কেসস্টাডি

  যুগান্তর ডেস্ক    ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অপমান সইতে না পেরে অরিত্রীর আত্মহত্যা

চলতি মাসের শুরুতে শিক্ষকের তিরস্কারের শিকার হয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণীর ছাত্রী অরিত্রী অধিকারী রাজধানীর শান্তিনগরে নিজ বাসায় আত্মহত্যা করেন। তার বিরুদ্ধে স্কুল কর্তৃপক্ষ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরীক্ষায় নকল করার অভিযোগ এনেছিল। পরে অরিত্রির মা-বাবাকে ডেকে নেন ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ। অরিত্রীকে নকলের অভিযোগে প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। নিহত অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারী জানান, তার মেয়ে পরীক্ষায় মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নকল করেছে অভিযোগ করে অধ্যক্ষ ও অন্য শিক্ষকরা তাদের (মা-বাবা) উপস্থিতিতেই অরিত্রীকে অপমান করে এবং স্কুল থেকে ছাড়পত্র (টিসি) নিয়ে যেতে বলা হয়। তিনি বলেন, আমার মেয়ে বারবার ক্ষমা চেয়ে আবেদন জানালেও শিক্ষকরা তার কথা না শুনে উল্টা তাকে কক্ষ থেকে বের করে দেন। পরে তাদের (বাবা-মা) বাসায় যাওয়ার আগেই অরিত্রী দ্রুত বাসায় গিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে।

পরে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে শিক্ষামন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তদন্ত করে। সরকারি তদন্তেও ভিকারুননিসা নূন স্কুলের নানা অনিয়ম-অসঙ্গতি বেরিয়ে এসেছে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, অরিত্রী অধিকারীর সঙ্গে যে ধরনের নির্দয় আচরণ করা হয় সেটি তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে এবং আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে বলে তদন্ত কমিটির মনে হয়েছে। এর দায় এ তিনজন শিক্ষক এড়াতে পারে না। স্কুলের পরিচালনা কমিটিকে এ তিন শিক্ষককে বরখাস্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া এ তিন শিক্ষকের বেতনের সরকারি অংশ (এমপিও) বাতিলেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অভিযুক্ত তিন শিক্ষক হলেন- ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আরা ও শ্রেণী শিক্ষক হাসনা হেনা।

ঘটনার এক পর্যায়ে অরিত্রীর বাবার করা এক মামলায় গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্ত তিনজনের মধ্যে শ্রেণী শিক্ষক হাসনা হেনাকে। পরে আবার হাসনা হেনাকে নির্দোষ দাবি করে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি অরিত্রীর ঘটনায় মূলত শাখাপ্রধান ও প্রিন্সিপাল জড়িত, তাদের গ্রেফতার না করে একজন নির্দোষ শিক্ষককে পলিটিক্স করে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। শিক্ষিকা হেনা অরিত্রীর বাবা-মাকে অপমান করেননি। আন্দোলনের এক পর্যায়ে জামিন পান শ্রেণী শিক্ষক হাসনা হেনা।

স্কুলটির গভর্নিং বডির সদস্য ও সুপ্রিমকোর্টের অ্যাডভোকেট মো. ইউনুস আলী আকন্দ অভিযোগ করেন, ২০১২ সালে চৈতি নামের একটি মেয়ের ইচ্ছা ছিল সায়েন্স নিয়ে পড়বে। তাকে সায়েন্স নিয়ে পড়তে দেয়া হয়নি। পরে মেয়েটি এক বছর নষ্ট করে পুনরায় পরীক্ষা দিলেও তাকে সায়েন্স দেয়া হয়নি। পরে মেয়েটি আত্মহত্যা করে। যদি চৈতির আত্মহত্যার বিচার হতো তা হলে অরিত্রী অধিকারীর মরতে হতো না।

শিক্ষক লাঞ্ছিত, ৫৬ শিক্ষকের পদত্যাগ

গত অক্টোবরে টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে শিক্ষক লাঞ্ছিত হওয়ার প্রতিবাদে ও দোষীদের বিচারের দাবিতে একসঙ্গে ৫৬ শিক্ষক প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অকৃতকার্য হওয়া এক ছাত্রীকে ছাত্রলীগ নেতারা জোর করে পরীক্ষা দেয়ার সময় শিক্ষকরা বাধা দেন। এ সময় ছাত্রলীগ নেতারা শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ করে বলে শিক্ষকরা অভিযোগ করেন। এদিকে ওই ছাত্রী পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন।

পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মো. মনিরুজ্জামান জানান, তৃতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের পরীক্ষায় দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টারের অকৃতকার্য হওয়া এক শিক্ষার্থীকে ছাত্রলীগ নেতারা পরীক্ষার হলে নিয়ে আসে। বিভাগের পক্ষ থেকে অনুমোদন না দেয়ার পরেও জোর করে পরীক্ষা হলে আসনে বসিয়ে দেয় ছাত্রলীগের ওই নেতারা। বিভাগের শিক্ষকরা বাধা দিতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সজীব তালুকদারসহ তার সহযোগী আরও কয়েকজন পরীক্ষা হলে দায়িত্বরত শিক্ষকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতে উদ্যত হন। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ওই শিক্ষার্থীকে পাহারা দিয়ে সম্পূর্ণ পরীক্ষা শেষ করায়।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সজীব তালুকদারের অভিযোগ, এক শিক্ষকের কুপ্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় ওই শিক্ষার্থীকে ফেল করান হয়েছে। এছাড়া শিক্ষকরাও অর্ডিনেন্স ভঙ্গ করে পরীক্ষা শুরুর আগের দিন বিকালে পূর্ববর্তী সেমিস্টারের ফলাফল প্রকাশ করেছে। তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে কিছু কথা কাটাকাটি হওয়ার কথা স্বীকার করেন।

আত্মহত্যায় প্ররোচনা, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা

চলতি বছরের আগস্ট মাসে মাদারীপুর সদর উপজেলার চরমুগরিয়া বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের দশম শ্রেণীর ছাত্রী সাথী আক্তারের আত্মহত্যার ঘটনায় প্রধান শিক্ষক মো. নুর হোসেনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। নিহত সাথীর মা রুবি আক্তার বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করার দায়ে মাদারীপুর সদর মডেল থানায় মামলাটি করেন। জানা গেছে, প্রধান শিক্ষকের কাছে সাথীর বিরুদ্ধে এক সাহপাঠী গালি দেয়ার অভিযোগ করে। পরে প্রধান শিক্ষক দু’জনকেই ডেকে সবার সামনে শাসন ও স্কেল দিয়ে মারধর করেন। এরপর সাথী বাড়ি ফেরার সময় স্থানীয় একটি দোকান থেকে ঘাস মারার ওষুধ কিনে নিয়ে সন্ধ্যায় পান করে। বিষয়টি টের পেয়ে তাকে প্রথমে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাথী মারা যায়।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×