রাজধানীতে মশার উৎপাত

এ বছর দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ৬৮৬। মারা গেছেন ২৪ জন

  যাকারিয়া ইবনে ইউসুফ ২৭ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীতে মশার উৎপাত

শীতের শুরুতেই রাজধানীসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে হঠাৎ করে বেড়েছে মশার উপদ্রব। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সর্বত্রই মশার রাজত্ব।

প্রতি বছর এ খাতে অর্ধশত কোটি টাকার বেশি খরচ হলেও মশার উৎপাত কমছে না। গত বছর চিকুনগুনিয়ার যন্ত্রণার পর চলতি বছর ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। সরকারি হিসাবমতে, গত ১৫ বছরের মধ্যে ডেঙ্গুতে এবারই সর্বোচ্চসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

তবে ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিসের উপদ্রব কিছুটা কমতে না কমতেই রাজধানীতে শুরু হয়েছে কিউলেক্স মশার উৎপাত।

রাজধানীবাসী কয়েল জ্বালিয়ে, ওষুধ ছিটিয়ে, মশারি টাঙিয়ে মশার উপদ্রব থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেলাতেও বাচ্চাদের মশারি টাঙিয়ে ঘুম পাড়াতে হচ্ছে।

মিরপুর কাজীপাড়ার বাসিন্দা গৃহবধূ সুমাইয়া আক্তার বসুনিয়া বলেন, সিটি কর্পোরেশনকে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখি না। সন্ধ্যায় বাচ্চারা কয়েল জ্বালানো ছাড়া পড়তেই পারে না।

গত মাসে বড় ছেলেটা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল। ফের মশার উপদ্রব বাড়ায় পরিবারের সবাইকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। মশার উৎপাত বন্ধে সিটি কর্পোরেশনের কোনো কার্যক্রম দেখছি না। আশপাশের খাল ও ডোবা-নালাগুলো পরিষ্কার আর মশার ওষুধ দিলে হয়তো নিস্তার পেতাম।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি

২০১৭ সালে প্রায় ঘরে ঘরে ছিল মশাবাহিত রোগ চিকুনগুনিয়া। চলতি বছর চিকুনগুনিয়া না থাকলেও ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে গেছে। বিগত কয়েক মাস ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েছে।

আশপাশে একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে পরিচিতজনদের মধ্যে কেউ না কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন স্বজনরা।

রোগীর প্রচণ্ড জ্বর, বমি, গা ব্যথা আবার কারও কারও ক্ষেত্রে হাতে-পায়ে ফুসকুড়ি ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর জন্য প্রায় প্রতিদিনই রক্তের খোঁজে ছুটছেন স্বজনরা।

সরকারি হাসপাতালে হেমোরেজিক ডেঙ্গুর চিকিৎসা খরচ সহনশীল হলেও বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় এর চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক সানিয়া তাহমিনা বলেন, আমাদের নিয়মিত কাজের অংশই হচ্ছে এডিস মশার সার্ভে করা। আমরা সার্ভের রিপোর্ট সিটি কর্পোরেশনকে দেই; যাতে এডিস মশা প্রতিরোধে সহজে তারা কাজ করতে পারেন। পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করতে আমরা সংবাদপত্রে নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিচ্ছি।

ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্টের জন্য আমাদের একটি গাইডলাইন আছে কীভাবে ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দিতে হবে। এটা প্রথম বের হয়েছিল ২০০০ সালে। ২০১৮ সালে এর চতুর্থ সংস্করণ বের করলাম।

আমরা চিকিৎসকদের কাছে সফট কপি পাঠিয়ে দিয়েছি। তারপরও বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতালসহ যেসব জায়গায় ডেঙ্গু রোগী বেশি ভর্তি হয়, তাদের আইসিইউর চিকিৎসকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছি।

নিয়মিত সিটি কর্পোরেশনের সঙ্গেও মিটিং হচ্ছে। ডেঙ্গু রোগী শনাক্তের জন্য আমরা বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু কীট সরবরাহ করছি।

ডেঙ্গু ইস্যুতে দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, বিগত দুই-তিন বছরের তুলনায় ডেঙ্গুর প্রবণতা সামান্য বেড়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি হলেও উদ্বেগজনক বা আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই।

ডেঙ্গু আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমরা প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১৫ হাজার বাসাবাড়িতে ডেঙ্গু মশার লার্ভা ধ্বংস করেছি। দ্বিতীয় পর্যায়ে ধানমণ্ডি ও কলাবাগান এলাকায় ১৭ হাজার বাসাবাড়িতে লার্ভা ধ্বংস করেছি।

এ এলাকার প্রায় ৩৭ শতাংশ বাড়িতে ডেঙ্গু মশার লার্ভা পাওয়া যায়। গত বছর চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি ছিল। আমরা তা নিয়ন্ত্রণ করেছি। এ বছর চিকুনগুনিয়া নেই। হাসপাতাল, গণমাধ্যম ও আমাদের কর্মীদের থেকে পাওয়া তথ্যে এবার ডেঙ্গুর প্রবণতা বেড়েছে।

ডেঙ্গুতে ২৪ জনের মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ২৪ জন মারা গেছেন।

চলতি বছরে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে এ পর্যন্ত ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে তার সঠিক কোনো হিসাব সরকারের কাছে নেই। কেননা স্বাস্থ্য অধিদফতরের এ বিভাগটি দেশের সব হাসপাতাল মনিটর করে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মৃতের সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারি হিসাবমতে গত ১৫ বছরের মধ্যে ডেঙ্গুতে এবারই সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

সরকারি হিসাবে চলতি বছর, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছেন ৯ হাজার ৬৮৬। বর্তমানে ভর্তি আছেন ১৩৯। আর শনি থেকে রোববার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৫ জন।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা জানিয়েছেন, ২০১৮ সালে ডেঙ্গুর চারটি সেরোটাইপের মধ্যে ডেন-৩ তে আক্রান্ত হচ্ছেন বেশিরভাগ মানুষ।

এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ। তাছাড়া পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ডেঙ্গু নিয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তার বেশিরভাগই দ্বিতীয়বারের মতো আক্রান্ত হয়েছেন।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুতে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হওয়াটা যে কোনো রোগীর জন্য ভয়াবহ। কেননা, প্রথমবারের চেয়ে দ্বিতীয়বারের ভয়াবহতা প্রায় ২০০ গুণ বেশি। এমন রোগীর ক্ষেত্রে আক্রান্তের অল্প সময়ের মধ্যে রক্তক্ষরণ দেখা দিতে পারে।

ওষুধ ছিটাতে দেখেন না সাধারণ মানুষ

নগরীর বিভিন্ন জলাশয়ের কচুরিপানা পরিষ্কার ও মশার ওষুধ কেনার জন্য প্রতি বছর দুই সিটি কর্পোরেশনকে প্রায় ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সঠিকভাবে ডোবা, জলাধার পরিষ্কার করা হচ্ছে না। সরেজমিন অনুসন্ধানে গেলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন দীর্ঘদিন তারা মশার ওষুধ ছিটাতে দেখেনি। বিভিন্ন জায়গায় সপ্তাহখানেক ধরে লোক দেখানো কিছু স্প্রে করা হচ্ছে তবে মশার উপদ্রব কিছুতেই কমছে না।

জানা গেছে, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন এবং ঢাকা মশক নিবারণী দফতর মিলিয়ে রাজধানীতে মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে প্রায় এক হাজার মশক শ্রমিক। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এসব শ্রমিক সকালে লার্ভা নিধনে ড্রেনে বা পানি জমে এমন জায়গায় ওষুধ ছিটাবে এবং বিকালে উড়ন্ত মশা মারতে ফগার মেশিনের মাধ্যমে ওষুধ ছিটাবে। প্রত্যেক এলাকায় প্রতিদিন সকাল-বিকাল এ কার্যক্রম করার কথা থাকলেও কালেভদ্রে চোখে পড়ে মশক নিধন কর্মীদের চেহারা।

মশার উপদ্রবে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বনশ্রী, বাসাবো, রামপুরা, বাড্ডা, কুড়িল, ভাষানটেক, উত্তরা, এয়ারপোর্টসহ রাজধানীর অনেক এলাকার মানুষ।

মশার কামড় থেকে বাঁচতে শিশুরা দিনের বেলায় মশারির নিচে পড়াশোনা করছে। ভাষানটেকের বাসিন্দা কবির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, সিটি কর্পোরেশনকে ট্যাক্স দিয়েও মশার ওষুধ পাই না, উল্টো কামড় খাই।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

 
×