চর্বি খেয়ে চর্বি পোড়ানোর গল্প

ইন্টারনেটে থাকা ক্লিনিকাল নিউট্রিশনের বেশ কিছু প্রতিবেদন সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দিচ্ছে প্রাকৃতিক কিছু চর্বি আমাদের শরীরের জন্য বেশ উপকারী। এমনকি তা দেহের অতিরিক্ত চর্বি কমাতেও সাহায্য করে

  সন্দীপন বসু ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুটি ডিম পোচ, চারটি পরোটা আর একবাটি সবজি না হলে সকালের নাশতা হয় না বেসরকারি সংস্থার কর্মী মাহাবুবের। এমনিতেই ভোজনরসিক হিসেবে ‘সুখ্যাতি’ আছে তার। দুপুরে কাচ্চি কিংবা বিরিয়ানি আর রাতে তেহারি নিত্যদিনের মেনু যেন! এমনতর অভ্যাসে অভ্যস্ত মানুষটার দিনে দিনে বাড়ছে পেটের চর্বি, বাড়ছে ওজন। সেদিকে খেয়াল থাকলেও খাবার সামনে এলে কোনকিছুই যেন মনে থাকে না তার। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা হলেই শুনতে হয় শরীরের ওজন নিয়ে দু’চারটি কথা।

নিজের শরীরের চর্বি আর ওজন নিয়ে কথা শুনতে আর কাহাতক ভালো লাগে! খাবারের লাগাম টেনে নিজেকে নিয়ে আসতে চান স্বাভাবিক ওজনে। আজকাল আবার ওজন কমাতে ডায়েটিংয়ের খুব চল। মাহাবুব তাই শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে দারস্থ হন নিজের ক্লিনিক্যাল ডায়েটেশিয়ান বন্ধু পার্থের কাছে। ইদানীং পুষ্টিবিদ হিসেবে বন্ধুটির পসার হয়েছে বেশ। পার্থের কাছেই মাহাবুব জানতে পারেন, চর্বি খেয়েই চর্বি পোড়ানো কথা। শুনে প্রথমে অবাক হলেও বিষয়টি যতদূর সম্ভব বুঝে নিলেন তিনি। বাসায় ফিরে মারেন ইন্টারনেটে ঢুঁ। জানতে পারলেন আরও অনেক কিছু।

ইন্টারনেটে থাকা ক্লিনিকাল নিউট্রিশনের বেশ কিছু প্রতিবেদন সুস্পষ্ট সাক্ষ্য দিচ্ছে পুষ্টিবিদ বন্ধুটির বক্তব্যে। জানা গেল, প্রাকৃতিক কিছু চর্বি আমাদের শরীরের জন্য বেশ উপকারী। এমনকি তা দেহের অতিরিক্ত চর্বি কমাতেও সাহায্য করে।

দেহের বিপাকে সহযোগিতা, কোষ ও পেশীর গঠন, দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা ইমিউনিটি সিস্টেম গঠন, হরমোনের উৎপাদন এবং বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান শোষণে শরীরে পর্যাপ্ত চর্বি প্রয়োজন। চর্বি শরীরের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে, মস্তিষ্ক ও চোখসহ দেহের প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের শক্তি যোগান দেয় ও বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করে।

দেহে শক্তি সরবরাহে ‘শর্করা, আমিষ ও চর্বি’ এই তিনটি পুষ্টি উপাদান খুব প্রয়োজন। এক গ্রাম চর্বি থেকে যে পরিমাণ শক্তি পাওয়া যায় তা অন্য দুটি উপাদানের (শর্করা ও আমিষ) চেয়েও দ্বিগুণ। তাই কারও খাদ্য তালিকায় পর্যাপ্ত চর্বি না থাকার মানেই হল এককের হিসেবে শক্তি তথা ক্যালরি পোড়ানোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি যোগান তার নেই। অথচ বিপাকীয় কাজে যা অবশ্য দরকারি।

প্রতিবেদনে আরও আছে, মানবদেহের চর্বি বা ফ্যাট চার প্রকারের হয়। এদের মধ্যে সম্পৃক্ত বা স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স চর্বি হচ্ছে খারাপ চর্বি যা কক্ষতাপমাত্রায় কঠিন হতে থাকে। লাল মাংস, পোল্ট্রি ও দুধ জাতীয় খাবারে, প্রক্রিয়াজাত খাবারে স্যাচুরেটেড চর্বি থাকে আর বেক করা খাবারে ট্রান্স ফ্যাট থাকে। স্যাচুরেটেড বা সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড দিয়ে তৈরি চর্বি শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে ধমনীর ভেতরের গায়ে লেগে যায়। এতে ধমনীর ব্যাস ক্রমশ ছোট হয়ে আসে। ফলে রক্তচাপ বেড়ে যায়। দুধ, ঘি, মাখন, মাংস, ক্রিম, ডিম, চকলেট ইত্যাদি সম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিডের উৎস।

অন্যদিকে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি এসিড তথা মনোস্যাচুরেটেড ও পলিস্যাচুরেটেড চর্বি কক্ষ তাপমাত্রায় তরল হতে থাকে। এই চর্বি ক্ষুধা দমন করে ও ক্যালরি কমায় এবং হৃদস্বাস্থ্যের ও বিপাকের উন্নতি ঘটায়। মনোস্যাচুরেটেড চর্বি পাওয়া যায় সব ধরনের বাদাম, জলপাই তেল এবং ক্যানোলা তেলে। মনোস্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল কমায়। তাই এর ব্যবহার নিঃসন্দেহে রক্তে খারাপ কোলেস্টেরল বা এল.ডি.এল-এর মাত্রা কমিয়ে কোলেস্টেরলজনিত ধমনীর রোগ প্রতিহত করে। পলিস্যাচুরেটেড চর্বি পাওয়া যায় সয়াবিন, সূর্যমুখীর তেল, ভুট্টা ইত্যাদিতে। তাই খাবারে সঠিক চর্বি নির্বাচন করতে পারলে চর্বি খেয়েই ওজন কমানো সম্ভব।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন’-এ ২০১৭ সালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, দেহের বিপাকীয় কাজে অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এই ফ্যাটি এসিড। এই বিশেষ উপাদানে দেহের বিপাকীয় কাজগুলো উদ্দীপনা পায়।

ইন্টারনেটে থাকা বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিবেদন থেকে মাহাবুব জানতে পারলেন, পেটের ও উরুর চারপাশের পেরিফেরাল কোষগুচ্ছে পুরনো চর্বি জমা থাকে। যেটাকে সাবকিউটেনিয়াস চর্বি বলে। সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকদের মতে, নতুন চর্বি ছাড়া পুরনো চর্বি পুড়তে বা ভাঙতে পারে না। ডায়াটারি চর্বি শরীরে থাকা পুরনো চর্বিকে ভেঙে নতুন চর্বি গঠন করে।

গবেষকরা এই নতুন চর্বি আর পুরনো চর্বির রদবদলকে ফুটবল খেলার সঙ্গে তুলনা করেছেন। এ যেন পুরনো ক্লান্ত খেলোয়াড়কে উঠিয়ে নতুন টগবগে খেলোয়াড়কে মাঠে নামানোর মতো। নতুন চর্বি শরীরে ঢুকলে যকৃৎ বা লিভার পুরনো চর্বি ভেঙে শক্তি নিয়ে একে শরীর থেকে বের করে দেয়। আর এ ক্ষেত্রে ফুটবল মাঠের ম্যানেজারের দায়িত্ব নেয় মানবদেহ স্বয়ং। আর এতে বিশেষ ভূমিকা রাখে উপকারী চর্বিগুলো।

মানবদেহে থাকা বিশেষ ফ্যাটি এসিড ওমেগা-৩ তেমনই এক উপকারী চর্বি। এই ফ্যাটি অ্যাসিড মেদ বৃদ্ধিতে দায়ী চর্বিকে পোড়াতে এবং শরীরে ভালো চর্বির পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে।

দেহে প্রদাহ কমানো, অপ্রয়োজনীয় রক্ত জমাট বাধা প্রতিহত করা, ইনস্যুলিনের কার্যকারিতা বাড়ানো, রক্তের কোলেস্টেরল কমানো, প্লাটিলেট বা অনুচক্রিকা জড়ো হওয়া কমানো, রক্তে ট্রাই গ্লিসারাইড কমানো, ক্যান্সার কোষের বাড়া প্রতিহত করা, রক্তনালীর পুরু হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ, রক্তনালীর প্রসারণে সহায়তা, শরীরের রোগ প্রতিরোধ বাড়ানো ইত্যাদি কাজেরও কাজী এই ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড।

ওমেগা-৩ রক্তের ট্রাই গ্লিসারাইড নিয়ন্ত্রণে রাখে ও কোলেস্টেরল কমিয়ে স্ট্রোক প্রতিরোধ করে। এছাড়া শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো, রক্তচাপ কমানো, মানসিক রোগ যেমন- অবসাদ, ডিমেনসিয়া, এটেনশান ডেফিসিট হাইপার এক্টিভিটি ডিজর্ডার প্রতিরোধেও এই জাদুকরী ফ্যাটি এসিডটির অবদান রয়েছে।

শিশুদের সুস্থ সবলভাবে বেড়ে ওঠার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড প্রয়োজন। শিশুরা সাধারণত মাছ পছন্দ করে না। কিন্তু মাছকেই বলা হয় সুপার ফুড। বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছকে। এসব মাছে ওমেগা-৩ এবং ভিটামিন ডি থাকে, যা শিশুদের স্মৃতিশক্তি বাড়ায়। সামুদ্রিক মাছ যেমন স্যামন, টুনা, সার্ডেন ইত্যাদি মাছে প্রচুর পরিমাণ ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড রয়েছে। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের বক্তব্য, যত বেশি ওমেগা-৩ মস্তিষ্ক পাবে তত বেশি শিশুর মনোযোগ বৃদ্ধি পাবে।

এছাড়া উদ্ভিজ্জ তেল যেমন তিষির তেল ও ক্যানোলা অয়েল ইত্যাদিতে পাওয়া যায় ওমেগা-৩। যা আমাদের দেশে ব্যবহৃত হয় না। সামুদ্রিক মাছের তেল ওমেগা-৩ এর উৎকৃষ্ট উৎস। এছাড়া গবেষণায় পাওয়া গেছে, দেশীয় মাছের মধ্যে রুই মাছ, পাংগাস, মাগুর ইত্যাদি মাছের তেলে পাওয়া যাবে ওমেগা-৩। বীজ জাতীয় খাবারেও পাওয়া যায় ওমেগা-৩। মাছের ডিমে ক্ষতিকর চর্বির সঙ্গে বেশ ভালো পরিমাণে থাকে ওমেগা-৩। ১ চামচ মাছের ডিমে প্রায় ৩৪২ মিলিগ্রাম পরিমাণ ওমেগা-৩ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ধরনের বাদামে আছে ওমেগা-৩। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে আছে ওয়ালনাট বা আখরোট, পেস্তা ইত্যাদি বাদামে।

শাকসবজি যেমন- পালং শাক, ব্রুকলি, তিষির তেল, ওয়ালনাট, ক্যানোলা তেল ইত্যাদিতে যথেষ্ট পরিমাণে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে।

ডিমে রয়েছে পর্যাপ্ত ওমেগা-৩। তবে সব ডিমে কিন্তু নয়। বিশেষ প্রক্রিয়ায় পালন করা, বিশেষ খাবার খেয়ে বড় হওয়া মুরগির ডিমে। আজকাল আবার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ ডিম উৎপাদন করছে। যা পাওয়া যাবে নগরীর সুপারশপগুলোতে। এছাড়া ওষুধের দোকানে খাদ্য উপাদানসমৃদ্ধ ওষুধ হিসেবেও পাওয়া যায় ওমেগা-৩। যা গ্রহণে নানা কাজের কাজী এই ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার খোঁজার ঝামেলাটুকু কমে।

একদিনে এত কিছু জানার পর ভোজনরসিক মাহাবুব আর দেরি করেননি। পরিবর্তন এনেছেন নিজের খাদ্যাভ্যাসে। খাদ্য তালিকায় শর্করা, আমিষ ও চর্বি ৩টি উপাদানই রাখছেন। সঙ্গে থাকছে অসম্পৃক্ত ফ্যাটি আসিড ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবারও।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter