গহিন গাঙের নাইয়া
jugantor
গহিন গাঙের নাইয়া

  মোহাম্মদ মহসীন  

০২ মার্চ ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অপরূপ নদীর সৌন্দর্য বুকে ধারণ করতে ছুটে যাই, কয়েক বন্ধুর ঐতিহ্যবাহী বৈদ্যেরবাজার খেয়া ঘাটে। সেখান থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া বাবদ গুনতে হয় ১২০০ টাকা। বন্ধুদের ইচ্ছা- গন্তব্য স্থান নুনেরটেকসহ এখানে-সেখানে পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার সবুজ প্রান্তে...।

মাঝি পাল তুলে হাল ধরে। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত গানটি আপন মনে গাইতে শুরু করে ‘ও আমার গহিন গাঙের নাইয়া, ও তুমি অফর বেলায় নাও বাইয়া যাওরে- কার পানে বা চাইয়া’। তখন মনের অজান্তে কোনো এক গহিনে যেন হারিয়ে যাই...। তারপর মেঘনা নদীর চারপাশের অসাধারণ দৃশ্যকাব্য মন জুড়িয়ে যায়। নদীর এপার-ওপারের অনেক গ্রাম। সেখানে সবুজের খোলা মাঠ-ঘাট, আঁকা- বাঁকা মেঠোপথ অবলোকনে যেন দৃষ্টি কাড়ে।

বসন্তকালে নদীর আকার আয়তন অনেকটাই ছোট। এর চারপাশের বিশালতা বিষণ্ন বলে মনে হয়েছে। আমরা যখন মেঘনা নদীর বুক চিরে যখন সামনের দিকে এগিয়ে যাই, তখন সাগরের নোনতা পানির কথাও মনে পড়ে। আর মেঘনার নদীর মিঠে পানির কল-কল ধ্বনিতে স্নান করতে ইচ্ছা করে। তখন হাবুডুবু শানবাঁধানো ঘাটে অ্যাডভোকেট আলী আহম্মেদ সৈকত, একেএম রাশেদুল নবী, শামীম চৌধুরী, মিজানুর রহমান মামুনসহ আরও নাম নাজানা অনেকে ঘণ্টাখানেক হৈ-হুল্লোড় করে গোসল সারি। মন মাতানো øিগ্ধ আলো বাতাসে আর নদীর ছোট ছোট ঢেউ পাল তোলা নাও, জেলেদের মাছ ধরা দৃশ্য যেন আরেক কাব্যের লাগাম টানি...!

নদীর বুকজুড়ে বিশাল জলরাশিতে ভয়ের কিছু অনুভূতিও জাগে। মেঘনার স্বচ্ছ জলের রূপ দেখে এক পেয়ালা টলমলে পানি খেতে ইচ্ছাও করেছে। অতীতে বাপ-দাদার আদি পেশা ছিল মুলি-বাঁশের। যখন সুরমা বা ধলেশ্বরী হয়ে বৈদ্যেরবাজার মেঘনা তীরবর্তী এলাকায় সারি-সারি বাঁশের বোঙ্গা ভিড়ত। তখন বাঁশ আর খলফার তৈরি করা ঘরে মাল্লাদের রান্না-বান্না করত। বাড়ির চাচাতো ভাইয়েরা মিলেমিশে ওই খাবার খেয়েছি। আর স্বাদের কথা মনে হলে স্মৃতিকাতর করে। তখন মেঘনা নদীর স্বচ্ছ পানিও পান করেছি...! সেকালে মেঘনার জল নিয়ে গৌরবের কথা অবধি ভাবছি। হাল আমলে মিল-কারখানার দূষিত বর্জ্যে নদীর প্রতি অনাদর আর অবহেলায় নিষ্ঠুর আচরণ বারবার কে বা কারা করছে।

এক সময় গভীর জলের বিশাল-বিশাল হুম মাছ ভেসে উঠত। এতে দৃষ্টিনন্দন হতো। বর্তমানে অতীত স্মৃতি ছাড়া আর কী? সেকালে লঞ্চ, স্টিমার, পাল তোলা নৌকার দৃশ্য মন জুড়াত। এখন তাও অতীত। এখন রূপ-বৈচিত্র্যের তেমন মিল নেই। স্থান বুঝে অনেকে সময় সুযোগ করে মেঘনার তীরে শীতল হাওয়ায় মন জুড়াত।

গ্রামের মাঠে-ঘাটে মৌসুমি ইরি ক্ষেতের সবুজ কচি পাতা উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে কি যেনো বলতে চায়! গাঁও-গ্রামের শিশু-কিশোরা মেঠোপথ ধরে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। যদিও বিদ্যালয় বন্ধ, তারপরও নানা বিষয়ে যেতে দেখা গেছে। আর গাঁও গ্রামের অভাবী মানুষের একদিকে রোগ-শোক আকেদিকে অর্থের টানাপোড়নের করুণ আর্তনাদও দৃশ্যমান। তখন মনটা ভার বনে যায়।

প্রকৃতির ছায়াঘেরা পরিবেশ থেকে যখন সাঁঝেরবেলা ফিরি। তখন প্রখ্যাত লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের কথাগুলো বিবেকে জানান জানিয়ে দেয়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি; জেলেরা অথৈ জলের স্রোত ধারায় ইলিশ ও বাহারি মাছ ধরছে। কাছে গিয়ে দর দাম কষে রুপালি ইলিশ কয়েক বন্ধু মিলে কিনি।

মেঘনার স্বচ্ছ জলের টাটকা মাছ আহ খেতে কি মজা। ঋতুর রঙ্গমঞ্চে আসন পেতে বসেছে বসন্তকাল; কোকিলের কুহু-কুহু ধ্বনি। বাংলার রূপ এক সময় এক রকম। তবে বৈচিত্র্য অতুলনীয়। এ ঋতুতে বাঙালির এক চোখে হাসি, আরেক চোখে অন্ধকার।

গহিন গাঙের নাইয়া

 মোহাম্মদ মহসীন 
০২ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অপরূপ নদীর সৌন্দর্য বুকে ধারণ করতে ছুটে যাই, কয়েক বন্ধুর ঐতিহ্যবাহী বৈদ্যেরবাজার খেয়া ঘাটে। সেখান থেকে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা ভাড়া বাবদ গুনতে হয় ১২০০ টাকা। বন্ধুদের ইচ্ছা- গন্তব্য স্থান নুনেরটেকসহ এখানে-সেখানে পার্শ্ববর্তী কুমিল্লা জেলার মেঘনা থানার সবুজ প্রান্তে...।

মাঝি পাল তুলে হাল ধরে। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের বিখ্যাত গানটি আপন মনে গাইতে শুরু করে ‘ও আমার গহিন গাঙের নাইয়া, ও তুমি অফর বেলায় নাও বাইয়া যাওরে- কার পানে বা চাইয়া’। তখন মনের অজান্তে কোনো এক গহিনে যেন হারিয়ে যাই...। তারপর মেঘনা নদীর চারপাশের অসাধারণ দৃশ্যকাব্য মন জুড়িয়ে যায়। নদীর এপার-ওপারের অনেক গ্রাম। সেখানে সবুজের খোলা মাঠ-ঘাট, আঁকা- বাঁকা মেঠোপথ অবলোকনে যেন দৃষ্টি কাড়ে।

বসন্তকালে নদীর আকার আয়তন অনেকটাই ছোট। এর চারপাশের বিশালতা বিষণ্ন বলে মনে হয়েছে। আমরা যখন মেঘনা নদীর বুক চিরে যখন সামনের দিকে এগিয়ে যাই, তখন সাগরের নোনতা পানির কথাও মনে পড়ে। আর মেঘনার নদীর মিঠে পানির কল-কল ধ্বনিতে স্নান করতে ইচ্ছা করে। তখন হাবুডুবু শানবাঁধানো ঘাটে অ্যাডভোকেট আলী আহম্মেদ সৈকত, একেএম রাশেদুল নবী, শামীম চৌধুরী, মিজানুর রহমান মামুনসহ আরও নাম নাজানা অনেকে ঘণ্টাখানেক হৈ-হুল্লোড় করে গোসল সারি। মন মাতানো øিগ্ধ আলো বাতাসে আর নদীর ছোট ছোট ঢেউ পাল তোলা নাও, জেলেদের মাছ ধরা দৃশ্য যেন আরেক কাব্যের লাগাম টানি...!

নদীর বুকজুড়ে বিশাল জলরাশিতে ভয়ের কিছু অনুভূতিও জাগে। মেঘনার স্বচ্ছ জলের রূপ দেখে এক পেয়ালা টলমলে পানি খেতে ইচ্ছাও করেছে। অতীতে বাপ-দাদার আদি পেশা ছিল মুলি-বাঁশের। যখন সুরমা বা ধলেশ্বরী হয়ে বৈদ্যেরবাজার মেঘনা তীরবর্তী এলাকায় সারি-সারি বাঁশের বোঙ্গা ভিড়ত। তখন বাঁশ আর খলফার তৈরি করা ঘরে মাল্লাদের রান্না-বান্না করত। বাড়ির চাচাতো ভাইয়েরা মিলেমিশে ওই খাবার খেয়েছি। আর স্বাদের কথা মনে হলে স্মৃতিকাতর করে। তখন মেঘনা নদীর স্বচ্ছ পানিও পান করেছি...! সেকালে মেঘনার জল নিয়ে গৌরবের কথা অবধি ভাবছি। হাল আমলে মিল-কারখানার দূষিত বর্জ্যে নদীর প্রতি অনাদর আর অবহেলায় নিষ্ঠুর আচরণ বারবার কে বা কারা করছে।

এক সময় গভীর জলের বিশাল-বিশাল হুম মাছ ভেসে উঠত। এতে দৃষ্টিনন্দন হতো। বর্তমানে অতীত স্মৃতি ছাড়া আর কী? সেকালে লঞ্চ, স্টিমার, পাল তোলা নৌকার দৃশ্য মন জুড়াত। এখন তাও অতীত। এখন রূপ-বৈচিত্র্যের তেমন মিল নেই। স্থান বুঝে অনেকে সময় সুযোগ করে মেঘনার তীরে শীতল হাওয়ায় মন জুড়াত।

গ্রামের মাঠে-ঘাটে মৌসুমি ইরি ক্ষেতের সবুজ কচি পাতা উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে কি যেনো বলতে চায়! গাঁও-গ্রামের শিশু-কিশোরা মেঠোপথ ধরে বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। যদিও বিদ্যালয় বন্ধ, তারপরও নানা বিষয়ে যেতে দেখা গেছে। আর গাঁও গ্রামের অভাবী মানুষের একদিকে রোগ-শোক আকেদিকে অর্থের টানাপোড়নের করুণ আর্তনাদও দৃশ্যমান। তখন মনটা ভার বনে যায়।

প্রকৃতির ছায়াঘেরা পরিবেশ থেকে যখন সাঁঝেরবেলা ফিরি। তখন প্রখ্যাত লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ উপন্যাসের কথাগুলো বিবেকে জানান জানিয়ে দেয়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখি; জেলেরা অথৈ জলের স্রোত ধারায় ইলিশ ও বাহারি মাছ ধরছে। কাছে গিয়ে দর দাম কষে রুপালি ইলিশ কয়েক বন্ধু মিলে কিনি।

মেঘনার স্বচ্ছ জলের টাটকা মাছ আহ খেতে কি মজা। ঋতুর রঙ্গমঞ্চে আসন পেতে বসেছে বসন্তকাল; কোকিলের কুহু-কুহু ধ্বনি। বাংলার রূপ এক সময় এক রকম। তবে বৈচিত্র্য অতুলনীয়। এ ঋতুতে বাঙালির এক চোখে হাসি, আরেক চোখে অন্ধকার।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন