বাংলার শাড়ি

বাঙালির ঐতিহ্য শাড়ি। যদিও ঠিক কবে থেকে শাড়ির প্রচলন শুরু হয় তা অনেকটাই অজানা, তবে সেই প্রাচীনকাল থেকেই যে শাড়ি দক্ষিণ এশিয়ার মহিলাদের প্রিয় এবং প্রধান আবরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে অনেক পুরাণেই তার বর্ণনা পাওয়া যায়। বলাই বাহুল্য বাঙালি মহিলাদের সৌন্দর্যই শাড়ি। যদিও আজকাল প্রায় সর্বক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটে চলেছে বিশেষ করে ঢাকা শহরে! আমাদের দেশের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় শাড়ি একটি অত্যন্ত আরামদায়ক পোশাক। অনেকের মতে, শাড়ি এমন একটি পোশাক যা একজন নারীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত আবৃত করে রেখেও তার নারীত্বকে আরও নমনীয় ও বিনয়ী রূপে প্রস্ফুটিত করে তোলে।

  অধ্যাপক ড. জাকিয়া বেগম ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সংস্কৃতি ভাষা থেকে ‘শাড়ি’ শব্দটির উৎপত্তি। সংস্কতিতে ‘শাটি’ শব্দের অর্থ ‘বস্ত্র সম্ভার’ যা কালক্রমে ‘শাড়ি’ শব্দ রূপে রূপান্তরিত হয়েছে। সংস্কৃতি ভাষায় লেখা অতি পুরাতন বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি এবং খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ৫০০ অব্দ সময়কালে লিখিত মহাভারত, শীলাপাধিকারাম, কাদাম্বরী, নাট্যশাস্ত্র ইত্যাদি প্রাচীন কাব্য-সাহিত্যগুলোতেও শাড়ির বর্ণনা পাওয়া যায়। অনেক পণ্ডিত ব্যক্তির মতে, প্রাচীন এ সব পান্ডুলিপিগুলোর কোনো কোনোটি প্রায় ৫০০০ বছরের পুরনো।

প্রাচীন তামিল কাব্যকলা সিলাপ্পাধিকারম এবং কাদম্বরী নারীকে শাড়ির সৌন্দর্যে অপরূপা আর নাট্যশাস্ত্র নামক গ্রন্থে নৃত্যকলায় শাড়ির ছটায় প্রাচিন ভারতীয় নারীকে মোহনীয় করে তোলা হয়েছে। বিশ্বের দীর্ঘতম মহাকাব্য মহাভারতে বর্ণনা করা হয়েছে, দ্বন্দ্বযুদ্ধে পরাজিত পঞ্চপাণ্ডব যখন প্রতিপক্ষের কাছে সহধর্মির্নী দ্রৌপদীকে ছেড়ে দেয় তখন প্রতিপক্ষ দ্রৌপদীকে নিরাভরণ করার চেষ্টায় শাড়ির এক প্রান্ত ধরে টানতে থাকেন । সুদীর্ঘ এই শাড়িটি এতটাই আঁটসাঁটভাবে পরিধেয় ছিল যে তারা এটির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছিল।

উপমহাদেশের ভারতীয় উপত্যকায় শাড়ি পরিহিত প্রথম প্রকাশিত ছবিটি হচ্ছে খ্রিস্টপূর্ব ১০০ অব্দের। এই ছবিটিতে একটি মূর্তির মাধ্যমে একজন ধর্মযাজিকাকে প্রস্ফুটিত করে তোলা হয়েছিল যার সর্বাঙ্গ শাড়িতে জড়িত ছিল। উত্তর ভারতেও টেরাকোটার মাধ্যমে চিত্রিত করা একটি প্রাচীন নারী মূর্তি দেখা গেছে যেটির সর্বাঙ্গ ধুতির মতো করে জড়ানো শাড়ি দ্বারা আবৃত।

যুগ যুগ ধরে সেলাইবিহীন প্রাচীনতম এই পোশাকটি এর আবেদনময়ী ও মোহনীয় রূপটি শুধু ধরেই রাখেনি অনেক তাঁতশিল্পী, মুদ্রণশিল্পী ও চিত্রশিল্পী-ই সৃজনশীল সৃষ্টির অণুপ্রেরণা হয়ে আছে।

ভারতের মহারাষ্ট্রে অবস্থিত অজন্তা গুহায় প্রাচীনতম যে দেয়াল চিত্র পর্যটকদের আকর্ষণ করে চলেছে তাতেও নারীকে চিত্রিত করে তোলা হয়েছে সর্বাঙ্গ শাড়িতে জড়িত অবস্থায়। পঞ্চদশ শতকের একজন পর্তুগিজ পর্যটকের বর্ণনাতেও এ অঞ্চলের শাড়ি পরিহিতা নারীর সৌন্দর্য প্রস্ফুটিত হয়ে আছে। কালের আবর্তে শাড়ি পরার ধরনের মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে ঠিকই কিন্তু এর আবেদন এখনও এতটুকু ম্লান হয়নি।

বিমানবালাদের শাড়ি পরার মাধ্যমে ইদানীংকালে বহির্বিশ্বে এর জনপ্রিয়তা অনেকটুকু ছড়িয়ে পড়েছে এবং এর সৌন্দর্য অনেককেই বিমোহিত করে তুলছে। তাই হয়তো ভারতীয় বিশ্বসুন্দরী ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চন যখন বিশ্ববিখ্যাত আর এক তারকা অপরা উইনফ্রের ‘শো’তে গিয়েছিলেন তখন অপরা উইনফ্রেকেও শাড়ি পরিহিতা দেখা গেছে। এমনকি অ্যাঞ্জেলিনা জোনস্, এলিজাবেথ হারলির মতো বিশ্বখ্যাত তারকারাও শাড়ি পরিহিত অবস্থায় জনসম্মুখে দেখা দিয়েছেন।

যুগ যুগ ধরে দেখা গেছে নারীরাই কোনো জাতি বা এলাকার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে অধিক আগ্রহী থেকেছে। আমাদের মা-খালারা শাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পোশাক পরিধান করাটাকে লজ্জাজনক বলে মনে করতেন। শাড়ি পরেই তারা সংসারের যাবতীয় কাজকর্ম করতেন। আমাদের সময়ও একই ধারা চলে এসেছিল এবং বিবাহিত কোনো মহিলাকে শাড়ি ছাড়া অন্য কোনো পোশাক পরতে দেখা যেত না।

তবে দুঃখের বিষয় ইদানীং মহিলাদের মধ্যে শাড়ি পরার ব্যাপারে কেমন জানি একটা অনিহা দেখা দিয়েছে এবং সালোয়ার-কামিজ পরাটাকে ফ্যাশনের পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। এই প্রবণতা এতটাই প্রকট হয়ে উঠছে যে কে মা আর কে মেয়ে তা বোঝা কঠিন হয়ে উঠছে, স্কুল-কলেজে কে ছাত্রী আর কে শিক্ষিকা তা বোঝা সম্ভব না হয়ে ওঠায় অনেক সময় কিছু কিছু লজ্জাজনক অবস্থারও সৃষ্টি হচ্ছে। শাড়ির প্রতি এই অনিহা অব্যাহত থাকলে আগামী এক-দুই দশকের মধ্যেই শাড়ি হয়তো পরিত্যক্ত একটি পোশাকে পরিণত হবে।

শাড়ি না পরার কারণ হিসেবে অনেকে বলতে চাইছেন এটা কোনো আরামদায়ক পোশাক নয়। তবে আমার দীর্ঘ শাড়ি পরার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে চাই যে এটা সম্পূর্ণই অভ্যাসের ব্যাপার। যুগ যুগ ধরে তো এই শাড়ি পরেই আমাদের দেশে গ্রামে-গঞ্জের মহিলারা কৃষিক্ষেত্রসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি কার্য সম্পাদন করে আসছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ শাড়ি পরেই ঘরের বাইরে বিভিন্ন কাজে ছোটোছুটি করে চলেছে। কেউ কেউ শাড়ি পরে, কাঁধে বাচ্চা ও হাতে ব্যাগ নিয়ে লাফিয়ে বাস ধরছে, কেউবা আবার মোটরসাইকেল চালাচ্ছে! ভারতের শান্তি নিকেতনেও শাড়ি পরে মহিলাদের সাইকেল চালাতে দেখা যায়।

অনেকের মতে, শাড়ি তেমন শালীন পোশাক নয়। এ ক্ষেত্রেও আমার বক্তব্য আমি এমন কিছু মহিলাকে দেখেছি, যারা ব্লাউজের ধরনে কিছুটা পরিবর্তন এনে শাড়িটিকেই খুব শালীনভাবে পরিধান করে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে চলেছেন।

শাড়ি বাঙালির ঐতিহ্য। তাই এই ঐতিহ্য যাতে স্বার্থান্বে হারিয়ে না যায় সে ব্যাপারে মহিলাদের সচেতন করে তুলাই আমার এই লেখাটির উদ্দেশ্য। অন্যের ঐতিহ্যকে লালন করা নয় বরং নিজস্ব কৃষ্টি এবং ঐতিহ্যকে ধারণ করে রাখতে পারাটাই গৌরবের কাজ। তাই যুগ যুগ ধরে চলে আসা বাঙালি জাতির এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে মহিলাদের সচেতন হওয়া উচিত।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×