ব্র্যান্ড কলমে নান্দনিক আভিজাত্য

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রোকন মাহমুদ

ব্রিটিশ কোম্পানি ‘অরোরা’ ২০১৪ সালে একটি কলম তৈরি করেছিল। যার নাম ‘দায়ামান্তে’। কলমটির দাম ছিল ১০ লাখ ২৮ হাজার মার্কিন ডলার। ওই সময়কার হিসাবে বাংলাদেশি ১১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা! খবরটি ফলাও করে প্রচারও হয়েছিল বিভিন্ন মাধ্যমে। খবর শুনে তো সবার আক্কেল গুড়ুম। কলমের দামও এত হতে পারে?

হ্যাঁ হতে পারে। তার চেয়েও বেশি হতে পারে। অরোরার পরে অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি ‘টিবালডি’ একটি কলম তৈরি করেছিল, যা সাংহাইয়ের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হয়েছিল। দাম উঠেছিল ৮০ লাখ মার্কিন ডলার। তবে এমন দামি না হোক, এর কাছাকাছি দামের কলম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্রি হচ্ছে অহরহ-ই। কেননা কলমেও রয়েছে আভিজাত্য ও রুচিশীলতার বিষয়। অনেকে শখের বশেও ব্র্যান্ডের দামি কলম ব্যবহার করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রয়েছে প্রয়োজনও। ভালো ব্র্যান্ড ও নান্দনিক ডিজাইনের যে কোনো কলমই আভিজাত্য ও রুচিশীলতার পরিচয় তুলে ধরতে পারে।

একবার ভাবুন তো, আপনি একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা কিংবা অফিসের বস। পোশাকও পরেছেন মাননসই ও দামি। মিটিং করছেন বড় কোনো ডেলিগেটের সঙ্গে। কিন্তু আপনার হাতের কলমটি সাদামাটা। বিষয়টি কেমন বেমানান হয়? তার পরিবর্তে আপনার হাতে কলমটি যদি হয় কার্টিয়ার, ডুপন্ট, পাইলট কিংবা পার্কারের মতো নামিদামি কোনো ব্র্যান্ডের, তবেই আপনি পরিপূর্ণ। আপনি যদি একজন লেখক, গবেষক, শিক্ষক কিংবা সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হন, আপনার কাছে একটি ব্র্যান্ডের ভালো কলম থাকা এখনকার সময়ের চাহিদা।

এছাড়া সুন্দর ও টেকসই কলম উপহার হিসেবেও দেয়া যায়। এই কলমটিই আপনাকে মনে রাখতে ওই মানুষটিকে সহযোগিতা করবে। কেননা একটি ভালো কলম ব্যবহার করা যায় দীর্ঘদিন। তাছাড়া প্রয়োজনের দিকটাও দেখতে হবে। সাধারণ কলম দিয়ে লেখা অক্ষরগুলো প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায় কিছু দিনের মধ্যেই। ব্র্যান্ড কলমে সে বিষয়ে অনেকটাই নিশ্চিন্ত থাকা যায়।

সবকিছু বিবেচনায় ইতিমধ্যেই উন্নত দেশের পাশাপাশি সাধ্যমতো আমাদের দেশের অনেকেই মনোরম ডিজাইনের ব্র্যান্ডের কলমগুলো ব্যবহার করছেন। হীরা আর স্বর্ণ খচিত না হোক হাজার দু’তিনের একটি ব্র্যান্ডের কলম অনেকের কাছেই এখন পাওয়া যায়। সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যাংকার, শিক্ষক, লেখক, গবেষক ও ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন এসব কলম কিনছেন। এমনটিই জানিয়েছেন রাজধানীর ‘গাজী পেন হাউস’র স্বত্বাধিকারী সৈয়দ শফিকুল ইসলাম। তিনি জানান, অনেকে প্রয়োজনে দামি ব্র্যান্ডের কলম কিনেন। আবার শখের বশেও কিনেন অনেকে। ব্র্যান্ড কলম সংগ্রহে রাখা তাদের সৌখিনতা। প্রায়ই তারা খোঁজ-খবর রাখেন কলমের দোকানগুলোতে। নতুন ব্র্যান্ড ও ডিজাইনের কলম এলে তারা সেটি সংগ্রহ করেন। সবসময় উন্নত ব্র্যান্ডের কলম দিয়ে লেখেন এমন ব্যক্তিও রয়েছেন অনেক। উন্নত দেশগুলোর মতো লাখ ডলারের না হোক ১০-২০ হাজার টাকা দামের কলম কিনেন এমন ব্যক্তি আমাদের দেশে অনেক। তিনি বলেন, আশির দশক থেকেই এদেশে উন্নত ব্রান্ডের কলম আসে। তখন ব্র্যান্ড কলমের ক্রেতা স্বল্প সংখ্যাক হলেও এখন বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় সব ব্র্যান্ডের কলমই দেশে পাওয়া যায়। প্রতিটি ব্র্যান্ডেরই অনেকগুলো ডিজাইন ও মডেল রয়েছে। ডিজাইন ও মডেল ভেদে দামও ভিন্ন হয়। প্রায় সব ব্র্যান্ডেরই দেড় হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা দামের কলম বাজারে পাওয়া যায়। তবে বেশি বিক্রি হয় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা দামের কলমগুলো। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কর্মকর্তাদের উপহার দিতে কিংবা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মাননা দিতে দামি ব্র্যান্ডের কলম কিনেন বলেও জানা যায়।

ব্র্যান্ড ও দাম

যেসব ব্র্যান্ড বাজারে পাওয়া যায় তার মধ্যে শেফার্স, পার্কার, ক্রোস, পাইলট, মন্টব্লাঙ্ক ও কার্টিয়ার ব্র্যান্ডের ৪ থেকে ৫টি মডেল বেশি চলছে। এর মধ্যে মন্টব্লাঙ্ক নামের জার্মান ব্র্যান্ডের কলমের দাম সাধারণত ১৫ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়। উপরে কোটি টাকা পর্যন্তও রয়েছে বলে শফিকুল ইসলাম জানান। এছাড়া কার্টিয়ার আসে ফ্রান্স থেকে দাম ২০-৫০ হাজার টাকা, ডানহিল জার্মান ও ইংল্যান্ডের, দাম ১০ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত। এর বাইরে ডুপন্ট (ফ্রান্স) ৮-১০ হাজার, ওয়াইসেল (ফ্রান্স) ১ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা, পার্কার (ইংল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র) দুইশ’ থেকে লাখ টাকা, ক্রোস (যুক্তরাষ্ট্র) ২ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা, ইউনিবল (জাপান) ৩৫ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা, পাইলট (জাপান) ১০ টাকা-১ লাখ টাকা, জেব্রা (জাপান) ২০০ টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হয়। সব কলমেরই রিফিল পাওয়া যায় ২০০ থেকে ৮০০ টাকা করে।

এছাড়াও বেশ কিছু ব্র্যান্ড রয়েছে যার ক্রেতা সীমিত সংখ্যাক। এসব ব্র্যান্ডের কলম দোকানিরা রাখেন দু’এক পিস করে। তাদের ক্রেতাও দোকানিদের পরিচিত। এর মধ্যে ডিপ্লোমেট, ফেবার ক্যাসেল, ফেরারি, গ্রাফ-ভন-ফেবার, ইয়ার্ড ও লেড, ওয়ার্থার, ওয়াটারম্যান, ভিসকনটি, প্লাটিনাম, রট্রিং, পেলিকান ও ল্যামি। এসব কলমের দাম ২ হাজার থেকে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত হয়।

ডিজাইন ও ধরন

প্রাচীন কালে কলমের ধরন ও ডিজাই ছিল এক রকম। ওই সময় বাঁশের কঞ্চি বা পালক দিয়ে তৈরি হতো কলমগুলো। আধুনিক কালে ওইসব কলমের ডিজাইনগুলো রয়েছে। স্টিল ও সিলিকন দিয়ে তৈরি হয় কলমগুলো। তবে নতুন ডিজাইনের কলমই বেশি। বর্তমানে নিব ও কালির উপরে ভিত্তি করে তিন রকম কলম পাওয়া যায়। বলপয়েন্ট কলম- এ কলমের ডগায় বা নিবে ০.৭-১.২ মিমি. আকারের পিতল, স্টিল বা টাংস্টেন কার্বাইডের তৈরি একটি ছোট্ট শক্ত বল বা গোলক থাকে যা কলমের ভেতরে থাকা কালিকে কাগজ বা যার উপরে লেখা হচ্ছে তাতে মাখাতে সাহায্য করে। বলপয়েন্ট কলমে যে কালি ব্যবহার করা হয় তা একটু ঘন প্রকৃতির এবং তা কাগজের সংস্পর্শে আসতে না আসতেই শুকিয়ে যায়।

ঝর্ণা কলম বা ফাউন্টেন পেন- এ কলমে পানিভিত্তিক তরল কালি দিয়ে নিবের সাহায্যে লেখা হয়। রোলারবল বা জেল কলম- এই কলমের ডগায়ও বলপয়েন্ট কলমের মতো বল থাকে। কিন্তু এই কলমের কালি বলপয়েন্ট কলমের কালির চেয়ে পাতলা বা কম ঘন। এই কম ঘন কালি সহজেই কাগজ শুষে নিতে পারে এবং কলমও অনেক মসৃণভাবে চলতে পারে। বলপয়েন্ট কলমের সুবিধা এবং ঝর্ণা কলমের কালির ভাবটাকে একত্রিত করার উদ্দেশ্যে জেল কলমের সূত্রপাত হয়েছিল। জেল কালি বিভিন্ন রঙের হয়, এমনকি ধাতব পেইন্ট ও ঝিকিমিকি রঙেরও জেল কালি

পাওয়া যায়।