গ্রাম বাংলার বায়োস্কোপ

  হাসান মাহমুদ রিপন ২১ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গ্রাম বাংলার বায়োস্কোপ
গ্রাম বাংলার বায়োস্কোপ। ছবি সংগৃহীত

‘কী চমৎকার দেখা গেল এইবারেতে আইসা গেল, ঢাকার শহর দেখেন ভালো। কী চমৎকার দেখা গেল।’- এ সুর আর ছন্দের তালে তালে ধারা বিবরণী বায়োস্কোপওয়ালার। বায়োস্কোপ বাংলার হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যের নাম। কাঠের বাক্সে চোখ লাগিয়ে গানের তালে ছবি দেখার দৃশ্য নগরজীবনে আর চোখেই পড়ে না। বায়োস্কোপ দেখাতে রাজশাহী থেকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে এসেছেন আবদুল জলিল মণ্ডল। খঞ্জনি আর গানের তালে বাক্সের ভেতর পাল্টে যায় ছবি। আর তা দেখে যেন গল্পের জগতে হারিয়ে যায় ছেলে বুড়ো সবাই।

বর্তমান সময়ে গ্রাম বাংলায় বায়োস্কোপ এমনই বিরল যে, জাদুঘরে রেখে দেয়ার জন্যও অন্তত একটি বায়োস্কোপ কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সোনারগাঁওয়ে মাসব্যাপী লোককারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবে সুদূর রাজশাহী থেকে বায়োস্কোপ দেখিয়ে অর্থ উপার্জনের আশায় এসেছেন জলিল মণ্ডল। মেলায় এলে দেখতে পাবেন হারিয়ে যাওয়া বায়োস্কোপের প্রদর্শন।

বায়োস্কোপের সঙ্গে বাঙালিকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। বিশেষ করে গ্রাম বাংলার জনপদে বেড়ে ওঠা মানুষকে তো বটেই। তবে যারা শহরের চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি জীবনযাপন করে অভ্যস্ত কিংবা যাদের জন্ম একযুগ আগে তাদের কাছে হয়তো হাস্যকর এক বোকা বাক্স মনে হবে। কিন্তু বায়োস্কোপ মোটেও হাস্যকর কোনো বস্তু ছিল না, কিংবা ছিল না কোনো বোকা বাক্সও!

প্রকৃতপক্ষে বায়োস্কোপ গ্রাম বাংলার সিনেমা হল। রং-বেরঙের কাপড় পরে, হাতে ঝুনঝুনি বাজিয়ে বিভিন্ন রকমের আলোচিত ধারা বর্ণনা করতে করতে ছুটে চলত গ্রামের স্কুল কিংবা সরু রাস্তা ধরে। হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো তার পেছন পেছন বিভোর স্বপ্ন নিয়ে দৌড়াত গ্রামের ছেলেমেয়েরা। বায়োস্কোপওয়ালার এমন ছন্দময় ধারা বর্ণনায় আকর্ষিত হয়ে ঘর ছেড়ে গ্রামের নারী পুরুষ ছুটে আসত বায়োস্কোপের কাছে। একসঙ্গে সবাই ভিড় জমালেও তিন কি চার জনের বেশি একসঙ্গে দেখতে না পারায় অপেক্ষা করতে হতো। সিনেমা হলের মতো এক শো এরপর আবার আর তিন বা চারজন নিয়ে শুরু হতো বায়োস্কোপ।

বায়োস্কোপ দেখান শুরু করলেই ‘কি চমৎকার দেখা গেল’ বলে ফের শুরু হতো বায়োস্কোপওয়ালার ধারা বিবরণী। আর এ বায়োস্কোপ দেখানোর বিনিময়ে দু’মুঠো চাল কিংবা ২ টাকা নিয়েই মহাখুশি হয়ে ফিরে যেত বায়োস্কোপওয়ালা।

কালের বিবর্তনে হারিয়ে গেছে বাংলার বিনোদনের এ লোকজ মাধ্যমটি। টিভি আর আকাশ সংস্কৃতি স্যাটেলাইট ও স্মার্ট মোবাইলের সহজলভ্যতার কারণে আপনা-আপনিই উঠে গেছে বায়োস্কোপ। তবুও কোথাও না কোথাও একজন থাকে। তেমনি একজন আবদুল জলিল মণ্ডল।

রাজশাহী জেলার বাঘমারা থানার চায়ের শারা গ্রামের মৃত বকশি মণ্ডলের ছেলে জলিল মণ্ডল। বাবা বকশি মণ্ডল দীর্ঘ ৪৪ বছর এ পেশায় জড়িত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে বাবার উত্তরসূরি হিসেবে ১২ বছর বয়সে জলিল মণ্ডল এ পেশায় আসেন। এরই মধ্যে এ পেশায় দীর্ঘ ৩৩ বছর পার করে দিয়েছেন তিনি। এ পেশার আয় রোজগার দিয়েই ২ মেয়ে, ১ ছেলে ও স্ত্রীকে নিয়ে কোনো রকমে তার দিন চলে যাচ্ছে।

বায়োস্কোপ পেশায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা ব্যক্ত করেন। একটা সময় ছিল যখন গ্রাম-গঞ্জের পথে-ঘাটে হাটবাজারে তিনি ও তার বাবা বায়োস্কোপ দেখিয়ে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন। তখন ধান, চাল ও অর্থের বিনিময়ে বায়োস্কোপ প্রদর্শন করতেন। বায়োস্কোপ প্রদর্শনের বিষয়বস্তু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে বিভিন্ন প্রেম কাহিনী, তারপর যুদ্ধ, বিশ্বের দর্শনীয় স্থান, ধর্মীয় বিষয় ও রাষ্ট্রনায়কদের নিয়ে বায়োস্কোপ প্রদর্শন করা হয়। এজন্য তাদের অনেক বেশি জানতে হয়। তারপর সেটা প্রদর্শনের সময় এক এক করে ছন্দ মিলিয়ে বলতে হয়। তাহলেই দর্শক বায়োস্কোপ দেখতে আগ্রহী হয়। তার বাক্সে একসঙ্গে ৬ জন দর্শক বায়োস্কোপ দেখতে পারে।

আ. জলিল মণ্ডলের মতে ঘরে ঘরে টেলিভিশন ও হাতে মোবাইল ফোন চলে আসায় এখন আর আগের মতো এর প্রতি দর্শকদের চাহিদা নেই বললে চলে। তবে অনেকেই কৌতূহল নিয়ে এটি দেখতে এগিয়ে আসেন। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মেলায় এ বায়োস্কোপ প্রদর্শন করে থাকেন।

তিনি বলেন, দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে গ্রামে গ্রামে গিয়ে বায়োস্কোপ দেখিয়েছেন। একযুগ আগেও বায়োস্কোপের যে জৌলুস ছিল, প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় তা আজ বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু জলিল মণ্ডল আর আগের মতো অকেজো জিনিস হিসেবে ছুড়ে দেননি বায়োস্কোপকে। জড়িয়ে ধরে রেখেছেন সন্তানের মতো। মানুষ এ বায়োস্কোপ না দেখলেও যখনই তার মনে চায়, তিনি গ্রামের সরু রাস্তা ধরে বায়োস্কোপ নিয়ে ছুটে চলেন। জলিল মণ্ডল জানেন বায়োস্কোপ এখন আর কেউ টাকা দিয়ে দেখবে না, তারপরও তিনি বায়োস্কোপ নিয়ে বের হয়ে পড়েন। কিছু উপার্জনের আশায় সুদূর রাজশাহী থেকে তিনি ছুটে এসেছেন সোনারগাঁওয়ে লোক কারুশিল্প মেলায়। তিনি জানান, দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে পূর্বসূরিদের এ পেশাকে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরে বায়োস্কোপ দেখিয়ে আসছেন তিনি। মনের আনন্দে বায়োস্কোপকে মাথায় তুলে নিলেও একটা সময়ে তা জীবিকা নির্বাহ করার মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এখন আগের মতো মানুষ আর বায়োস্কোপ না দেখায় ৩৩ বছর ধরে বাংলার এ ঐতিহ্যকে বহন করে আসা জলিল মণ্ডলও আশাহত, ক্রমাগত আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

তিনি বলেন, এটা আমার পেশা। ছেলেমেয়েদের দেখিয়ে আনন্দ দিতাম। মানুষের কাছে বায়োস্কোপটা ছিল এক মহা রহস্যময় ব্যাপার। এটা অনেকের কাছে ছিল জাদুর বাক্সের মতন। এটা দিয়াই আমার সংসারটা চলত। এখন আর আগের মতো স্কুলের পোলাপান বায়োস্কোপ দেখে না। বিভিন্ন অনুষ্ঠান হইলে পরে আমাকে ডাকে, ওইখানে গিয়ে বায়োস্কোপ দেখাই।

জলিল মণ্ডল আরও জানান, তিন পুরুষ ধরে বায়োস্কোপের পেশা। অবশ্য তার বাবা ও দাদা যে বাক্সে বায়োস্কোপ দেখিয়েছেন সেটি নষ্ট হয়ে গেছে অনেক আগেই। তারপর নতুন করে বানিয়ে নেয়া এ বাক্সটি নিয়েই চলছে তার জীবন ও জীবিকা।

জলিল মণ্ডলের এ বায়োস্কোপ দেখতে লাগে মাত্র ১০/২০ টাকা। তবু আধুনিক মাল্টি মিডিয়ার যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বায়োস্কোপেও ছবি পাল্টান, নতুনত্ব আনেন। চেষ্টা করেন দর্শকের মনোরঞ্জনের।

‘কী চমৎকার দেখা গেল এইবারেতে আইসা গেল, ঢাকার শহর দেখেন ভালো। কী চমৎকার দেখা গেল।’ এভাবেই সুর আর ছন্দের তালে তালে বায়োস্কোপের কাচের জানালায় চোখ রাখলে ছবি আর বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে উঠে অজানা পৃথিবী। আর গ্রামের সেই ছোট শিশু বা কিশোরের কাছে সেটা এক নতুন পৃথিবী।

আজও শিশু-কিশোর-বৃদ্ধ সব বয়সের মানুষকে সমানতালে আনন্দ দিয়ে যাচ্ছেন জলিল মণ্ডল। যতদিন বেঁচে থাকবেন, বায়োস্কোপ পরিবেশনের মাধ্যমে মানুষের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ আর আনন্দ ভাগ করে নেয়ার মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে যাবেন বলে জানান তিনি।

সোনারগাঁওয়ে কারুশিল্প মেলা ও লোকজ উৎসবে বায়োস্কোপের উপস্থিতি শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ নানা পেশার মানুষদের তাক লাগিয়ে দিয়েছে। তাদের মন্তব্য এ আধুনিতার যুগেও বায়োস্কোপ টিকে রয়েছে। বয়োজ্যেষ্ঠদের মতে এ বিনোদন মাধ্যমের সঙ্গে তাদের অতীত জড়িয়ে রয়েছে। কেউ কেউ বায়োস্কোপের কলাকুশলী জলিল মণ্ডলকে কাছে পেয়ে জমিয়ে আড্ডা দিতে শুরু করেন। এ সময় উভয়ের মধ্যে কথা হয় সময়ের পরিবর্তনে মানুষের ধ্যান ধারণার পরিবর্তন নিয়ে।

পর্যটক নরসিংদীর মাধবদী থেকে আসা মেলায় আগত সাজু রহমান জানান, বায়োস্কোপের সঙ্গে তার অতীত জড়িয়ে রয়েছে। তিনি তার বাবার সঙ্গে যখনই হাটে যেতেন তখন বায়োস্কোপ দেখার বায়না করতেন। এত বছর পর বায়োস্কোপ দেখে তিনি তার অতীত ও বাবার হাত ধরে হাটে যাওয়ার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে বলে জানান।

ময়মনসিংহ ভালুকা থেকে আগত দর্শনার্থী জহিরুল আলম ও মাজেদ আলী সরকার জানান, আমরা নিজে দেখেছি ওই বায়োস্কোপ। দুপুরে বাড়ির উঠোনে বাক্সটা নিয়ে বসত। বাড়ির সবাই একে একে দেখতাম। আস্তে আস্তে সব বিলীন হয়ে যাবে আমাদের অতীত ঐতিহ্য। আমরা এখন আকাশ সংস্কৃতির ঘেরাটোপে বন্দি।

বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের পরিচালক ড. আহমেদ উল্লাহ জানান, বাংলার প্রায় হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় ঘটিয়ে দেয়ার জন্যই মাসব্যাপী এ মেলার আয়োজন। এবারের মেলায়ও নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় ঘটানোর জন্য বায়োস্কোপ নিয়ে আসা হয়েছে। বিগত কয়েক বছর মেলায় তাকে আনা হয়েছিল। বায়োস্কোপ আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির একটি ঐতিহ্য বহন করে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×