ইতিহাসের সরদার বাড়ি

প্রাসাদের পশ্চিম দিকের ওপরে রাজমুকুট পরা চিহ্ন। এর প্রতি তলায় সাতটি করে তোরণ এবং কার্নিশে লতাপাতার মনোরম কারুকাজ। পশ্চিম পাশের পুকুরে আছে শান বাঁধানো ঘাট। আর সেই ঘাটে পা ডুবিয়ে বসে থাকা অনুভূতি সত্যিই রোমাঞ্চকর! এখানে বসে আনন্দ অনুভব করে যেতে পারে যে কেউ। আর রাতে পুকুরটিতে দৃষ্টি পড়লে হাজার তারার ঝলক মনে মোহিত করে

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হাজী মোহাম্মদ মহসীন

সোনারগাঁয়ের পানাম নগরের চোখ ধাঁধানো অপরূপ নিদর্শন গোপীনাথ সাহা সরদার বাড়ি। বাড়ির সামনে পেছনে প্রকাণ্ড দুটি দীঘি পরিবেষ্টিত বর্ণিল আয়োজনে যে কোনো মানুষের মনকাড়ে। সূক্ষ্ম টেরাকোটা অসাধারণ কারুকার্যময় প্রাসাদটি দিনে রাতে দেখতে দারুণ লাগে!

প্রাসাদের পশ্চিম দিকের ওপরে রাজমুকুট পরা চিহ্ন। এর প্রতি তলায় সাতটি করে তোরণ এবং কার্নিশে লতাপাতার মনোরম কারুকাজ। পশ্চিম পাশের পুকুরে আছে শান বাঁধানো ঘাট। আর সেই ঘাটে পা ডুবিয়ে বসে থাকা অনুভূতি সত্যিই রোমাঞ্চকর! এখানে বসে আনন্দ অনুভব করে যেতে পারে যে কেউ। আর রাতে পুকুরটিতে দৃষ্টি পড়লে হাজার তাঁরার ঝলক মনে মোহিত করে। জাদুঘর ঘিরে আছে, সিরামিকের চোখ ধাঁধানো কারুকাজ নিয়ে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে অট্টালিকা মঠ। শান বাঁধানো ঘাট, মন্দির, উঠান সবই আছে, নেই শুধু মানুষজন।

উদ্যানের মুখে প্রহরীদের কুঠুরি পার হয়ে দেখা যাবে প্রকাণ্ড জলসা ঘর, ত্রিশ ফুট উচ্চতা ও খাঁড়া ছাদ ২৩টি। জলসা ঘর পেরিয়ে চতুরপার্শে নিচতলায় ও দ্বিতল বারান্দায় পাঁচ ফুট পর পর সুনিপুণ কারুকার্য খিলানের ওপর লতানো কারুকাজের দ্বিতল ভবন। এ ভবনটির আয়তন ২৭ হাজার ৪০০ বর্গফুট। নিচতলায় রুম রয়েছে ৪৭টি। আর দ্বিতীয়তলায় রুম রয়েছে ৩৮টি। প্রায় ছয়শ’ বছরের পুরনো প্রাচীন এ ভবনটির রূপ ছিল ঝলমল ও আকর্ষণীয়। স্থানীয়ভাবে এ বাড়ি ‘বড় সরদার বাড়ি’ নামেই সবার কাছে পরিচিত। ইমারতের সন দেখে বোঝা যায় ১৩৩০ ও ১৩০৮ লেখা থাকলেও অনুমান করা যেতে পাড়ে, এর মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয় প্রায় ছয়শ’ বছর আগে। বাড়ির মালিকানা বা অধিকার পেয়ে সর্বশেষ হাত বদল হয়ে সম্প্রসারণ ও সংস্কার কাজ হয় ১৩৩০ সনে। সুলতানি আমলের পথ ধরে মোঘল আর সর্বশেষ ব্রিটিশ রাজত্বের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের ধারক ‘বড় সরদার বাড়ি’ নির্মাণ করেছেন ঐশ্বর্যকান্ত সাহা সরদার নামে একজন ব্যবসায়ী। তখন থেকে পরিচিতি পায় ‘বড় সরদার বাড়ি’। নওগাঁ ও পাহাড়পুর থেকে অভিজ্ঞ ১৫০ জন নিপুণ রাজমিস্ত্রি তাদের দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় আদিরূপে ফিরে এসেছে বাড়িটির সৌন্দর্য এবং বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশনের ১৭০ বিঘা প্রচীরে পাখির গুণজনে মনোমুগ্ধকর ও দৃষ্টিনন্দন। কারুপল্লীতে গ্রামীণ বৈচিত্র্যময় লোকজ স্থাপত্য গঠনে বিভিন্ন ঘরে কারুশিল্প উৎপাদন, প্রদর্শন ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। ওইখানে কারুশিল্পীরা বাঁশ-বেত, কাঠ খোদাই, নকশিকাঁথা, জামদানি, একতারা, মৃৎশিল্প, ঝিনুক, শঙ্খ, পাট সামগ্রী উৎপাদন, প্রদর্শনী ও বিক্রি হয়ে থাকে। এছাড়া জাদুঘরের অভ্যন্তরে আরও রয়েছে বিনোদন ব্যবস্থা ও মনোরম লেক। পাশাপাশি লেকের পাড়ে কপোত-কপোতীর আনাগনা দেখা যাবে। সোনারগাঁ জাদুঘর থেকে উত্তর দিকে হেঁটে পৌঁছানো যাবে পানাম নগর আদমপুর বাজার সংলগ্ন প্রাচীন নিদর্শন এ পুলটির কাছে। পুলটি বর্তমানে খসে খসে পড়ে যাচ্ছে।

পরিশেষে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে প্রায় পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা গোপীনাথ সাহা সরদার বাড়ি দেখলে যে কোনো ভ্রমণপ্রিয় মানুষের মনে আনন্দ জোগাবে। কারুশিল্প ফাউন্ডেশনে দেশি পর্যটকের প্রবেশমূল্য ৩০ টাকা আর বিদেশি পর্যটকদের জন্য ১০০ টাকা।

যেভাবে যাবেন- মোগরাপাড়া-পানাম রাস্তা যেখানে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অতিক্রম করেছে, সেখান থেকে কিছুদূর উত্তর দিকে গেলেই বড় সরদার বাড়ি (বর্তমানে সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর) আমতলা রাস্তার ডানে।