবিশ্বাস্য। ওই লোক পকেট থেকে টিস্যু আর পলিথিন বের করে সেগুলো তুললেন। এরপর কিছুদূর হেঁটে নির্দিষ্ট স্থানে ফেললেন। এটাই হচ্ছে তাদের দেশের প্রতি ভালোবাসা। যেটা আমাদের দেশে কল্পনাই করা যায় না। তবে পরিবর্তন হচ্ছে। পর্যটন স্পটগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষকে যেমন দায়িত্ববান হতে হবে তেমনই পর্যটকদেরও সচেতন হতে হবে।

দেশ-বিদেশে অর্থের জোগানের ব্যাপারে এলিজা বলেন, আসলে অনেকেই ভাবেন দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করতে অনেক টাকা লাগে। হ্যাঁ টাকা হয়তো লাগে তবে আপনি কোথাও ঘুরতে যাওয়ার আগে যদি একটু রিসার্চ করে যান, সেখানকার কালচার-খাবার সম্পর্কে ধারণা নিয়ে যান তাহলে দেখবেন সবকিছু সহজ হয়ে যাবে। আমি ১৩ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। আমার টাকা দিয়েই আমি ভ্রমণ করেছি। আমি যখন ইউরোপের দেশগুলোতে ঘুরেছি, থেকেছি তখন আমি কখনও শপিং করিনি।

যখন ঘুরতে বেরিয়েছি তখন শুধু ঘুরেছি। ফাইভ স্টার-ফোর স্টার হোটেলে না থেকে নিরাপত্তা আর নাগরিক সুবিধা-সংবলিত মোটামুটি মানের হোটেলে থেকেছি। কোনো জায়গায় যাওয়ার আগে সেখানকার জীবনযাত্রা, খাওয়া সম্পর্কে ধারণা নিয়েছি। কমমূল্যে ভালোভাবে থাকার চেষ্টা করেছি। দামি দামি রেস্টুরেন্টে সব সময় না খেয়ে কখনও কখনও স্ট্রিট ফুড খেয়েছি। এভাবেই আসলে নিজের বাজেটের মধ্যে ভ্রমণ করা সম্ভব।

ভ্রমণ নিয়ে নিজের পরিকল্পনা সম্পর্কে বিশ্ব পর্যটক এলিজা বলেন, ৬৪ জেলায় সংগৃহীত তথ্য, স্থিরচিত্র ও ভিডিও দেশ ও জাতির যেন উপকারে লাগে সে ব্যাপারে বিস্তৃত পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি বিভাগ এবং সম্ভব হলে জেলাভিত্তিক বই ও স্থিরচিত্র দিয়ে তথ্যবহুল ছবির অ্যালবাম প্রকাশ করতে চাই। টেলিভিশন ও ইন্টারনেটে ভিডিও ডকুমেন্টারি ও ট্রাভেল শো করারও ইচ্ছা আছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক বা হেরিটেজ ট্যুরিজমে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে, যা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি দেশে পর্যটন শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×