মন পবনের নাও

বীরবেশে ফিরেও তার ফেরা হল না

  যুগান্তর ডেস্ক    ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল আট বছর। সে কারণে এই স্মৃতি ভালোই গেঁথেছে আমার হৃদয়ে। যুদ্ধ শেষে একদিন আমার মা আমাকে নিয়ে রওনা হলেন বেড়িবাঁধের দিকে। জানতে চাইলাম, কোথায় যাচ্ছি আমরা? মা বললেন, কথা বলো না, চুপচাপ হাঁট। বেড়িবাঁধে উঠতেই আমার চোখ ছানাবড়া। ভয়ে মায়ের আঁচলের ভেতর লুকোনোর চেষ্টা করছি। মা বললেন, ভয় পেয়ো না, কিছু হবে না। দেখলাম, বাঁধের একপাশে খালপাড়ে লাশের সারি। মুক্তিযোদ্ধারা যাদের মেরেছে- তাদের লাশ খালপাড়েই মাটিচাপা দেয়ার কাজ করছেন। দেখলাম, আমার বয়েসী এক ছোকরা একটি লাশের মুখে মাটির চাকা পুরে দিচ্ছে আর বলছে, ‘খা, খা’! মা দ্রুতপায়ে আমাকে নিয়ে বেড়িবাঁধের প্রায় মাইলখানেক পার হয়ে ঢুকলেন গোপীনাথপুরে আমার ফুফুর বাড়িতে।

সেখানে ঢুকে পড়ে গেলাম বিশাল এক কান্নার সমুদ্রে। আমার ফুফাকে রাজাকাররা ধরে নিয়ে গেছে তাদের গোপন ক্যাম্পে। কারণ আমার ফুফাতো ভাই লোকমান হোসেন মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। রাজাকাররা তাকে চায়। বলে গেছে, ‘লোকমান জানে, তার বাবাকে আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। সে গিয়ে তার বাবাকে ছাড়িয়ে আনতে পারবে।’ লোকমান ভাই ছিলেন লম্বা চওড়া সুঠাম দেহের ভীষণ সাহসী এক যুবক। তিনি বাড়ি আসার আগেই এ খবর পেয়ে চলে গেছেন ফুফাকে ছাড়িয়ে আনতে। আর এটা শুনেই বাড়িশুদ্ধ লোকজনের এই কান্নার রোল। আমরাও না কেঁদে পারলাম না।

দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল, খেয়েছি কী খাইনি, সে কথা আজ মনে পড়ছে না। বিকালে ফুফা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির উঠানে এসে আছড়ে পড়লেন। তার কান্নার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িশুদ্ধ লোকজনের আওয়াজও বেড়ে গেল। সেই আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে মিশে গেল আসরের আজান- আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ধ্বনি! আজানের পরপরই যেন ধীরে ধীরে সবার কান্না থেমে গেল। রাজাকাররা ফুফাকে জানিয়ে দিয়েছিল লাশ বাড়ির কাছে কোথাও পৌঁছে দেবে তারা। মাগরিবের আজান হওয়ার আগেই লোকমান ভাইয়ের লাশের খবর এলো, কাচারি ঘরের সামনেই রাখা ছিল। ছোট দুই ফুফাতো ভাই দৌড়ে গেল, পেছন পেছন বাড়ির আরও লোকজন। লাশ আনা হল মুক্তিযোদ্ধা লোকমান ভাইয়ের। ক্ষতবিক্ষত দেহ দেখে আমার ছোট মনে দাগ কেটে গেল। বেশ ভয় পেয়েছিলাম, মায়ায় নয়, ভয়ে আমার কান্না আরও বেড়ে গেল। আমার পাশেই নির্বাক বসেছিলেন লোকমান ভাইয়ের স্ত্রী রেজিয়া ভাবি। তার কোলে সদ্যপ্রসূত প্রথম সন্তান- যার বয়স তখন মাত্র তিন মাস। মায়ের কান্না যেন সে-ই কাঁদছে, ভীষণ কাঁদছে। সে কেন কেঁদেছিল, তা মহান আল্লাহতায়ালা ছাড়া কেউ জানেন না। আমার মন আজও কাঁদে সেই মহান মুক্তিযোদ্ধার জন্য, যিনি দেশের জন্য যুদ্ধ করে বীরবেশে ঘরে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হলেন রাজাকারদের হাতে।

কাজী কামাল

লক্ষ্মীপুর

প্রিয় পাঠক

এ রকম ঘটনা বা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন আপনিও। সেটা যে কোনো ব্যক্তি, নারী অথবা শিশুকে নিয়ে। অথবা এমন কোনো ঘটনা যা আপনার অনুভূতিতে নাড়া দিতে পারে- সেসব নিয়েই ‘মন পবনের নাও’ আমাদের নতুন বিভাগ। এখানে আপনি অকপটে ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ শব্দের মধ্যে লিখতে পারেন আপনার মনের সবচেয়ে আবেগঘন ঘটনার বিবরণ এবং সে সম্পর্কে আপনার অনুভূতির কথা। সেগুলো আমরা যত্ন সহকারে পাত্রস্থ করব।

- বি.স.

লেখা পাঠানোর ঠিকানা

বিভাগীয় সম্পাদক

ঘরে বাইরে (মন পবনের নাও)

দৈনিক যুগান্তর

২৪৪-ক প্রগতি সরণি, কুড়িল, বিশ্বরোড, বারিধারা, ঢাকা ১২২৯

ই-মেইল : [email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter