শমসেরনগর বধ্যভূমি
jugantor
শমসেরনগর বধ্যভূমি

  লেখা ও ছবি সুমন্ত গুপ্ত  

১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা আছি সিলেটের শমসেরনগরের একটি রিসোর্টে। রিসোর্টের কর্মীর কাছে জানতে চাইলাম আশপাশে খুব কম সময়ে কোথা থেকে ঘুরে আসতে পারব। বলতেই বললেন নিকট দূরত্বে চা বাগান আছে সেখানে ঘুরে আসতে পারেন আমি বললাম চা বাগান তো দেখেছি আর কোথায় যাওয়া যায়, তিনি বললেন তাইলে আপনারা বধ্যভূমি থেকে ঘুরে আসতে পারেন। সেখানে তেমন একটা লোকজন যায় না বললেই চলে। আমি বললাম তাইলে সেখানেই যাওয়া যায়। আর এ সুযোগে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর সেনানীদের শ্রদ্ধাও জানিয়ে আসতে পারব। আমি বললাম যাব কিভাবে জানতে চাইলে রিসোর্টের কর্মী বললেন আপনি রিসোর্ট থেকে বের হয়ে যে কাউকে বললেই আপনাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে বধ্যভূমি থেকে।

রিসোর্ট থেকে বের হয়েই পথের ধারে তিন চাকার যানবাহন পেলাম। বললাম বধ্যভূমিতে যাব আমার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লেন তিন চাকার যানের কাণ্ডারি। তিনি বললেন এখানে বধ্যভূমি পেলেন কোথাই? তার কথা শুনে অবাক হলাম। বললেন বাজারে গিয়ে দেখি কেউ চিনতে পারে কিনা আপনাদের কাঙ্ক্ষিত বধ্যভূমিটি। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম বাজারে। ড্রাইভার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললেন। এবার বললেন চলেন এবার চিনতে পেরেছি। এখানে মানুষজন যায় না বললেই চলে তাই চিনতে পারছিলাম না। পঁচিশ মিনিটের মাঝেই আমরা পৌঁছলাম বধ্যভূমির সামনে। জঙ্গলে ঘেরা অপরিছন্ন অবস্থায় দেখতে পেলাম বধ্যভূমি। দেখে খারাপই লাগল। ১৯৭১ সালে অর্জিত বাংলাদেশ শহীদের আত্মত্যাগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিখাদ দেশপ্রেম আর ত্যাগের মহান ফসল। কিন্তু আমরা সেই শহীদের প্রতি যথাযথ সম্মান কি দেখাতে পেরেছি, শহীদের আত্মত্যাগের ইতিহাস প্রজন্মের কাছে জানাতে পেরেছি? মনে মনে খুঁজছিলাম এ বধ্যভূমির ইতিহাস সংবলিত কোনো ফলক পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু কোনো ইতিহাস লিপিবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পেলাম না। শুধু মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার স্বীকার শহীদদের নাম ও ঠিকানা দেয়া আছে। বধ্যভূমির পাশে তেমন কারোর দেখাই পেলাম না। ড্রাইভারও এর ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই বলতে পারলেন না।

আমরা কিছু সময় দাঁড়িয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। পুবের বাতাস বইছে দূর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের ডাক। ড্রাইভার বললেন এক জায়গায় বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকবেন না জোঁকে ধরতে পারে। তার কথা শুনতেই আমি তাকাতে লাগলাম পায়ের দিকে। কিছু সময় দাঁড়াতেই পা বেয়ে কয়েকটা জোঁক ওঠা শুরু করেছিল, চোখে পড়েছিল বলে রক্ষা। দেখতে দেখতে কীভাবে যে সময় ছুটে চলছিল আমরা টেরই পেলাম না। আমরা ফিরে চললাম ফিরতি পথে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক এসব বধ্যভূমি, যেখানে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের ত্যাগ, নির্যাতিত মা-বোনদের হাহাকার। আর সাক্ষী হয়ে আছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও এদেশীয় সহচরদের নারকীয় গণহত্যা, নারী নির্যাতনের কত কাহিনী। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, খোলা আকাশের নিচে বধ্যভূমি স্মৃতি স্তম্ভটি নির্ভীক প্রহরীর মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

কীভাবে যাবেন

দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানযোগে মৌলভীবাজার যাওয়া যাবে। রেলপথে এলে ঢাকা থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনে করে নামতে হবে শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ বা শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে। সব আন্তঃনগর ট্রেন শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি করলেও ভানুগাছ ও শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে সব আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। ফলে আগেই জেনে নিতে হবে কোথায় নামতে হবে। শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে নামলে সেখান থেকে বাস ও সিএনজি অটোরিকশা পাওয়া যায়। শমসেরনগর পর্যন্ত বাসে যাওয়ার পর সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে সহজেই লেকটিতে পৌঁছান সম্ভব। যাদের প্রচুর হাঁটার অভ্যাস আছে তারা শমসেরনগর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হেঁটেও যেতে পারেন। আর ঢাকা বা দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বাসে আসতে চাইলে মৌলভীবাজারগামী বাসে ওঠে নামতে হবে শ্রীমঙ্গলে। সেখান থেকে একইভাবে যাওয়া যায়। এছাড়া বিমানে এলে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে নেমে বাস বা ট্রেনে আসা যাবে শমসেরনগর।

শমসেরনগর বধ্যভূমি

 লেখা ও ছবি সুমন্ত গুপ্ত 
১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা আছি সিলেটের শমসেরনগরের একটি রিসোর্টে। রিসোর্টের কর্মীর কাছে জানতে চাইলাম আশপাশে খুব কম সময়ে কোথা থেকে ঘুরে আসতে পারব। বলতেই বললেন নিকট দূরত্বে চা বাগান আছে সেখানে ঘুরে আসতে পারেন আমি বললাম চা বাগান তো দেখেছি আর কোথায় যাওয়া যায়, তিনি বললেন তাইলে আপনারা বধ্যভূমি থেকে ঘুরে আসতে পারেন। সেখানে তেমন একটা লোকজন যায় না বললেই চলে। আমি বললাম তাইলে সেখানেই যাওয়া যায়। আর এ সুযোগে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর সেনানীদের শ্রদ্ধাও জানিয়ে আসতে পারব। আমি বললাম যাব কিভাবে জানতে চাইলে রিসোর্টের কর্মী বললেন আপনি রিসোর্ট থেকে বের হয়ে যে কাউকে বললেই আপনাকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসবে বধ্যভূমি থেকে।

রিসোর্ট থেকে বের হয়েই পথের ধারে তিন চাকার যানবাহন পেলাম। বললাম বধ্যভূমিতে যাব আমার কথা শুনে আকাশ থেকে পড়লেন তিন চাকার যানের কাণ্ডারি। তিনি বললেন এখানে বধ্যভূমি পেলেন কোথাই? তার কথা শুনে অবাক হলাম। বললেন বাজারে গিয়ে দেখি কেউ চিনতে পারে কিনা আপনাদের কাঙ্ক্ষিত বধ্যভূমিটি। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা পৌঁছে গেলাম বাজারে। ড্রাইভার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললেন। এবার বললেন চলেন এবার চিনতে পেরেছি। এখানে মানুষজন যায় না বললেই চলে তাই চিনতে পারছিলাম না। পঁচিশ মিনিটের মাঝেই আমরা পৌঁছলাম বধ্যভূমির সামনে। জঙ্গলে ঘেরা অপরিছন্ন অবস্থায় দেখতে পেলাম বধ্যভূমি। দেখে খারাপই লাগল। ১৯৭১ সালে অর্জিত বাংলাদেশ শহীদের আত্মত্যাগ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিখাদ দেশপ্রেম আর ত্যাগের মহান ফসল। কিন্তু আমরা সেই শহীদের প্রতি যথাযথ সম্মান কি দেখাতে পেরেছি, শহীদের আত্মত্যাগের ইতিহাস প্রজন্মের কাছে জানাতে পেরেছি? মনে মনে খুঁজছিলাম এ বধ্যভূমির ইতিহাস সংবলিত কোনো ফলক পাওয়া যায় কিনা। কিন্তু কোনো ইতিহাস লিপিবদ্ধ অবস্থায় দেখতে পেলাম না। শুধু মুক্তিযুদ্ধকালীন গণহত্যার স্বীকার শহীদদের নাম ও ঠিকানা দেয়া আছে। বধ্যভূমির পাশে তেমন কারোর দেখাই পেলাম না। ড্রাইভারও এর ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই বলতে পারলেন না।

আমরা কিছু সময় দাঁড়িয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। পুবের বাতাস বইছে দূর থেকে ভেসে আসছে পাখিদের ডাক। ড্রাইভার বললেন এক জায়গায় বেশি সময় দাঁড়িয়ে থাকবেন না জোঁকে ধরতে পারে। তার কথা শুনতেই আমি তাকাতে লাগলাম পায়ের দিকে। কিছু সময় দাঁড়াতেই পা বেয়ে কয়েকটা জোঁক ওঠা শুরু করেছিল, চোখে পড়েছিল বলে রক্ষা। দেখতে দেখতে কীভাবে যে সময় ছুটে চলছিল আমরা টেরই পেলাম না। আমরা ফিরে চললাম ফিরতি পথে। প্রকৃতপক্ষে আমাদের স্বাধীনতার প্রতীক এসব বধ্যভূমি, যেখানে জড়িয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের ত্যাগ, নির্যাতিত মা-বোনদের হাহাকার। আর সাক্ষী হয়ে আছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও এদেশীয় সহচরদের নারকীয় গণহত্যা, নারী নির্যাতনের কত কাহিনী। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, খোলা আকাশের নিচে বধ্যভূমি স্মৃতি স্তম্ভটি নির্ভীক প্রহরীর মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।

কীভাবে যাবেন

দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বাস, ট্রেন বা বিমানযোগে মৌলভীবাজার যাওয়া যাবে। রেলপথে এলে ঢাকা থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনে করে নামতে হবে শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছ বা শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে। সব আন্তঃনগর ট্রেন শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে যাত্রাবিরতি করলেও ভানুগাছ ও শমসেরনগর রেলওয়ে স্টেশনে সব আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি নেই। ফলে আগেই জেনে নিতে হবে কোথায় নামতে হবে। শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনে নামলে সেখান থেকে বাস ও সিএনজি অটোরিকশা পাওয়া যায়। শমসেরনগর পর্যন্ত বাসে যাওয়ার পর সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে সহজেই লেকটিতে পৌঁছান সম্ভব। যাদের প্রচুর হাঁটার অভ্যাস আছে তারা শমসেরনগর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হেঁটেও যেতে পারেন। আর ঢাকা বা দেশের যে কোনো প্রান্ত থেকে বাসে আসতে চাইলে মৌলভীবাজারগামী বাসে ওঠে নামতে হবে শ্রীমঙ্গলে। সেখান থেকে একইভাবে যাওয়া যায়। এছাড়া বিমানে এলে সিলেট ওসমানী বিমানবন্দরে নেমে বাস বা ট্রেনে আসা যাবে শমসেরনগর।